সন্ত্রাসবাদ দমনে যা করণীয়

আপডেট: জানুয়ারি ৬, ২০২২, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

আব্দুল মজিদ


সন্ত্রাসবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা,আর তাই এর ঢেউ বলতে গেলে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আছড়ে পড়েছে এবং এখনও পড়ছে। সুতরাং নিজেদের দেশের জনমানুষের কল্যাণে দেশের অভ্যন্তরে এর রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত থাকার প্রয়াসে নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যেতেই হবে। এর অন্যথা করলে সমাজের স্বাভাবিক ছন্দ এবং হারমনি বিনষ্ট হতে বাধ্য। দেশের সার্বিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে এ কথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। লেখা বাহুল্য বাংলাদেশ সরকার সন্ত্রাসবাদ নিরসনে গ্রহণযোগ্য, যথার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু তথাপিও আমাদের দেশে এর আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া যাচ্ছে না কেন?
এর সঠিক উত্তর খুঁজতে গেলে অবশ্যই যথাযথ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিতপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। আর একবার যদি সমস্যা চিহ্নিত করা যায় তাহলে দেশব্যাপি বিধিবদ্ধভাবে জরিপ চালিয়ে সন্ত্রাসবাদের উত্থান, উৎস, বিস্তার, সন্ত্রাসবাদের কারণ ইত্যাদি সম্পর্কে যেমন জানা যাবে তেমনি সন্ত্রাসবাদের মেকানিজম, এর প্রতিকার, প্রতিরোধ, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকরি ভূমিকা ও তাদের সামর্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে। এ ছাড়াও এ বিষয়ে যাঁরা বিশেষজ্ঞ ক্রিমিনোলজিস্ট এবং আরও যাঁরা সংশ্লিষ্ট আছেন তাঁদের কাছ থেকেও মতামত নেয়া যেতে পারে। সত্যি কথা বলতে কী বাংলাদেশেকে সন্ত্রাসবাদের হুমকি ও ভয়াবহতা থেকে মুক্ত করতে হলে সবার অংশগ্রহণে বিশেষ এক সমন্বিত (হলিস্টিক) অ্যাপ্রোচ তথা প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

সকল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচিতে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের কুফল সম্পর্কে বিস্তারিত এবং সতর্ক আলোচনা অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। ফলে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা সন্ত্রাসের ধরন, প্রকৃতি এবং এছাড়াও সন্ত্রাসে সম্পৃক্ত হওয়ার লাভ-ক্ষতি সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে এবং আত্মসংশোধনে উদ্বুদ্ধ হবে। অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মাধ্যমে সচেতনতাবোধ সৃষ্টি করার আন্তরিক প্রয়াস সন্ত্রাসবাদ দমনের ব্যাপারে ধনাত্মক ভূমিকা রাখতে পারবে বলে সচেতন মহল বিশ্বাস করেন। মূল বিষয় হলো সন্ত্রাসবাদ ইস্যুটাকে সব সময়ই আলোচনার বা বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে যাতে করে সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টি বুঝতে পারে,অনুধাবন করতে পারে এবং প্রয়োজনানুসারে নিজেদের স্বার্থেই পরিবারের সবাই সচেতন এবং দায়িত্বশীল হয়। উপরন্তু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দেরও দেশের সার্বিক উন্নয়ন তথা সামাজিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে মনে-প্রাণে মতৈক্যে পৌঁছানো প্রয়োজন। কারণ রাজনৈতিক ঐক্য ছাড়া কোন ধরনের অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার সমূলে বিনাশ করা যায় না। এ কথা বললে বোধ হয় অত্যুক্তি করা হবে না-সেটা হলো আমাদের দেশেও যত সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরি হয়েছিলো বা হচ্ছে তাদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গোপন বা প্রকাশ্য যোগাযোগ ছিল না বা নাই। এ ধরনের ঘটনা না ঘটলে সন্ত্রাসীরা কোনো ক্রমেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারতো না বা এখনও পারে না। এমন অভিযোগও অস্বীকার করা যাবে না যে-সন্ত্রাসীদের অনেকেই দুর্বৃত্ত ও অসৎ রাজনৈতিক নেতাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি বা হচ্ছে না। যার ফলে রাজনৈতিক শিষ্টাচার, শালীনতা, ভদ্রতা, সুস্থ প্রতিযোগিতা, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কাজেই দেশের বৃহত্তর কল্যাণে রাজনৈতিক দলগুলোর ন্যূনতম কিছু বিষয়ে ঐক্য অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশের জন্যও বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা না হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হতে বাধ্য।

এহেন অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের উঁচু পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত অর্থবহ সংলাপের আয়োজন বর্তমানে রীতিমতো অত্যাবশক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধ, অবিশ্বাস, হানাহানি, মারামারি, বিশৃঙ্খলা দূর করার অন্যতম উপায় হলো পারস্পরিক সংলাপ। সংলাপের ইতিবাচকতাই বেশি। রাষ্ট্রীয় কোনো প্রয়োজনীয় বা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতান্তর থাকলে তা মীমাংসার জন্য সংলাপের আশ্রয় নেয়াই বেহেতর। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারেও আন্তর্জাতিকভাবেও সংলাপের আয়োজন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সংলাপের আয়োজনে কমবেশি ফলপ্রসূ ফলাফল এসেছে। এমন ঘটনাও ঘটেছে সন্ত্রাসী কর্মকা- থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য সন্ত্রাসীদের সাথেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের
সংলাপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে বেশ কিছু ভালো সিদ্ধান্ত ও সমাধান বের হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে সুন্দরবনের দস্যুতা ও তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টির কথা উল্লেখ করা যেতেই পারে।

এ ধরনের সংলাপের ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক, সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি করে তাঁদের মতামত এবং সুপারিশ নেয়া যেতে পারে যার ফলে সন্ত্রাসবাদ প্রতিকার ও প্রতিরোধে একটি সামষ্টিক ও গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া সহজতর হতে পারে। তবে মোদ্দা কথা হলো সন্ত্রাসবাদ নিরসন বা নিয়ন্ত্রণে সবাই মিলে আত্মসংশোধনপূর্বক কাঁধে কাঁধ রেখে আন্তরিক ও নির্মোহভাবে কাজ করে যেতে হবে। কিছু কিছু বিষয় যেমন মানি লন্ডারিং এবং অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা যে ভাবেই হোক বন্ধ করতে হবে। অস্ত্রের সরঞ্জামাদি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ছাড়া আমদানি রফতানি নিষিদ্ধ করতে হবে। সন্ত্রাসবাদের কালো থাবা থেকে দেশকে মুক্ত রাখার নিমিত্তে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকে অনলস পরিশ্রম করে যেতে হবে। অন্যথায় যা হবার তাই হবে অর্থাৎ ভেতরে ভেতরে সমস্যা জিইয়ে রেখে বাইরে বাইরে শুধু প্রলেপই দেয়া হবে কাজের কাজ খুব একটা হবে বলে মনে হয় না। আমাদের মতো দেশ থেকে সন্ত্রাসবাদের ভয় ও হুমকি ধামকি থেকে মানুষকে রেহাই দিতে গেলে রাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও পুলিশ বাহিনীকে অত্যন্ত শক্তিশালী, যুগোপযোগী এবং উজ্জীবিত রাখতে হবে। কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে নির্মোহভাবে নিয়োগদান সম্পন্ন করার পর উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের প্রযুক্তিমনস্ক করে গড়ে তোলা, পঠন পাঠনে আগ্রহী করাসহ সৎ ও নীতিবান অফিসারদের অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ প্রদান করতে পারলে বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাসবাদের ভয় ও নানাবিধ হুমকি ধামকি থেকে জনমানুষকে মুক্ত রেখে জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলেই বিজ্ঞজনদের বিশ্বাস।
লেখক ”: প্রাক্তন ছাত্র ও শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।