সঙ্গীত জগতের উজ্জ্বল তারকা এন্ড্রু কিশোর

আপডেট: জুলাই ১২, ২০২১, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন:


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এরপরও এন্ড্রু কিশোরের গান ট্রেনিং কলেজের মিলনায়তনে একাধিকবার শুনেছি। বেশির ভাগই ছিল আধুনিক গান। ক্রমশ তিনি সঙ্গীতের জগতে পরিচিতি পেতে শুরু করেন এবং তাঁর সঙ্গীত জগতের পরিধি বৃদ্ধি পেতে থাকে। গুরুজনদের পরামর্শে তিনি পাড়ি জমালেন ঢাকায়। বর্তমানের অবস্থা দেখে মনে হয় বাংলাদেশ মানেই হচ্ছে ঢাকা। সবকিছুই ঢাকাতে কেন্দ্রিভূত হতে আরম্ভ করছে। লেখাপড়া, ধন, দৌলত, চাকরি-বাকরি, মেধা, সঙ্গীত অঙ্গন, সুযোগ-সুবিধে ইত্যাদি ভোগ করতে হলে ঢাকাতে আসতেই হবে। ঢাকা এসে প্রথম দিকে তিনি পড়লেন ফাঁপরে। তিনি কোনো সঙ্গী পাচ্ছেন না, কথা বলার লোক নেই, বন্ধু বান্ধব তেমন নেই। কী করা যায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করারও তেমন সুযোগ সুবিধে পাচ্ছেন না। তবে মাঝে মধ্যে ছোট-খাটো অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের সুযোগ পেলেও প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হওয়ার ব্যাপারে তা যথেষ্ট ছিল না। এদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ম্যাডাম সাবিনা ইয়াসমীন এই প্রতিভাবান শিল্পীকে কিভাবে যেনো আবিষ্কার করলেন, সে ইতিহাস আমি জানিনা, তবে ম্যাডাম সাবিনা ইয়াসমীন তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে লাগলেন। একবার ম্যাডাম সাবিনা ইয়াসমীন তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে একটি ডুয়েট গান গাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। এই ডুয়েট গানটি খুবই ভাল হয়েছিল। কিশোরের ভরাট গলায় দরাজ কণ্ঠে গীত বেশ কয়েকটি গান শুনে তিনি তাঁর মধ্যে আশার আলো দেখতে পান। এমনও শুনেছি সিনেমার গান রেকর্ডিং এর সময় ম্যাডাম প্রস্তাব করলেন এই ডুয়েট গানটি তিনি এন্ড্রু কিশোরকে নিয়ে গাইবেন। প্রযোজকের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি কিশোরকে নিয়েই গানটি গেয়েছিলেন। আর যায় কোথায়, এই গানেই তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। ম্যাডাম সাবিনা ইয়াসমীন অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন এবং তখন থেকেই কিশোর এই শিল্পীর আর্শীবাদ পেতে থাকেন। তার পর থেকে কিশোরকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সামনের দিকেই এগিয়ে চলেছেন। কিশোর ম্যাডামকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। আমরাও ম্যাডামের মনের প্রসারতা ও উদারতার প্রশংসা না করে পারিনা। সাবিনা ইয়াসমিনের পাঁচ বোনকেই আমি চিনতাম। তাঁর তিন নম্বর বোন নাজমা ইয়াসমীন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে আমার প্রিয় ছাত্রী ছিলেন। লেখাপড়ায়, তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। বি.এড. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তিনি ভাল অভিনয় করতেন এবং নাচতেও পারতেন। তিনি গানের চর্চা করেননি, তবে তাঁর চার বোনই সঙ্গীত জগতে এক এক জন তারকা। তারা হলেন ফরিদা ইয়াসমীন, ফওজিয়া ইয়াসমীন, নিলুফার ইয়াসমীন ও ম্যাডাম সাবিনা ইয়াসমীন (সব ছোট)। নাজমা ইয়াসমীন ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, অমায়িক এবং মুরুব্বিদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। দেখা হলে তিনি যে সম্মান দেখান, তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। তাঁর পরিবারের সকল সদস্যের আচার-আচরণ অত্যন্ত মার্জিত ও ভদ্র। তাঁদের কারও মধ্যে কোনো আত্ম গরিমা বা অহমিকা দেখিনি। পরিবারটি আসলেই ভাল।
এরপর থেকে এন্ডু কিশোরর অসংখ্য আধুনিক গান শুনেছি। টেলিভিশনে, সিনেমায় এবং মঞ্চে। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে মীরপুর এলাকা বেশ কয়েক ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত হয়। বনানী এলাকা, মতিঝিল এলাকা এবং ঢাকার অধিকাংশ অংশেই কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। যাতায়াতের জন্য নৌকা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। আমি ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসের ৩০ তারিখ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ থেকে আমি অবসর গ্রহণ করি। বন্যা আরম্ভ হওয়ার পর থেকেই টেলিভিশনে বানভাসী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে একটি জনপ্রিয় গান প্রায়ই প্রচারিত হতো। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য গানটির গায়ক কে, গীতিকার কে কোনো কিছুই বলা হতো না। কেবল গানটাই শোনা যেতো। সঙ্গীত জগতের উপর আমার মোটামুটি ধারণা আছে। গানটি একেবার মনে হলো সৈয়দ আবদুল হাদীর কণ্ঠ থেকে আসছে। পরক্ষণেই মনে হতো এটি মনে হচ্ছে এন্ড্রু কিশোরর কণ্ঠ। গোলক ধাঁধাঁয় পড়ে গেলাম। আমার এক সহকর্মী কাজী সিরাজকে বললাম, “তুমি তো গানটি নিশ্চয়ই শুনেছো।” তিনি বললেন “হ্যাঁ স্যার গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শ্রুতিমধুর।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম “সিরাজ তুমি তো মিডিয়াতে যাওয়া আসা করো, দেখতো গানটি কে গেয়েছেন? আমার মনে হচ্ছে গানটি আবদুল হাদীরই গাওয়া, তবে আমি নিশ্চিত না।” সঙ্গে সঙ্গে আমার সামনে সিরাজ জিজ্ঞাসা করলো “হাদী ভাই আমি সিরাজ বলছি। আমার স্যার আমার সামনেই বসা, তিনি নিশ্চিত হতে চান, গানটি কার কন্ঠে গাওয়া।” প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী আবদুল হাদী, জবাŸ দিলেন, “সিরাজ গানটি খুবই ভাল হয়েছে, কথাগুলো আরও ভাল, তবে গানটি গেয়েছে এন্ড্রু কিশোর, আমি না।’ তার পরই নিশ্চিত হলাম কিশোর একজন খুব বড় মাপের সঙ্গীত শিল্পী। তার তুলনা তিনি নিজেই। বাংলা গান সম্পর্কে মন্তব্য করতে যেয়ে তিনি বলেছেন “ বাংলা গান হলো মেলোডি প্রধান। যত যাই হোক না কেন কোনো গানে যদি রোমান্টিসিজম বা মেলডি কম থাকে তবে তা বেশিদিন স্থায়ীত্ব পায় না। সবার হৃদয় তরে দোলা দেয়া যায় না।
এন্ড্রু কিশোর সিনেমায় অসংখ্য গান গেয়েছেন। “বড় ভাল লোক ছিল” সিনেমায় অন্য একটি গানে কণ্ঠ দিলেন, “হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস দম ফুরালে ঠুস, তবু তো ভাই কারও নাই একটু খানি হুস, হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস”। গানটি হিটগান সন্দেহ নেই। এ ধরনের গান পরিবেশন করে তিনি খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করলেন। তিনি টেলিভিশনে তেমন একটা গান গাইতেন না। তার একটি কারণও ছিল। শিল্পী হিসাবে তালিকাভুক্ত হতে হলে বি.টি.ভিতে অডিশন দেয়া লাগে এবং দিতেই হবে। তিনি বাদ সাধলেন, না তিনি অডিশন দিয়ে তালিকাভুক্ত হতে চান না। তাঁর ধারণা তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত শিল্পী তাঁর অডিশন লাগবে কেন? কিন্তু প্রতিষ্ঠানের যে কোনো আইন বা বিধান সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এখানে কোনো ব্যতিক্রতি কিছু নেই। ফলে তাঁকে তালিকাভুক্তি করা হয়নি। এ বিষয়টি কতখানি সত্য আমি নিশ্চিত নই। অবশ্য এ বিষয়টি সত্যি যদি হয় থাকে, তবে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তাঁর এ ধরনের কোনো অহমিকা বা আত্মগরিমা ছিল না। আমি যতটুকু তাঁকে দেখেছি এবং শুনেছি তিনি আইনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। কাজেই আইন অমান্য করার মতো কোনো রকম প্রবণতা তাঁর মধ্যে কোনো দিনই দেখা যায়নি।
আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি, আমার জ্যেষ্ঠপুত্র ডা. মুক্তাদির এন্ড্রু কিশোরের সমবয়সী এবং তারা বন্ধুও বটে। আমাদের নাতনীর বিয়েতে অর্থাৎ মুক্তাদিরের বড় মেয়ের বিয়েতে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই তো সেদিনের কথা। তাঁর অসুস্থ হওয়ার কয়েক মাস পূর্বে। তিনি বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন এবং আমার ছেলে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পরে তিনি শতশত মেহমানের উপস্থিতিতে আমার পা ছুঁয়ে সালামও করলেন। সব সময়েই হাসিহাসি মুখ। তাঁকে ভাল করে এবং সামনা-সামনি দেখার জন্য আশেপাশে মানুষের জটলা। তখনও আমরা ভাবতে পারিনি যে, কিশোরের সেই হাসি মুখখানা দেখার এই শেষ দেখা। বছর না ঘুরতে শুনলাম কিশোর অসুস্থ। দুরারোগ্য ক্যান্সার ব্যধিতে আক্রান্ত। বড়ই দুর্ভাগ্য আর দেখা হয়নি। দেশে বিদেশে চিকিৎসা চলতে লাগলো। নিয়ে যাওয়া হলো সিঙ্গাপুরে, ভর্তি করা হলো এক নামী-দামী হাসপাতালে। পৃথিবীর যাবতীয় বড় বড় ডাক্তার ও হাসপাতালের দেখা মিলে এই সিঙ্গাপুরে। চিকিৎসাও ভাল। যে কোনো জটিল রোগে চিকিৎসার ব্যাপারে সিঙ্গাপুরই শ্রেষ্ঠ। যদিও এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। চিকিৎসা চলতে লাগলো দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, কিন্তু না শেষ রক্ষা হয়নি। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই তাঁর শারীরিক অবস্থার খবর পেতাম। কখনও ভাল, কখনও আবার মন্দ, সব রকমই খবর জানাতো। খরচও বাড়তে থাকে, লক্ষ থেকে কোটিতে পৌঁছিল। বাংলাদেশ সরকারও যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। তাঁর চিকিৎসায় যাতে কোনো অসুবিধা না হয় যে জন্য বাংলাদেশের সংস্কৃতির অঙ্গনের নক্ষত্ররা চ্যারিটি শোর ব্যবস্থাও করেছিলেন। কিন্তু না কোনো কিছুতেই তাঁকে ধরে রাখা যায়নি। এ যে বিধির বিধান। সময় হলে সবারই যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

সিঙ্গাপুর থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে বাংলাদেশ আনার ব্যবস্থা হলো বহুকষ্টে। সমগ্র পৃথিবী তখন করোনা ভাইরাসের মহামারিতে আক্রান্ত ছিল। ফলে তাঁকে আনতে বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে থাকতো অস্ট্রেলিয়ায়। তাদের দেশে আনার ব্যবস্থাও হলো। তাঁর সম্ভবত ঢাকাতে বেশি সময় অবস্থান করার সুযোগ হয়নি, সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রাজশাহীতে, তাঁর জন্ম স্থানে। তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কয়েকদিন রাখা হয়েছিল অজ্ঞান অবস্থায়। সেখান থেকেই তিনি প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। দিনটি ছিল ৬ জুলাই, ২০২০। কী মর্মান্তিক! তাঁকে তাঁর মায়ের কবরের পাশে তাঁদের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়। উল্লেখ্য যে, তাঁর মৃত্যুর সংবাদ অতিদ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়লো রাজশাহীতে। ফলে সমগ্র রাজশাহী ব্যাপি শোকের ছায়া নেমে আসে। সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা কারও ছিল না। তাঁর স্ত্রীও সঙ্গে ছিলেন। রাজশাহী তাঁর অতিপরিচিত। কেননা তিনি রাজশাহী রুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। এন্ড্রু কিশোরের বাবা, মা, বড় ভাই, বোন বেশ কিছুদিন পূর্বেই অকাল মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিশোরের মৃত্যুর পর বেশকিছু শোকবাণীও এসেছিল। তারপর সবশেষ। কার খবর কে রাখে।
পরিশেষে বলতে চাই, কিশোর তুমি বড়ই ভাগ্যবান। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তুমি সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের স্থান করে নিয়েছিলে। বাংলা গানের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তোমার পদচারণা ঘটেনি। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রে তুমি কন্ঠ দিয়েছ। তুমি প্লেব্যাকের স¤্রাট হিসেবে সমাধিক পরিচিতি পেয়েছো। বাংলা গানের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ লাভ করেছ মোট আটবার চলচ্চিত্র পুরস্কার। এত বড় শিল্পী হয়েও তোমার কোনো আত্মগরিমা বা অহমিকা দেখিনি। তুমি মানুষ হিসেবে ছিলে অত্যন্ত উদার। তোমার মধ্যে কোনো হিংসা বিদ্বেষ কোনো কিছু দেখা যায় নি। তুমি ছিলে পরিছন্ন মনের সজ্জন এক ব্যক্তি। মান-সম্মান যথেষ্ট পেয়েছে, পেয়েছো উভয় বাংলার কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালবাসা। তোমার অকাল মৃত্যুতে ব্যথিত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি, শোক জানাবার ভাষা আমাদের নেই। তুমি ইহকালে সুখে ছিলে, পরকালেও সুখে থাকো। সৃষ্টিকর্তার কাছে এই আমাদের প্রার্থনা।
লেখক: (অব:) চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।