সঞ্চয়পত্র ও বিড়ম্বনা

আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০২১, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


যত হম্বিতম্বি সঞ্চয়পত্রের উপর। ২০১৫ সালের পর থেকে পর্যায়ক্রমে অনাকক্সিক্ষত অব্যাহত আছে সঞ্চয়পত্রের উপর। প্রথমেই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ২% কমানো হলো। ১৩.২৫% এর স্থলে ১১.২৫%। এরপর উৎসেকর ৫%এর স্থলে ১০% হারে কাটা শুরু হলো। এতে সরকার খুশি হতে পারলো না। এবার সঞ্চয়পত্রের ক্রয়ের সীমা নির্ধারণ করা হলো। ৩০ লাখ টাকার উপরে একনামে সঞ্চয়পত্র কেনা যাবেনা। এরপর নির্দেশ জারি হলো এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনলে টিন সার্টিফিকেট লাগবে। সাধারণ মানুষ তাদের শেষ সঞ্চয়টুকু সযতনে রক্ষা করে কিছু লাভের আশায় আয়কর অফিস থেকে টিন সার্টিফিকেট সংগ্রহ করলো। এরপর আইন জারি হলো প্রত্যেক টিন সংগ্রহকারিকে প্রতি বছর রিটার্ন জমা দিতে হবে আয়কর অফিসে।

যদি সে আয়করের আওতায় না পড়ে তবুও। যদি রিটার্ন জমা না দেয় তবে তাকে প্রতিবছর ১৯ হাজার টাকা জরিমনা গুনতে হবে। এতেও সন্তুষ্টি হলোনা। সঞ্চয়পত্র ক্রয়কারিদের উপর আর এক আইন জারি হলো। যদি কেউ সঞ্চয়পত্র কিনতে মিথ্যা তথ্য দেয় তার জন্য সর্বোচ্চ ৬ মাসের জেল বা ১ লাখ টাকা জরিমনা বা উভয় দ-ে দ-িত হবে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা ইতোমধ্যে সরকারি ঋণ আইন ২০২১ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এরপরেও সঞ্চয়পত্রের উপর গোস্বা কমেনি। সেপ্টেম্বর/২১ এ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপণে বলা হয়েছে, ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করলে বা সঞ্চয়পত্র কিনলে সুদের হার আগের মতই থাকবে। কিন্তু তার বেশি হলে সুদের হার ১%-২% কম হবে।
দফায় দফায় সঞ্চয়পত্রের উপর এই অত্যাচার কেন? সরকারের বিধান অনুযায়ী সঞ্চয়পত্র ক্রয়কারীরা তো উৎসে কর দেয়। এসব অত্যাচারের ফলে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, স্বল্প আয়ের মানুষ, ক্ষুদে ব্যবসায়ী, তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণির সরকারি বেসরকারি কর্মচারীরা বিপর্যস্ত ও বিব্রত। তারা তাদের ভবিষ্যতের সঞ্চয় কোথায় রাখবে? তাদের জন্যই সঞ্চয় স্কিম চালু হয়েছিল, তাদের জন্যই তো সঞ্চয় অধিদপ্তরের জন্ম হয়েছিল। তাদের সঞ্চয়ের টাকাই তো সরকার জরুরি মুহূর্তে ঋণ নেয়, ব্যবহার করে। তাদের উপর এতো বিধিনিষেধ কেন? তারা সঞ্চয়পত্র কিনে বন্ধনের মধ্যেই রয়েছে। সরকার ইচ্ছে করলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে ১০% এর স্থলে ২০% আয়কর কেটে নিতে পারে। এযন্ত্র তো সরকারের কাছেই আছে। কিন্তু এসব আইন ও বিধিনিষেধ সঞ্চয়পত্র ক্রয়কারীদের শুধু আতঙ্কগ্রস্ত করবে এবং সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের পরিমাণ কমে যাবে।

সম্প্রতি ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটবুরোর সভায় রাসেদ খান মেননের সভাপতিত্বে পার্টি অফিসে অনুষ্ঠিত সভায় দলের নেতারা বলেন, এর আগে সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর বৃদ্ধি করেছে সরকার। এখন আবার সাধারণ মানুষের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে সুদের হার কমিয়ে তাদের আয় সঙ্কুচিত করা হলো। দেশে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি অর্থনৈতিক লুটপাট হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে অর্থমন্ত্রী গরিবের সংসারে হাত দিয়েছেন। বিগত সংসদে সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর বাড়ানোর প্রস্তাব করে অর্থমন্ত্রী তার নিজ দলীয় সদস্যদের তোপের মুখে পড়েন। তৎকালীন কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এর তীব্র সমালোচনা করেন। এবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর বিষয়টি সংসদের পাশ কাটিয়ে হঠাৎ করে ঘোষণা দিলেন।
জানা গেছে, জুলাই/২০ থেকে মার্চ/২১ পর্যন্ত ৮৫ হাজার ৯৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে এবং আগের বিক্রিত সহ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার সঞ্চপত্র জনসাধারণের হাতে আছে। এ পরিমাণ সঞ্চয়পত্রের সুদ থেকে ১০% হারে উৎসে কর কাটলে সরকার এখনো দেড় হাজার কোটি টাকা পাচ্ছে। অন্যদিকে ঋণ খেলাপিদের কাছে পড়ে আছে সুদাসলসহ ২লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এটা ২০২০ সালের হিসাব। এখান থেকেও সরকার উৎসে কর বাবদ ২ হাজার ২শ কোটি টাকা পেতে পারতো। কিন্তু সুদ ও আসল তো দূরের কথা উৎসে করটাও পাচ্ছেনা। আর এই ঋণ খেলাপিদের দফায় দফায় ছাড় দিতে দিতে একসময় হয়তো পুরো টাকাটাই ছেড়ে দিবে। অর্থমন্ত্রী তো বলেছেন, খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দেশের অর্থনীতিই ভেঙে পড়বে। একসময় নিয়ম ছিল ঋণগ্রহিতা বছর শেষে একবার একঘণ্টার জন্য হলেও পুরো টাকা জমা দিয়ে ঋণ নবায়ণ করবে। সেটা কবেই হারিয়ে গেছে ঋণ খেলাপিদের চাপে। ক্রমশ সেটা কমতে কমতে মাত্র ১০% টাকা জমা দিয়েই নবায়ণ করার পদ্ধতি চালু হয়। এটাও সর্বশেষে২% এ নেমে এসেছে। তারপরেও ঋণ খেলাপিরা তাদের ঋণ নবায়ন করেনি। বরং কোনো অর্থ জমা না নিয়েই নবায়ণ করে দিতে হয়েছে। একসময় দেখা যাবে কাগজে কলমে খেলাপিদের তালিকা আর খেলাপিরা হবে দেউলিয়া। কই তাদের উপর তো কোনো চাপ সৃষ্টি করা হয়নি, জেল জরিমনার ভয় দেখানো হয়নি বা কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তার রিটার্ন দাখিল তো দূরের কথা তাদের ধারে কাছেও পৌঁছাতে পারে না আয়কর বিভাগ। বরং শিল্প-উদ্যোক্তাদের কৃত অপরাধের বিরুদ্ধে মামলা করা হলে তারা উৎকণ্ঠিত হয় এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য সরকারের কাছে আইন করার দাবি জানায়। তাদের শিল্পের ক্ষতি হলে শ্রমিক বেকার হবে বলে সরকারকে ভয় দেখায়। অথচ বাঁধা গরু সঞ্চয়পত্র ক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে সরকার খড়গহস্ত। এটা দুষ্টের লালন আর শিষ্টের দমনের রাষ্ট্রে পরিণত হলোনাতো? সর্বোপরি সঞ্চয়পত্রের উপর বিধিনিষেধ যাদের জন্য করা সেই সম্পদশালীরা দিব্যি নির্বঘেœ ফাঁক দিয়ে পার পেয়ে যাবে। আর সেই জালে ধরা পড়বে তারাই যারা সারা জীবন ধরে সঞ্চয় করতে করতে শেষ জীবনে হয়তো ৪০/৫০ লাখ টাকা সঞ্চয় করে তার মুনাফা দিয়ে সংসার চালায় তারাই। কারণ বৃদ্ধ বয়সে তাদের আয় রোজগারের বিকল্প ভাল কোনো পথ নেই। সঞ্চয়পত্রের উপরেই নির্ভরশীল।
লেখক : সাংবাদিক