শ্রীলঙ্কার সুদিন কি ফিরবে?

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৩, ৪:৪৪ অপরাহ্ণ

জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যে শ্রীলঙ্কার জনজীবনে নাভিঃশ্বাস।ফাইল ছবি: রয়টার্স

সোনার দেশ ডেস্ক :


শ্রীলঙ্কা এখন ‘দেউলিয়া’- কথাটি ছিল খোদ দেশটির প্রেসিডেন্টের।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্র ২০২২ সালের মে মাসে তাদের সার্বভৌম ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়, পরিণত হয় ঋণ খেলাপিতে।
এরপর শ্রীলঙ্কার উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা এবং তাতে অগ্রগতির সর্বশেষ খবর দিয়েছে বিবিসি।
অনেক তদ্বিরের পর গত সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ২৯০ কোটি ডলারের ‘বেইলআউট প্যাকেজ’র প্রতিশ্রæতি আদায় করেছিল কলম্বো।

কিন্তু এই অর্থ এখনও তাদের হাতে যায়নি। তখনই আসবে যখন শ্রীলঙ্কা তাদের দুই বড় ঋণদাতা দেশ চীন ও ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ঋণ পুনর্গঠন বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে।

গত মাসে এ বিষয়ক একটি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর আশা জাগাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত সই করতে পারেনি কলম্বো। ফলে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং জনগণের দুর্দশা চলছেই।
তারপরও আইএমএফের বেইলআউটের প্যাকেজের অর্থ আসন্ন সপ্তাহে বা মাসে ছাড় করাও হয়, তাতে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির পুনর্গঠন কর্মসূচির শেষ হবে না, বরং তা হবে সূচনা মাত্র।
এখন এটা বিস্তৃত পরিসরেই স্বীকৃত যে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক মডেল বা কাঠামোর একটি মৌলিক সংস্কার দরকার।

শ্রীলঙ্কা এমন বেহাল কেমন করে হল?
সোনার দেশ ডেস্ক
২০০৯ সালে বিদ্রোহী তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে ২৫ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সিংহলী সরকারের বিজয়ের পরের বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা কিছু সুবিধা পেয়েছে, যাকে আর্থিকভাবে বলা চলে একটি ‘শান্তি লভ্যাংশ’।
ওই সময় সরকার সফলভাবে বড় আকারের বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পেরেছে। শুধু চীনের মতো বিদেশি সরকারের কাছ থেকে নয়, বরং বেসরকারি খাতের আন্তর্জাতিক বন্ডধারীদের কাছ থেকেও। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার সরকারি বন্ডে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা অর্থ লগ্নি করেছে।

এই অর্থের প্রবাহ সেদেশের অভ্যন্তরীণ অনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বেগবান করে, কিন্তু তা সুষম হয়নি বরং ভারসাম্যহীনতার একটি ফানুস তৈরি হয়।
এই বছরগুলোতে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল থাকলেও তারা আন্তর্জতিকভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে থাকে। আর ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রপ্তানি ৬৫০ কোটি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ কোটি ডলারে পৌঁছালেও, একই সময়ে বৈশ্বিক পরিসরে দেশটির অর্থনীতির আকার ৩৯ শতাংশ থেকে ২৩ শতাংশে নেমে আসে।

২০২০ সালে মহামারী শুরুর আগেই শ্রীলঙ্কার বাণিজ্য ঘাটতি ছিল দেশটির মোট জিডিপির ৬ শতাংশ। দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অনৈতিক খাত পর্যটনের আয় দিয়েও এই ঘাটতি কুলিয়ে উঠতে পারেনি তারা।
অর্থনীতির এই ভারসাম্যহীনতাই শ্রীলঙ্কার ঋণ খেলাপি হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল। হঠাৎ করেই তারা উপলব্ধি করতে শুরু করলো যে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অপরিহার্য পণ্য আমদানি করার মতো বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের উপায় তাদের বন্ধ হয়ে গেছে।

২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতা গ্রহণকারী রনিল বিক্রমাসিংহের কাছে অন্তত এটা স্পষ্ট যে শ্রীলঙ্কার আর্থিক দুর্দশার পথ থেকে বের হয়ে আসার উপায় হচ্ছে এর উৎসে যে ভারসাম্যহীনতা, তা ঠিক করা, বিশেষ করে রপ্তানি বাড়ানো।
গত বছর স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে বিক্রমাসিংহে বলেন, “আমাদেরকে একটি অতি প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানিমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে হবে। আর কোনো পথ নেই। আমরা ২ কোটি ২০ লাখ জনগোষ্ঠীর একটি দেশ। আমাদেরকে বাইরে বাজার খুঁজে বের করতে হবে।”

সুতরাং শ্রীলঙ্কার সামনে এখন অর্থনীতির বড় প্রশ্নটি হচ্ছে- এটা কি করা সম্ভব? দেশটি কি ব্যবসার মাধ্যমে আবার সমৃদ্ধির পথে ফিরতে পারবে?
ঐতিহ্যগতভাবে, শ্রীলঙ্কার বড় রপ্তানি পণ্য হচ্ছে কৃষিপণ্য, যার শুরুটা হয়েছিল দারুচিনি দিয়ে। ষোড়শ শতকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এই দারুচিনিতে আকৃষ্ট হয়। এখনকার সময়ে চা সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য।

কিন্তু ২০২১ সালে সার আমদানির উপর গোটাবায়া সরকারের নিষেধাজ্ঞা আরোপে চায়ের উৎপাদন এক-পঞ্চমাংশ কমে গেছে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এখন নীতি নির্ধারকদের এমন পথ খুঁজে বের করতে হবে যাতে কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন বাড়ে।

অথচ চা খাতের অনেক চা-বাগানই এখনও নিজেদের ‘আর্টিজান’ (চা-কর) উৎপাদক হিসেবে বিবেচনা করে। তারা এখনও দুই শতক আগের নিয়মে হাতে পাতা তুলে হাতেই তা প্যাকেট করার পদ্ধতি টিকিয়ে রেখেছে, যা শুরু হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে। অনেক টি এস্টেটেই এখনও সেই মান্ধাতা আমালের চা প্রক্রিয়াজাতকরণ সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে।

নুওয়ারা এলিয়ার পেদ্রো এস্টেটের মহাব্যবস্থাপক রোশান রাজাদুরাই বললেন, “এর ওপরে রয়েছে নতুন পদ্ধতিকে গ্রহণ না করার মানসিকতা। শ্রমিকরা পাতা তোলার আরও আধুনিক ও দক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার করতে রাজি না।”
রাজাদুরাই জানালেন, তিনি চেয়েছিলেন চা পাতা তোলা শ্রমিকদেরকে বাগানের নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট শ্রমিক দল ও তাদের পরিবারের কাছে দিয়ে দিতে, যেখানে তারা নিজেদের সময় ভাগ করে নিয়ে সুবিধামতো সময়ে পাতা তুলবে। প্রচলিত যে নিয়মে দৈনিক হিসাবে টানা শ্রমঘণ্টায় তারা যে কাজ করে তা থেকে এটা আলাদা।

তিনি বললেন, এটা পাতা সংগ্রহ পদ্ধতিতে একটি সংস্কার যা ফলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরীক্ষিতভাবে সফল। কিন্তু শ্রমিকরা এই পরিবর্তন চাচ্ছেন না।
“আমরা যদি এই পরিবর্তন আনতে না পারি, যেভাবে অন্যান্য জিনিসের দাম বাড়ছে এবং সে তুলনায় বিশ্ব বাজারে আমাদের পণ্যের দামের যে স্থবিরতা, তাতে আমি মনে করি না যে আমরা দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারব।”

বস্ত্রশিল্প বা পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক তৈরি করা শ্রীলঙ্কার রপ্তানি আয়ের আরেকটি বড় উৎস।কিন্তু, এটাও কাঁচামাল ও জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল। চা খাতের তুলনায় অনেক বেশি আমদানিনির্ভর খাত এটা।
মহামারী ও ইউক্রেইনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের কারণে ওই সব আমদানি পণ্যের দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। সম্ভাবনা আছে এ বছর এসব আমদানি পণ্যের দাম কমে আসবে। তারপরেও বাস্তবতা হচ্ছে চা ও বস্ত্রখাত, হয়ত এগুলো সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে থেকে যাবে, আন্তর্জাতিক রপ্তানি ভ্যালু চেইনে (পণ্য শৃঙ্খলে) শ্রীলঙ্কাকে খুব বেশি উপরে তুলে আনতে পারবে না।

তাহলে শ্রীলঙ্কার আর কি আছে রপ্তানি করার?
দাগকাটার মতো বিষয়টি হচ্ছে, যখন জানুয়ারিতে বিবিসির নিউজনাইট শ্রীলঙ্কার নীতি নির্ধারক ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলেছিলো তখন যে ধারণাটি পাওয়া গেছে, তা হলো একটা মহাপরিকল্পনার ধারণার অভাব।
মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো, যেখানে রাষ্ট্রীয় নীতির সহায়তায় ইলেকট্রনিক পণ্য খাতে বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে, অন্যান্য এশীয় দেশগুলোর মতো সুনির্দিষ্ট কোনো একটি খাত নিয়ে এ ধরনের মনোভাব নেই তা দেশের জন্য বড় ধরনের সুবিধা এনে দিতে পারে।

এক্ষেত্রে দ্বীপরাষ্ট্রটির জন্য একটি সম্ভাবনার জায়গা হয়ত হতে পারে সমুদ্র বন্দর সেবা।
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নন্দলাল বীরাসিংহে বলেন, ভারত মহাসাগরের সমুদ্র পথের কেন্দ্রে অবস্থান করায় শ্রীলঙ্কার ভৌগলিক অবস্থান তাদের দেশকে একটি বড় ‘ট্রান্স-শিপমেন্ট’ হাব’ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, “রপ্তানি আয় বাড়াতে সমুদ্র বন্দর ও লজিস্টিকস (আনুসাঙ্গিক সুবিধা) সেবা খাত আমাদের জন্য সম্ভাবনার জায়গা।”
ধারণা করা হয়, বিশ্বে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের এক-তৃতীয়াংশ, এবং জ্বালানি তেল পরিবহনের দুই-তৃতীয়াংশই ভারত মহাসাগর দিয়ে চলাচল করে।
তবে সম্ভবত একটি স্পষ্ট জাতীয় পরিকল্পনার অনুপস্থিতি ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারণের মৌলিক বিষয়গুলোকে ঠিকঠাক করা।

গত বছর সংকটের মধ্য গগনে সরকার মুদ্রার বিনিময় হারের উপর নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়, যার ফলে এক ধাক্কায় ডলারের বিপরীতে শ্রীলঙ্কার রুপির দর বিদ্যমান দরের অর্ধেক হয়ে যায়। অনেকে অবশ্য ধারণা করেন যে মুদ্রার ভাসমান বিনিময় হার শেষ পর্যন্ত রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও থিংক ট্যাংক অ্যাডভোকাটার রোশান পেরেরা বলেন, “[অতীতে] আমরা দেশের মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের চলকগুলোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অবমূল্যায়িত হতে দিইনি, যা শেষমেষ আদতে রপ্তানিকে নিরুৎসাহিত করেছে।”
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংক আরেকটি বিষয় উল্লেখ করেছে, বৈপরিত্য মনে হলেও, তা হচ্ছে আমদানি উন্মুক্ত করা ও শুল্ক তুলে নেওয়া।
টনসংস্থাটির বিবেচনায়, এসব শুল্ক অনেক আমদানি পণ্য ও সেবাকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে, যা দেশীয় উৎপাদকদের সুবিধা দিচ্ছে, বিশেষ করে খুচরা বাজার ও নির্মাণ খাতকে।
আমদানি শুল্ক ও ভোগ্য পণ্যের বেলায় শ্রীলঙ্কা বিশ্বের অন্যতম সংরক্ষণশীল অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত।
বিশ্ব ব্যাংকের যুক্তি হচ্ছে, আমদানি উন্মুক্ত করা হলে তা আরও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে, যা দেশের শিল্প খাতকে আরও দক্ষ করতে ও রপ্তানি বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গত বছর প্রেসিডেন্ট বদলানোর পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের জন্য পর্যাপ্ত রাজনৈতিক সুযোগ রয়েছে কি না যে তিনি বাণিজ্য শুল্ক বাধাগুলো তুলে দিতে পারবেন, যা শেষ পর্যন্ত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে শক্তিশালী স্থানীয় স্বার্থকে তাদের পক্ষে প্ররোচিত করার সুযোগ করে দেবে।
ইতিবাচক বিষয়টি হচ্ছে গত বছরের ধাক্কা এ ধরনের কষ্টদায়ক সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে একটি উৎসাহ সৃষ্টি করেছে এবং শ্রীলঙ্কাকে অন্তত লড়াই করার একটি সুযোগ দিয়েছে যার মাধ্যমে দেশটি তার ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করে সমৃদ্ধির দিতে এগিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ