শ্লাঘনীয় থাকুক বিদ্যাসাগর ও কার্ল মার্কস

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


বাংলাদেশের মানুষের বিস্ময়, উপনিবেশকালীন যুক্ত বাংলায় বিদ্যাসাগরের মতো অতুল ব্যক্তিত্ব, রবীন্দ্রনাথের ভাবনা, ‘ভুলকরে’ আবির্ভূত হয়েছিলেন। মানব মহিমা উজ্জীবনের অনুকূল পরিবেশে অনেক প্রতিভা ইয়োরোপে সমাজের উপরিকাঠামো এবং বুুিদ্ধবৃত্তিক চেতনা পরিবর্তনে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এঁদের অন্যতম কার্লমার্কস। না, তাঁর মাহাত্ম্য কীর্তনের জন্য আমাদের আয়োজন নয়। সমাজের উপরিকাঠামোতে নতুনত্ব সৃষ্টির যে দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন তিনি করেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে একটি নতুন ধারার সূচনা। বিদ্যাসাগর সমসাময়িক যুগের পরাধীন বাংলাদেশের এক যশস্বী শিক্ষক। তিনি সমাজের অহিতকর সংস্কার আর অন্তর্নিহিত গ্লানি মুছার জন্য কালের বিপরীত স্রোতে যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হলেও তাঁর প্রকৃত সত্তাকে সুধিজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ : ‘ভাষার প্রাঙ্গণে তব আমি কবি তোমারি অতিথি’ বলে (২৪-৫-১৩৪৫)।

কার্ল মার্ক্সের জন্ম ৫ই মে, ১৮১৮ সালে। বিদ্যাসাগরের আগমন ১৮২০ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর। মার্কস পরমায়ু পেয়েছিলেন ৬৪ বছর, আর বিদ্যাসাগর একাত্তর বছরের মতো। না, দীর্ঘজীবী হওয়াটাই খ্যাতিমানতার পরিচায়ক নয়। কর্মসাধনাই মানুষকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়।

আমরা বলেছি বিদ্যাসাগরের তিরোধানের পর তাঁর ‘অজেয় পৌরুষ’ আর অক্ষয় মনুষ্যত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অবশ্য তার আগে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি মধুসূদন বিদ্যাসাগরের মনীষাকে প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের সাথে তুলনা করেছিলেন। তবে তা ব্যাপক প্রচারিত হয়নি। গৌরদাস বসাককে লেখা চিঠির মধ্যে বন্দি ছিলো। কার্ল মার্কস কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো প্রকাশের আগে, উনিশতকের মাঝামাঝি সময়ে, ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে ইংল্যান্ডের পত্রিকায় যখন লেখালেখি করছিলেন তখন বিদ্যাসাগর ‘বাংলা গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী’ হবার সাধনা এবং অবহেলিত বাঙালি সমাজে, বিশেষ করে নারী সমাজে, শিক্ষার আলো ব্যাপক বিস্তারে নিবেদিত।

বিদ্যাসাগর এবং মার্ক্সের মানব-কল্যাণকামী কর্মধারায় একটি মিল হলো, তারা আবেগের বিষয়, বিশেষ করে ধর্মীয় আবেগ নিয়ে সমাজের মুখোমুখি হননি। অথবা বিশেষ কোনো ধর্মের মতবাদ প্রচারে পক্ষপাত গ্রহণ করেন নি। মার্কস ইহুদি সম্প্রদায়ের মেধাবী সমাজ দার্শনিক। বিদ্যাসাগর বাঙালি সমাজে ব্রাহ্মণ পুরোহিতের উত্তরাধিকার। দুটি পুরাতন ধর্মের জনগোষ্ঠীর মানুষ হয়েও তাঁরা ধর্ম নিয়ে উচ্চবাচ্য করেন নি।

উভয়ের দৃষ্টি ছিলো ব্যক্তিগত বৈভবের চেয়ে মানুষ কিভাবে জীবনধারণের সুলভ সুযোগ পেয়ে মনুষ্যত্বের পরিচয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে। ইয়োরোপে চার্চের দখলদারিত্ব সংকুচিত হয়ে আসলে মানবধর্মের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তাবিদগণ ব্যাপক চর্চা শুরু করেছেন। সেই পরিবেশে মার্কস সমাজ জীবনে উৎপাদন-বণ্টনের সামঞ্জস্যহীনতাকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে যে দর্শনের প্রতিফলন ও সুব্যবস্থা দেখে যাবার সুযোগ তাঁর হয়নি, তবে কর্মজীবী মানুষের কল্যাণকামী হিসেবে তাঁর অবদান কম নয়।

বিদ্যাসাগর উনিশ শতকের নবজাগৃতিবোধের সূচনার অন্যতম পুরোধা। তিনি নির্ধারিত সমাজ দর্শনের পেছনে ছোটেননি, মূর্তিমান দারিদ্র তিনি দেখেছেন, তাই স্বচ্ছলতা অন্বেষী আশ্রয়ার্থীদের তিনি সহায়ক হয়ে কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন। নিজের কর্মসাধনা দিয়ে তিনি সামাজিক অচলায়তনে আঘাত করেছেন। তাঁর জন্ম অনেকটা অগ্রবর্তী সময়ে। রবীন্দ্রনাথ বিস্ময়াভিভুত হয়ে বলেছিলেন: “আমাদের এই অবমানিত দেখে ঈশ^রচন্দ্রের মতো এমন অখ- পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, আমরা বলিতে পারিনা।… মানব ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন।” বাঙালি সত্যিকার মানুষ হয়েছে কি না, মহাকাল তার সাক্ষী। তবে বিদ্যাসাগরের মানব ভাবনা উন্নয়নের প্রয়াস ইতিহাসে অমলিন থাকবে।

বিদ্যাসাগর শিক্ষা-সংস্কার-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নারী মুক্তির জন্য সচেষ্ট ছিলেন। কতটুকু পেরেছিলেন, আমরা তা ক্ষীণ দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করছি। নাকি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় নারী ‘বিধাতার শক্তির অপচয়’ হয়েই রয়ে গেল। এতদসত্ত্বেও নারী আজ প্রগতির ধারার মহাসড়কে যেভাবে আবির্ভূত হয়েছেন তার পেছনে বিদ্যাসাগরের একলা চলার সাধনা তুলনাহীন। বিদ্যাসাগর তার নিরলস সাধনায় নিঃস্বার্থ সহায়ক পাননি। ফলে বৃহত্তর বাঙালি সমাজ তার প্রদর্শিত পথে যথাযথভাবে এগিয়ে আসেনি।

চিন্তার বিবর্তনের ইতিহাসে বিশ্বসভায় মার্কস স্থান করে নিয়েছেন সূর্যাস্তহীন সাম্রাজ্যবাদীদের ভাষার শক্তিতে। বিদ্যাসাগরের কীর্তি কম নয়, অথচ প্রচারের অভাবে তাঁর কীর্তিকে বিশ্ববাসীর দরবারে উপস্থাপন করা যায়নি। মার্কস ব্যবহারিক জীবনে আক্ষরিক অর্থে কর্মজীবী মানুষের দোসর হতে পারেন নি। তবে মানুষ কোন প্রক্রিয়ায় জীবনধারণের অপরিহার্য অনুষঙ্গগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়মে পেতে পারে তা যৌক্তিকভাবে দেখাতে চেয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর সহসা সমাজ পরিবর্তনের ভাবনার চেয়ে মানুষের মনোজগতের অহিতকর সংস্কার দূর করতে চেয়েছেন। মানুষে মানুষে ভেদাভেদের দেয়াল ভেঙে দিয়ে একটি আনন্দঘন পরিবেশের জন্ম দিতে সচেষ্ট থেকেছেন। তাইতো দেখা যায়, জীবনের শেষ প্রান্তের দিকে মহামারি কবলিত বর্ধমানে জমিদারের সুখনিবাসে আতিথ্য গ্রহণ না করে দরিদ্র মুসলিম পল্লীতে সেবার ধর্ম পালন করেছেন। আজকের এই করোনা কবলিত বিশে^ তাঁর মতো মানবপ্রেমী ব্যক্তিত্বের বড়ো অভাব। মানবপ্রেমের দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, শেষ জীবনে বিদ্যাসাগর প্রকৃতির নিজস্ব সন্তান আদিবাসীদের মধ্যে বসবাস করে মানুষের ভেদবুদ্ধির অবসান ঘটাতে সচেষ্ট ছিলেন।
বিদ্যাসাগর ‘জীবে দয়া কর’ কথাটি কেতাবি করে রাখেনি। ব্যক্তিজীবনে প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। মাছ, মাংস এমনকি দুধও তিনি গ্রহণ করতেন না আমৃত্যু। অথচ তিনি নন্দিত হলেন কতখানি!

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দুঃখ করে বলেছিলেন, রামকৃষ্ণের প্রতিকৃতি ভক্তদের মাঝে, বিশেষ করে নারীদের কাছে যথেষ্ট সমাদৃত ছিল, সে তুলনায় বিদ্যাসাগর সম্পর্কে তাদের উদাসীনতা বেশ লক্ষণীয় ছিল। অথচ নারীশিক্ষা এবং নারীকে সসম্মানে অধিষ্ঠিত করার ব্রত তাঁর কম ছিলো না।

মানবমুক্তির কল্যাণে মানবজন্মের সার্থকতাকে কার্ল মার্কস এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজের উপরিকাঠামো এবং মানসলোক পরিবর্তনের সাধনা করে গেছেন। আমরা তাঁদের স্মরণ করে নিজেদের মানুষ ভাবতে শ্লাঘা বোধ করি।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ