সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে হবে, এটা দায়িত্ব : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট: নভেম্বর ১৩, ২০১৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন ‘আমার আহ্বান থাকবে-সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আমাদের সর্বতো নিরাপত্তা দিতে হবে। এটা আমাদের সকলের দায়িত্ব।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শনিবার বিকেলে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বিরোধী ও উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন। এসময় তিনি রাজশাহী বিভাগের ৫টি স্থানের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন। বিভাগের ৮টি জেলার ২ হাজার ৯৮১টি গ্রামে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই ভিডিও কনফারেন্সের অনুষ্ঠানটি দেখানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ হচ্ছে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আমাদের ইসলাম ধর্ম শান্তির ধর্ম। প্রত্যেক ধর্মের মূল বাণীও তাই। এখানে সকল ধর্মের মানুষ তাদের ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারবেন। এটাই ইসলামের কথা, এটাই আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কথা এবং আমরা সেটাই মেনে চলি। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মানুষ খুন করা কিন্তু ইসলামের পথ না।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে দেশের উন্নয়নের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের উন্নয়ন কর্মকা-কে অব্যাহত রাখার জন্য শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখাটা জরুরি। তিনি বলেন, ‘জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসকে আমরা প্রশ্রয় দেব না। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। কারণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া একটি দেশের উন্নয়ন সম্ভব না। এটা হচ্ছে বাস্তবতা।’
প্রধানমন্ত্রী ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমি কৃতজ্ঞতা জানাই জনগণের প্রতি-সকলে আমার ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। যে কারণে এটা আমরা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ অন্তত নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। কিন্তু এখনো কিছু কিছু যে সমস্ত ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো যেন আর না ঘটে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই বিএনপি’র কোনো এক নেতা কিছুদিন আগে বলেছিলেন-আওয়ামী লীগ আন্দোলনের কি দেখেছে, নভেম্বর মাসে হবে আসল আন্দোলন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের আন্দোলন যদি হয় আবারও এই মানুষ খুন করা, মানুষের ঘরবাড়ি পোড়ানো, সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাত-নির্যাতন করা এবং এর মাধ্যমে দেশের সম্প্রীতি নষ্ট করা- সেই আন্দোলন কোনো দিনও মানুষের সমর্থন পাবে না। এই পথ জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এটাই চাইব যে আমাদের দেশের সকলে, যেমন মসজিদের ইমামেরা জুম্মা’র নামাজের আগে যে খোতবা দেন সেখানে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস সম্পর্কে আমাদের ইসলাম ধর্মে কি আছে, নবীজি কি বলেছেন, কোরআন শরিফে কি বলা আছে, তা মানুষের কাছে তুলে ধরবেন। বিষয়টা মানুষকে ভালোভাবে জানাতে হবে। যাতে কেউ বিপথে না যায়। এ ধরনের আত্মঘাতী পথে পা না বাড়ায়। তিনি বলেন, ‘আমি অভিভাবক, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, কর্মজীবী, সাধারণ জনগণ সবাইকে আমি আহ্বান জানাব- সকলের যৌথ উদ্যোগেই আমরা বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।’
প্রধানমন্ত্রী বিএনপি’র আন্দোলনের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, জ্বালাও-পোড়াও মানুষ হত্যা এবং মানুষকে পুড়িয়ে মারা এটা কখনো মানুষের কাজ না। এ কথা সব সময় সকলকেই মনে রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আমাদের দেশের সব সময় সম্প্রীতি বজায় থাকবে, দেশ উন্নত হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে বিশ্ববাসী স্বীকার করে-বাংলাদেশ আজকে উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে অনেকে ঈর্ষান্বিত হয়। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি ৪৫ বছর হয়ে গেছে। আজকে যদি জাতির পিতা বেঁচে থাকতেন তাহলে এই বাংলাদেশ আরও বহু আগেই উন্নত হতে পারত। কিন্তু তাঁর সেই অসমাপ্ত কাজ আমাদের সম্পন্ন করতে হবে। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষ উন্নত জীবন পাবে, সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘খুন-খারাপির পথটা এ দেশে আবারও দেখিয়ে দিল (পঁচাত্তরের জাতির পিতাকে হত্যার পরে) বিএনপি-জামায়াত, এটা এ দেশে নতুন কিছু না। তাদের সেই গুলি কর বৃষ্টির মতো গুলি কর। মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী- এই যে কথাগুলি সেগুলো নিশ্চয়ই বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যায় নি। তারা ওই গুলি কর, মানুষ খুন কর-এসবই তারা জানে। এই কাজ তারা বারবার করেছে এবং তারাই এ দেশের ছেলে-মেয়েদের বিপথে নিয়ে গেছে। উসকে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলের উল্লেখ করে বলেন, আমাদের মনে আছে রাজশাহীতে বাংলাভাই সৃষ্টি। প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীরা মিছিল করছে ট্রাকে। পুুলিশ তাদের পাহারা দিচ্ছে। বিএনপির মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী তাদের মদদ দিচ্ছে। তারা প্রকাশ্যে এই সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়েছে, সেটা আমরা দেখেছি। আর এই রাজশাহীবাসীই সেটা প্রত্যক্ষ করেছেন-মানুষ হত্যা করে কীভাবে পায়ে বেঁধে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকে ৮ টুকরা করা হয়েছে। নিরীহ মানুষ, পুলিশ হত্যা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামাতের উদ্দেশ্যে বলেন, এদের চরিত্র কোনো দিনও শোধরাবে না। আর এই সন্ত্রাসের পথ বেয়েই আজকে এসেছে- নতুন উপসর্গ, ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করা।
ভিডিও কনফারেন্সের সময় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক কবির বিন আনোয়ার।
বক্তব্য প্রদানের পর প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের কথা শোনেন। প্রথমেই নাটোর জেলার ১০ টাকা কেজি চালের সুবিধাভোগীর কথা শোনেন। তিনি জয়পুরহাটের একজন কৃষকের, বগুড়ার বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের, একজন সনাতন ধর্মালম্বী মানুষের, একজন পৌর মেয়রের, নওগাঁর একজন কৃষক, একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও একজন নারী চাতাল শ্রমিকের বক্তব্য শোনেন। রাজশাহীতে তিনি একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক, উপজেলা চেয়ারম্যান, সিভিল সার্জন, বিভাগীয় কমিশনার ও একজন প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকের বক্তব্য শোনেন। তারা সকলেই প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রশংসা করেন এবং তার উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। এ সময় অনেকেই বিভিন্ন দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।
রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা, রাজশাহী-৪ আসনের সাংসদ এনামুল হক, সংরক্ষিত আসনের সাংসদ আখতার জাহান, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শাহীন আকতার রেণী, মীর ইকবাল, সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, রজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল হান্নান, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি এম খুরশীদ হোসেন, জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দীন, রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।