সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সরকারের করণীয়

আপডেট: মার্চ ২৪, ২০২০, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


করোনাভাইরাসকে (কোভিড-১৯) সংক্রামক রোগ হিসেবে সোমবার (২৩ মার্চ) অন্তর্ভুক্ত করেছে সরকার। ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮’-এর আওতায় নতুন এই রোগকে সংক্রামক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। এর ফলে দেশে সংক্রামক রোগের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ২৪। আইনে ২৩টি সংক্রামক রোগের কথা উল্লেখ ছিল।
আইনটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সংক্রামক রোগের প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে ব্যবস্থা গ্রহণে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে ভূমিকা নিতে বলা হয়েছে। আইনটিতে অধিদফতরকে সুনির্দিষ্ট করে ১৭টি করণীয় পালনের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে দায় বহনের কথা বলা হয়েছে অধিদফতরের মহাপরিচালককে।
আইন অনুযায়ী অধিদফতরের করণীয়গুলো নিচে হুবহু তুলে ধরা হলোÍ
(ক) সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল এবং ইহার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিস্তার হইতে জনগণকে সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে কর্মকৌশল প্রণয়নসহ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ;
(খ) উল্লিখিত [(ক)তে] কর্মকৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা গ্রহণ;
(গ) জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাসকরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ;
(ঘ) সংক্রমিত এলাকাকে সংক্রমণমুক্ত এলাকা হইতে পৃথককরণ, সংক্রমণমুক্ত এলাকায় উক্ত রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ এবং আক্রান্ত এলাকায় পুনঃআবির্ভাব প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান;
(ঙ) সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার এবং অপব্যবহার রোধকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
(চ) বাসগৃহ, অন্যান্য গৃহ, ক্লিনিক, হাসপাতাল এবং রোগ নির্ণয় কেন্দ্র বা কোনো স্থাপনায় সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সেবা প্রদান করিলে বা অনুরূপ রোগের সংক্রমণের আধার হিসেবে বিবেচিত হইলে উক্ত স্থান বা স্থাপনা পরিদর্শন ও তদনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
(ছ) সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে, অ্যান্টিবায়োটিক, প্রতিষেধক টিকা বা ঔষধ প্রয়োগ;
(জ) সংক্রামক রোগের তথ্য রহিয়াছে এইরূপ কোনও ব্যক্তিকে উক্ত রোগের বিষয়ে অধিদফতরের নিকট তথ্য প্রেরণের নির্দেশনা প্রদান;
(ঝ) ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমন এবং ম্যালেরিয়া বা অন্যান্য বাহক বাহিত রোগ (ঠবপঃড়ৎ ইড়ৎহব উরংবধংব) প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশেÍ(অ) বাসগৃহ, অন্যান্য গৃহ, মশারি, পর্দা, বিছানার চাদর ও অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য বস্ত্রাদিতে কীটনাশক প্রয়োগ; (আ) কীটনাশকের নিরাপদ মাত্রা নির্ধারণ; (ই) তথ্য সংগ্রহের জন্য কোনও প্রাঙ্গণে প্রবেশ; (ঈ) প্রজননস্থল ব্যবস্থাপনা এবং (উ) সংক্রামক রোগের বাহক নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক প্রয়োগ করা হইয়া থাকিলে উহা পরবর্তী ৫ (পাঁচ) মাসের মধ্যে ধৌত, চুনকাম বা প্লাস্টার করা হইতে বিরত থাকা এবং উহার উপরিভাগে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইতে বিরত রাখা;
(ঞ) দূষণ বা ভেজাল শনাক্তকরণের উদ্দেশে খাদ্য, পানীয় বা উহার কাঁচামাল প্রস্তুত, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বিতরণকালে উহা পরিদর্শন এবং পরীক্ষাকরণ;
(ট) সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হইয়াছেন এইরূপ কোনও সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট হাসপাতাল, অস্থায়ী হাসপাতাল, স্থাপনা বা গৃহে অন্তরীণ (ছঁধৎধহঃরহব) রাখা বা পৃথককরণ (ওংড়ষধঃরড়হ);
(ঠ) জীবাণুঘটিত দূষণ প্রতিরোধ ও রোগ সংক্রমণের উৎস অপসারণ বা ধ্বংসকরণ;
(ড) ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের বৃদ্ধি বা বিস্তার ঘটাইতে পারে এইরূপ প্রকৌশল, কৃষি বা শিল্প প্রকল্প নিষিদ্ধকরণ;
(ঢ) কীটনাশকযুক্ত লং লাস্টিং ইনসেকটিসাইডাল নেট (খখওঘ) এবং ইনসেকটিসাইডাল নেট সিল বা পর্দার কার্যকারিতা ব্যাহত করিতে পারে এইরূপ দ্রব্যাদির বিক্রয় নিষিদ্ধকরণ;
(ণ) সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে কোনও বাজার, গণজমায়েত, স্টেশন, বিমানবন্দর, নৌ ও স্থলবন্দরগুলি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করিতে পারিবে;
(ত) সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে উড়োজাহাজ, জাহাজ, জলযান, বাস, ট্রেন ও অন্যান্য যানবাহন দেশে আগমন, নির্গমন বা দেশের অভ্যন্তরে এক স্থান হইতে অন্য স্থানে চলাচল নিষিদ্ধকরণ;
(থ) সরকার কর্তৃক সময় সময় অর্পিত দায়িত্ব পালনসহ অন্যান্য কার্য-সম্পাদন।
আইনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃত্বে উপদেষ্টা কমিটি গঠনের কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতিনিধিরা এই কমিটির সদস্য থাকবেন।
এই কমিটির কাজগুলো হলো-(ক) সংক্রামক রোগের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিস্তার হইতে জনগণকে সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে কর্মকৌশল প্রণয়নে অধিদফতরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান;
(খ) সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য ঔষধের ব্যবহার পর্যালোচনা;
(গ) সংক্রামক রোগের বৃদ্ধি বা বিস্তার ঘটাইতে পারে এইরূপ প্রকৌশল, কৃষি বা শিল্প প্রকল্প নিষিদ্ধকরণ বা করণীয় বিষয়ে মহাপরিচালককে নির্দেশনা প্রদান;
(ঘ) আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মহাপরিচালককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান এবং
(ঙ) বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনও কার্য।
আইনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিধি-বিধানের অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছেÍ
সংক্রামক রোগের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিস্তার হইতে জনগণকে সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে উক্ত রোগসমূহ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল, উক্ত রোগের প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সতর্কতা জারি ও পারস্পরিক সহায়তার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এতদসংক্রান্ত শিক্ষা বিস্তার, রোগের উন্নতি পর্যালোচনা, অধিকার সংরক্ষণসহ অন্যান্য পদ্ধতিগত ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত এবং তফশিলে উল্লিখিত ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঐবধষঃয জবমঁষধঃরড়হং, প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগযোগ্য হইবে।
আইনে সংক্রামক রোগের তথ্য প্রদানের কথা বলা আছে। এতে বলা হয়েছেÍ
যদি কোনও চিকিৎসক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত কোনও ব্যক্তির চিকিৎসার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন এবং উক্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি, কোনও বাসগৃহ, প্রাঙ্গণ বা এলাকায় সংক্রামক রোগের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হন, তাহা হইলে তিনি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জনকে অবহিত করবেন;
যদি কোনও বোর্ডিং, আবাসিক হোটেল বা অস্থায়ী বাসস্থানের মালিক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির যুক্তিসঙ্গত কারণে ধারণা হয় যে, উক্ত স্থানে বসবাসকারী কোনও ব্যক্তি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তা হলে তিনি অনতিবিলম্বে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন এবং জেলা প্রশাসককে অবহিত করবেন;
কোনও সিভিল সার্জন সংক্রামক রোগ বা উক্ত রোগে আক্রান্ত কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে অবহিত হলে তিনি বিষয়টি অনতিবিলম্বে মহাপরিচালককে অবহিত করবেন।
ওই আইন সংক্রমিত এলাকা ঘোষণা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের কথাও বলা আছে। এতে বলা হয়েছেÍ
অধিদফতরের মহাপরিচালক, সরকারের অনুমতি নিয়ে নিম্নবর্ণিত কোনও এলাকাকে সংক্রমিত এলাকা হিসাবে ঘোষণা করতে পারবেন, যথাÍ(ক) বাংলাদেশের স্থানীয় কোনও এলাকা বা অঞ্চল যাহা কোনও সংক্রামক ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছে বা আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে মর্মে যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্দেহ হচ্ছে;
(খ) সংক্রমণের বিস্তার নির্মূল বা সীমিত করার জন্য সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহৃত দ্রব্যাদি, গৃহ, আঙ্গিনা, বাসস্থান বা যানবাহন।
(গ) মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি মনে করেন যে, যথাযথভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও সংক্রামক রোগ সীমিত বা নির্মূল করা সম্ভব নয়, তাহলে তিনি সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে বা সংক্রমিত স্থানে অন্য কোনও ব্যক্তির প্রবেশ নিষিদ্ধ, সীমিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
সংক্রামক রোগ আইনে রোগের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছেÍ
(১) যদি ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মচারীর এইরূপ বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে, কোনও ব্যক্তি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বা তার দেহে সংক্রামক জীবাণুর উপস্থিতি রয়েছে, তাহলে তিনি ওই ব্যক্তির থেকে নমুনা সংগ্রহ এবং তা পরীক্ষা করতে পারবেন। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষায় সংক্রামক রোগ বা জীবাণুর উপস্থিতি থাকলে তা সিভিল সার্জনকে অবহিত করতে হবে এবং সিভিল সার্জনের নির্দেশনায় পরবর্তী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করিবেন।
আইন অনুযায়ী রোগাক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত দ্রব্যাদিতে রোগের জীবাণু থাকলে তা নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিশুদ্ধ বা ধ্বংস করা হবে।
আইনে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে সাময়িক বিচ্ছিন্নকরণের কথাও বলা আছে। এতে বলা হয়েছেÍ
কোনও সংক্রমিত ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করা না হলে তার মাধ্যমে অন্য কোনও ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারেন বলে মনে হলে ওই ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে অন্য কোনও স্থানে স্থানান্তর বা জনবিচ্ছিন্ন করা যাবে।
জীবাণুযুক্ত কোনও স্থাপনা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব না ওই প্রয়োজনে স্থাপনা ধ্বংস করতে তার মালিককে নির্দেশ দেওয়া যাবে।
আইনে কোনও ব্যক্তি সংক্রামক রোগে মারা গেলে তার মৃতদেহ সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক দাফন বা সৎকার করতে হবে।
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন