সদকাতুল ফিতরের পরিমাপ

আপডেট: মে ৮, ২০২১, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ:


ইসলামী অর্থনীতিতে জাকাত অত্যন্ত কার্যকরী ভুমিকা পালন করে। এটা ধনীদের পক্ষ থেকে গরীবদের প্রতি কোন অনুগ্রহ নয়। যাকাতের কয়েকটি প্রকার রয়েছে, তার অন্যতম হল সদকাতুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের দিনে কোন ব্যক্তি নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক হলে তাকে এই সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হয়। এটা একটি ওয়াজিব ইবাদত। উল্লেখ্য যে, যাকতের নিসাবের ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবপত্র ইত্যাদি গণ্য হয় না। বরং এগুলি ব্যতীত নিসাবের মালিক হওয়া এবং তা পূর্ণ বর্ষ স্থায়ী হওয়া জরুরী। পক্ষান্তরে সদকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে পরিবারের অত্যাবশ্যকীয় আসবাব ব্যতীত অন্যান্য আসবাব, সৌখিন দ্রব্য সামগ্রী ইত্যাদি মূল্য হিসেবে গণ্য করতে হয়।
সদকাতুল ফিতর সংক্রান্ত হাদীসগুলি অনুসন্ধান করে আমরা দেখতে পাই যে, সেখানে যব, খেজুর, কিসমিস, গম, পনিরের কথা বলা হয়েছে। আলোচ্য বস্তুগুলির মধ্যে গম ব্যতীত অন্যগুলি দ্বারা আদায় করলে পূর্ণ এক ‘সা’ আদায় করতে হয়। শুধুমাত্র গমের ক্ষেত্রে অর্ধ ‘সা’। ৮০ তোলা সের হিসেবে ইসলামী আইন শাস্ত্রে এইগুলোর হিসেব লিপিবদ্ধ আছে। সে হিসেবে পূর্ণ এক ‘সা’ এর পরিমান হল ৩ সের ৯ ছটাক। বর্তমান কিলোগ্রামের হিসেব বের করলে তার পরিমাণ দাঁড়ায় এক ‘সা’ সমান ৩.৩০০ কেজি এবং অর্ধ ‘সা’ সমান ১.৬৫০ কেজি। যদি আমাদের দেশে সহজ লভ্য উন্নতমানের খেজুর হিসেবে ফিতরা আদায় করি তাহলে তার পরিমাণ হবে বর্তমান বাজার মূল্য ১২০০ টাকা কেজি হিসেবে ১২০০´৩.৩০০= ৩৯৬০ টাকা প্রতিজন। মধ্যমমানের খেজুর হিসেবে বর্তমান বাজার মূল্য ৬০০ টাকা কেজি হিসেবে ৬০০´৩.৩০০= ১৯৮০ টাকা প্রতিজন। নিম্ন মানের খেজুর হিসেবে বর্তমান বাজার মূল্য ২৫০ টাকা কেজি হিসেবে ২৫০´৩.৩০০= ৮২৫ টাকা প্রতিজন।
পনির বর্তমান বাজার মূল্য ৬৫০ টাকা কেজি হিসেবে ৬৫০´৩.৩০০= ২১৪৫ টাকা প্রতিজন। কিসমিস বর্তমান বাজার মূল্য ৩৫০ টাকা কেজি হিসেবে ৩৫০´৩.৩০০= ১১৫৫ টাকা প্রতিজন। যব বর্তমান বাজার মূল্য ৩২ টাকা কেজি হিসেবে ৩২´৩.৩০০= ১০৫.৬০ টাকা প্রতিজন। গমের আটা বর্তমান বাজার মূল্য উন্নত ৩২ টাকা কেজি হিসেবে ৩২´১.৬৫০= ৫২.৮০ টাকা প্রতিজন। গমের আটা বর্তমান বাজার মূল্য মধ্যম ৩০ টাকা কেজি হিসেবে ৩০´১.৬৫০= ৪৯.৫০ টাকা প্রতিজন । উন্নতমানের আটা ৩৫ টাকা কেজি হিসেবে ৩৫´১.৬৫০= ৫৭.৭৫ টাকা প্রতিজন।
মূলত গম দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায়ের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয় হযরত আমীর মুআবিয়া (রা.)-এর শাসনামল থেকে। সে যুগে গম ছিল অত্যন্ত মূল্যবান এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদ্য। আমাদের দেশে সাধারণত একচেটিয়া গমের হিসেব প্রকাশ ও প্রচার করা হয়। সে হিসেবে এ বছর রাজশাহীতে জনপ্রতি ৫৭.৫০ টাকা ধরে জন প্রতি ৬০ টাকা এবং ঢাকায় জনপ্রতি ৭০ টাকা সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অনুপাতে আদায় করলে সদকাতুল ফিতর আদায় হবে। তবে সমাজের প্রত্যেকেই যদি স্বীয় সামর্থানুযায়ী সদকাতুল ফিতর আদায় করেন তাহলে অধিক পরিমাণে আদায় করার মাধ্যমে হকদার গরীবরা লাভবান হবেন। এছাড়া হাদীসে বর্ণিত প্রতিটি ব¯ুÍ দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করে সে সুন্নাতের আমল জারী রাখা হবে। কেননা আজ পর্যন্ত কেউ এ কথা বলেননি গম ব্যতীত হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য বস্তুকে মাপকাঠি বানিয়ে সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে। যেহেতু তা রহিত হয়নি, তাই যারা সামর্থ্যবান তাদের উচিত উচ্চপরিমাণে সদকাতুল ফিতর আদায় করা। এটা ইনসাফের কথা। এই ঈদে যিনি ঈদের বাজার করেছেন লক্ষাধিক টাকার তিনিও দিবেন ৬০ টাকা হারে সদকাতুল ফিতর আর যে মাত্র কয়েক হাজার টাকার বাজার করেছেন তিনিও দেবেন ৬০ টাকা হারে সদকাতুল ফিতর- এটা ইনসাফ হলো না। বিষয়টি নিয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ভাবতে হবে।
ইসলামের ইতিহাসে এমন নযির পাওয়া বড়ই দুষ্কর এবং দুরূহ ব্যাপার যে, সর্বশ্রেণীর মুসলমান একযোগে সর্বনিম্ন মূল্যের ব¯ুÍ দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করছেন। এ পন্থায় কিছু বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয়। একজন কোটিপতি যার পোষ্য মোট তিনজন তিনি সদকাতুল ফিতর আদায় করছেন ৬০´৩=১৮০ টাকা পক্ষান্তরে একজন সামান্য আয়ের মানুষ যার পোষ্য আটজন তিনি সদকাতুল ফিতর আদায় করছেন ৬০´৮=৪৮০ টাকা। এটা কোনক্রমেই বিবেক গ্রাহ্য হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে যদি কোটিপতি ব্যক্তি উন্নত মানের খেজুর হিসেবে আদায় করতেন তাহলে তাকে জনপ্রতি সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হতো ৩৯৬০ টাকা, তিনজনের জন্য ৩৯৬০´৩= ১১৮৮০ টাকা। আমরা সবকিছুতে স্ট্যাটাস বজায় রাখার চেষ্টা করি। যাদের সামর্থ্য আছে তারা স্ট্যাটাস বজায় রাখতে দামী বস্তু ব্যবহার করেন। সেই স্ট্যাটাসের দাবী হলো স্ট্যাটাস অনুপাতে ফিতরা আদায় করা।
আল্লাহ আমাদের যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী