সক্ষমতা অর্জনে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কাজ চায় হিজড়ারা

আপডেট: এপ্রিল ২৫, ২০১৭, ১১:২৬ অপরাহ্ণ

মিতি অন্বেষা


হিজড়ারা প্রশিক্ষণ চায়, কাজ চায়- ফাইল ফটো

বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘Vogue’-এ অন্তর্ভুক্ত প্রথম ট্রান্সজেন্ডার অস্ট্রেলিয়ান মডেল এনড্রেজা পেজিক ওই ম্যাগাজিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি চাই সমাজ বুঝুক যে আমরাও মানুষ। এটাই আমাদের জন্য বাস্তবতা এবং আমরা শুধুমাত্র চাই, আমরা যা সেটার স্বীকৃতি এবং বৈধতা এটি আমাদের মানবাধিকার।’
সমাজ মানুষের মধ্যে নানা রকম ভেদাভেদ করে থাকে। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ, দেশ, গোত্র-লিঙ্গ সব কিছু নিয়ে। এই বৈষম্যের রীতি পুরো পৃথিবী জুড়েই আছে। কোথাও কম, কোথাও সামান্য বেশি বা অনেক বেশি। আমাদের এই উপমহাদেশে ভেদাভেদের মাত্রাটা একটু বেশিই। সক্ষমতা অর্জনে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কাজ চায় হিজড়ারা

উইকিপিডিয়া অনুসারে ‘হিজড়া’ শব্দটি আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় বহুল প্রচলিত একটি শব্দ। ইংরেজি ‘হার্মাফ্রেদিতি’ থেকে হিজড়া এর উৎপত্তি এর আভিধানিক অর্থ ‘উভয়লিঙ্গ’। হিজড়াদের সাথে একজন সাধারণ মানুষের পার্থক্য শুধু প্রকৃতিগত। কিন্তু বুদ্ধি, বিবেক দুটি ক্ষেত্রেই এক থাকে। সুতরাং মানব পরিচয় থেকে তাদের আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগই নেই।
বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে হিজড়া জনগোষ্ঠি প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার হয়। তাদের নূন্যতম মৌলিক অধিকারও সমাজ ও রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারে না নানা জটিলতার কারণে। প্রতি ক্ষেত্রেই হিজড়াদের মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়।
সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে দেশে বসবাসরত হিজড়াদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। হিজড়া সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে রাজশাহী মহানগরীতে ২৫০ জন হিজড়া রয়েছে। মহানগরীর বাইরে জেলাতে রয়েছে আরো ২০০ জনের মত হিজড়া।  মহানগরীর হিজড়াদের মধ্যে ৫০ জন বিভিন্ন বাসা, অফিস ও বাজারে চাঁদা আদায় করে। ১০০ জন যৌন পেশার সাথে যুক্ত, ১০ জন ট্রেনে টাকা তুলে এবং ৪০ জন উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ায়Ñ যখন যা ইচ্ছে তা-ই করে। তাদের জীবন-জীবিকার এই কাঠামো আদিকাল থেকে চলে আসছে। তাদের জন্য কোনো ফলপ্রসূ কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা করা এখনো সম্ভব হয়নি।
১১ নভেম্বর ২০১৩ তে বাংলাদেশ সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠিকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি হিজড়াদের মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে একটি বড় ধরনের অর্জন হিসেবেই দেখছেন মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেশী দেশ ভারত ১৫ এপ্রিল ২০১৪তে  হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের পরে আইন পাস হলেও ভারতের বেশ কিছু সাধারণ কর্মক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানজনক জায়গা তৈরি করেছেন তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠি।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-এর মতে ভারতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার মেয়র নির্বাচিত হয় ২০১৫ সালে। রায়গঞ্জ থেকে মেয়র হন Madhu Bai Kinner ( মধু বাই কিন্নর)। মেয়র হওয়ার পূর্বে তিনি ট্রেনে নেচে- গেয়ে অর্থ উপার্জন করতেন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ট্রান্সজেন্ডার মেয়র থাকলেও আমাদের উপমহাদেশে এটিই প্রথম ঘটনা।
ভারতের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার পুলিশ অফিসার দায়িত্ব নেন চেন্নাইয়ের ২৫ বছরের K. Prithika Yashini ( কে প্রিথিকা ইয়াসিনী)।  ১০২৮ জন প্রশিক্ষাণার্থীর মধ্যে তিনিই একমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী ছিলেন। বর্তমানে তিনি তামিল নাড়– পুলিশে কর্মরত আছেন। তামিল নাড়–র একটি টিভি চ্যানেলে সংবাদ পাঠক হিসেবে আছেন পদ্মিনী প্রকাশ। ড. মাধবী বন্দোপ্যাধ্যয় ভারতের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদেন কৃষ্ণনগর ওমেনস কলেজে। তিনি ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে ভারতে প্রথম ডক্টরেট করেছেন।
তদুপরি প্রত্যেকেই তাদের সক্ষমতার শতভাগ প্রমাণ করলেও সমাজ ও সহকর্মীদের নিচ দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হয়েছেন।
ভারতের হিজড়াদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্কিম না থাকলেও অন্ধ্রপ্রদেশে স্থানীয় সরকার সাম্প্রতিককালে হিজড়াদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে সংখ্যালঘু উন্নয়ন বিভাগকে উন্নয়ন ভাতা প্রদানে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদিও ওই রাজ্যের বেশিরভাগ হিজড়া এ সম্পর্কে এখনো তেমন জানেন না।
অপরদিকে তামিল নাড়ুতে সাম্প্রতিক ‘Aravahigal / Transgender Women Welfare Board’গঠন করা হয়েছে। অন্য কোনো রাজ্যে এরূপ কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয় নি।
কিছু হিজড়া হয়তো তাদের যোগ্যতা দিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের সহায়তায় সমাজের সম্মানজনক স্তরে আসতে পারছে। কিন্তু বেশিরভাগ হিজড়াদের অবস্থাই অত্যন্ত করুণ। তারা প্রতিনিয়ত যৌন নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
ভারতে সম্ভব হলেও বাংলাদেশে এখনো বিষয়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং। হিজড়াদের উচ্চপদে যাওয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার এখনো যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে হিজড়ারা সমমর্যাদায় যাওয়ার জন্য যে প্রয়োজনী শিক্ষাগত যোগ্যতা তা তারা সমাজ বাস্তবতার কারণে অর্জন করতে পারছে না। পরিচয় ছাপিয়ে শিক্ষা অর্জন একটা স্তরে গিয়ে আর শেষ করতে পারছে না। দিনের আলো হিজড়া সংগঠনের সভাপতি মোহনা জানান, রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচয় ছাপিয়ে ডিগ্রি পর্যায়ে পাঁচজন, এইচএসসিতে ২০ জন, এসএসসিতে দুজন এবং প্রাইমারি ও উচ্চ বিদ্যালয় মিলে ২৫ জন অধ্যয়নরত আছে।
মূল স্রোতধারার সাথে হিজড়াদের শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনার বিষয়টি এখনো সরকারের কোনো উদ্যোগের মধ্যে পড়ে না। সমাজও হিজড়াদের একীভুত করে শিক্ষাগ্রহণ করতে মোটেও সহনীয় পর্যায়ে নেই। কর্মক্ষেত্রেও সহকর্মীরা হিজড়াদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার রেওয়াজ নেই।
বাংলাদেশের অনন্যা বণিক বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি বেশ কিছু বিদেশি সংস্থার সাথে কাজ করেছেন। তথাকথিত এই আধুনিক ও শিক্ষিত সমাজের সাথে কাজ করতে গিয়েও তাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তার সহকর্মীরা তার সাথে অস্বস্তি বোধ করতো। লাঞ্চের সময় পাশে বসতো না। বণিক লিফটে থাকলে অন্যরা তা ব্যবহার করতো না।
সুতরাং, সামাজিক অবস্থান এখনো ভীষণ রকমের রক্ষণশীল উদার পর্যায়ে নেয়ার জন্য কোনো প্রক্রিয়া-প্রস্তুতিও নেই।  সামাজিক এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে হিজড়াদের সমাজে একীভুত করে দেখার অন্যকোনো বিকল্প নেই। তবে এ জন্য তাদের সক্ষমতা-সম্ভাবনাগুলোকে একটি বিশেষ পরিকল্পনা ও কৌশলের মাধ্যমে জাগিয়ে তোলা, দৃশ্যমান করা দরকার। এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাকে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কারিগরি শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা যা শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রত্যক্ষ জীবিকা অর্জনে সহায়তা করে। দেশের সব জনগোষ্ঠিকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হলে কারিগরি শিক্ষা একটি মোক্ষম হাতিয়ার হবে। কিন্তু আমাদের দেশে শতকরা ৮-৯ ভাগ মানুষ কারিগরি শিক্ষা পেয়ে থাকেÑ অন্তত ২০ শতাংশ যা প্রয়োজন।
কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের পরে শিক্ষার্থীকে বা ব্যক্তিকে পেশা নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। সেই নিজেই তার অর্জিত শিক্ষার সাথে মিল রেখে স্বাধীনভাবে পেশায় নিযুক্ত হতে পারে। ঝরেপড়া শিক্ষার্থী বা কোনো কারণে শিক্ষাবঞ্চিত ব্যক্তির জন্য কারিগরি শিক্ষা আশাতীত সাফল্য এনে দিতে পারে। তবে হিজড়াদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন কৌশলে ভাবতে হবে।
হিজড়া জনগোষ্ঠিকে সাবলম্বী করতে হলে কারিগরি শিক্ষা যুৎসই উদ্যোগ হিসেবে দেশের উন্নয়ন- প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। তবে হিজড়াদের ক্ষেত্রে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা- উদ্যোগ নিতে হবে।
একটি সূত্র মতে, দেশের কারিগরি বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত সরকারি পলিটেকনিকের সংখ্যা ৪৯টি এবং বেসরকারি ৩৮৭টি। এসব পলিটেকনিকে কম্পিউটার, ইলেকট্রিক্যাল, ফুড, মেক্যানিক্যাল, গার্মেন্টস ডিজাইন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, সার্ভেয়িং. এয়ারক্রাফট মেইনটেনেন্স ইত্যাদির মত বহুল প্রচলিত বিষয়গুলোতে ডিপ্লোমা করা সম্ভব। এসএসসি পাস করেই ডিপ্লোমা করা যায়। কারিগরি শিক্ষায় ব্যয় খুবই কম। এছাড়াও রেজল্ট ভাল করলে বৃত্তির ব্যবস্থাও আছে। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পেয়ে থাকে। সরকারের এসব নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে হিজড়া জনগোষ্ঠিও।
হিজড়া জনগোষ্ঠিকে ডিপ্লোমা শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা গেলে তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থা তৈরি করে নিতে পারবেÑ তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির প্রয়োজন হবে। যেমনÑ তাদের সহজ শর্তে কিংবা নিঃশর্তে ঋণ, তাদের জন্য আবাসন পল্লি স্থাপন এবং তাদের উৎপন্ন পণ্য বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা। এ জন্য অবশ্যই রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন আছে।
হিজড়াদের মতে তারা প্রধানত মেয়েদের কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। যেমন টেইলারিং, বুটিক হাউস বা পার্লারের মত কাজ। এছাড়াও গবাদি পশু পালন, কম্পিউটার- মোবাইল ফোনের কাজও রয়েছে তাদের পছন্দের তালিকায়। তাদের এসব ইচ্ছেকে কাজে লাগিয়ে কর্মমূখি করতে জীবনমুখি শিক্ষার পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে।
রাজশাহী মহানগরীতে সরকারিভাবে পলিটেনিক ইন্সটিটিউট (জেনারেল ও একটি মেয়েদের), সার্ভে ইন্সটিটিউট, নার্সিং ইন্সটিটিউিট, হেলথ টেকনোলজি, টেক্সটাইল ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ট্রেনিং প্রশিক্ষণ ( স্কুুল) কেন্দ্র রয়েছে দুটি। এ ছাড়াও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। তারা সহজ শর্তে প্রশিক্ষার্থী উদ্যোক্তদের ঋণ দিয়ে থাকে। এসব কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ও সংস্থায় হিজড়াদের শিক্ষার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে তারা আত্মপরিচয় নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
রাজশাহীস্থ সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, সরকারি এই সংস্থাটি থেকে প্রখমবারের মত ৫০ জন হিজড়াকে ৫০ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে।
প্রশিক্ষণ ব্যাপারে হিজড়ারা বলেছেন, প্রশিক্ষণের উদ্যোগ খুবই ভাল। কিন্তু প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগাতে না পেরে তা অনর্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশিক্ষণকে কর্ম-উদ্যোগে পরিণত করতে তাদের আবাসন সুবিধা ও পুঁজি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্য জনগোষ্ঠির সাথে হিজড়া জনগোষ্ঠিকে একইভাবে বিবেচনা করে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হওয়ার সুযোগ খুবই কম। মনে রাখতে হবে, হিজড়ারা শুধু সমাজ থেকে নয়Ñ পরিবারে থেকে, পরিবারের স্নেহ- ভালবাসা সকল সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন।
ওই হিজড়াদের মতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলো আরো সমৃদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কার্যকর প্রশিক্ষণ এই কারণে দরকার যাতে করে প্রশিক্ষণার্থী নিজেই দক্ষতা অর্জন করে নিজেও প্রশিক্ষক হওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগাতে পারলে অন্য হিজড়াদেরও তা উৎসাহিত করবে। নিশ্চয় অমর্যদার জীবন কেউ চায় নাÑ যদি তার কাছে  সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। হিজড়াদের নিয়ে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে এমনই চাহিদার কথা জানা গেছে।
হিজড়ারা মনে করেন, দেশের বিভিন্ন জেলার হিজড়াদের সমস্যা এবং চাওয়া-পাওয়া নানা রকম। তাই, শুধু রাজধানীকেন্দ্রীক আলোচনা করাই যথেষ্ট নয়। রাজধানীর বাইরের হিজড়াদের মতামতের গুরুত্ব দিতে হবে।
হিজড়ারা বলেন, এই প্রশিক্ষণ নিঃসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। কিন্তু শুধু প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এই প্রশিক্ষণপরবর্তী হিজড়াদের কী করণীয় সেটিও সরকারকেই ভাবতে হবে, সমাধান দিতে হবে। এককভাবে হিজড়াদের জন্য প্রকল্প থাকা প্রয়োজন যেখানে হিজড়াদের পুনর্বাসন সম্ভব হবে। প্রয়োজনে তাদের জন্য পৃথক মার্কেট ও ঋণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
এখানে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, দেশে প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক বেকার, দরিদ্র মানুষ নিজের শক্তিবলেই জীবিকা নির্বাহ করছে তা হলে হিজড়াদের জন্য আলাদা প্রকল্প কেন? এর অন্যতম কারণ হলো- অন্যরা হিজড়াদের মতো সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন নয়Ñ একই সাথে হিজড়া সম্প্রদায় অন্য অবস্থানের চেয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপর্ণ। এই ঝুঁকি একজন হিজড়ার জন্য যেমন, তেমনি সমাজের জন্যও উদ্বেগের। হিজড়ারা মারমূখি- বেপরোয়া, জীবন সম্পর্কে অনেকটাই নির্লিপ্ত, তারা সমাজকে নিজের করে ভাবতে পারে না, তারা পথচারী সহ অন্যদের অপদস্থ করছে, প্রকাশ্যে অশ্লীলতা প্রদর্শন করছে, বিকৃত সেক্স ছড়াচ্ছে, এইচআইভির ঝুঁকিও মারাত্মক। সমাজগতভাবেই হিজড়াদের নাজুক অবস্থানের কারণে এদেরেেক দিয়ে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে যে কারও ব্যবহারের সুযোগ থাকে। এক সাথে এতো ঝুঁকি কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠির মধ্যে নেই। এ থেকে সমাজকে পরিত্রাণ পেতে হলে এদেরকে বিশেষ ব্যবস্থায় পুনর্বাসনের জন্য সরকারকে বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিনিয়োগের পরিমাণ খুব বেশি হবে না সরকারি হিসেবে সারা দেশে হিজড়ারা মাত্র ১০ হাজার।
দেশের ডিপ্লোমা ইন্সটিটিউিটগুলোতে তাদের জন্য বিশেষ অভিগমত্য সৃষ্টির উদ্যোগ এবং এসএসসির নিচে এবং নিরক্ষরদের জন্য বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব স্থানে সরকারের প্রশিক্ষণ স্কুল বা কেন্দ্র রয়েছে সেগুলোতে হিজড়াদের সুযোগ করে দিতে হবে।
হিজড়ারা প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান যাতে করে কাজে লাগাতে পারে সে জন্য তাদেরে আর্থিক ও লজেস্টিক সাপোর্টসহ বিশেষায়িত বাজার সৃষ্টি করা যেতে পারে। প্রশিক্ষিত হিজড়ারাদের গার্মেন্টস শিল্পেও পুনর্বাসন করেও তাদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা বিধান করা যায়।  যৌথ খামার ব্যবস্থাও হিজড়াদের নিয়ে গড়ে তোলা সম্ভব। সমবায়ভিত্তিক এই ব্যবস্থা খুবই কার্যকর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছার।
কারিগরি শিক্ষার প্রসারে সামাজিক উদ্যোগও থাকতে হবে। সমাজের সহায়তা-সমর্থন না পেলে তারা কোনো শিক্ষাই বাস্তবিক কাজে লাগাতে পারবে না। চাঁদা তোলা পেশা থেকে তাদের জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হলে কর্মমুখি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ