সবুজ বাড়ির লাল দরজা

আপডেট: মার্চ ১১, ২০১৭, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

মোমেন এইচ


আমার নানা বাড়ি কদমতলা। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোট-বড় অনেক টিলা। টিলা হলো পাহাড়ের মতো দেখতে কিন্তু পাহাড় না। তবে টিলাকে বাচ্চা পাহাড় বলি আমি। একটি টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে মনে হয় পাশের টিলাটি অনেক আকর্ষণীয়। অবস্থানরত টিলা থেকে অনেক সৌন্দর্যের অধিকারী চারদিকের টিলাগুলো। এভাবে আমি, সানি, রাফি অনেকগুলো টিলার মাথায় পা রেখেছি কিন্তু মনে হয়নি যে, সবচেয়ে সুন্দর টিলাটিতে যেতে পেরেছি আমরা। সেই দুপুর থেকে মিশন শুরু করে সন্ধ্যার নাক বরাবর দাঁড়িয়েও মনের তৃষ্ণা মেঠাতে পারিনি। সৌন্দর্যের তৃষ্ণা কার নেই? তাছাড়া টিলা না দেখা মানুষের কথাতো বলাই চলে না। মন চাচ্ছে না তবু বাসায় ফেরতে হবে, কেননা জীবজন্তু ছাড়াও চোর ডাকাতের ভয়তো আছেই। মন খারাপ নিয়েই বাসায় আসলাম। আমরা তো শুধু বাসায়ই আসলাম। কিন্তু মন পড়ে রয়েছে টিলার অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে। অন্য কোনো কিছুতেই মন বসছে না।
টিলার সবুজ গাছপালার মাথায় পাখিদের নাচানাচি। হরেক রকমের পাখিদের ভিন্ন ভিন্ন ডাক মিশে তৈরি করছে মন ভুলানো মধুর আওয়াজ। যে কারো ভালো লাগবে এই পরিবেশ। পশুপাখি সবুজ গাছপালা যাদের ভালো লাগে না, সে অন্য যাই হোক সুস্থ মানুষ হতে পারে না। সানি, রাফি ওদের মন আরো বেশি খারাপ। ছয়দিন পড়ালেখার সাজা ভোগ করার পর একটি দিন সাময়িক মুক্তি। তাও কিনা বিদ্যুৎ গতিতে চলে যায়। মনে হয় এই দিন ঘড়ির কাটা একটু বেশিই ঘুরে। তা না হলে শরীফ স্যারের ৬০মিনিটের গণিত ক্লাশ শেষ হয়নি অন্যদিন। বলা চলে, বিপদের সময় দীর্ঘই হয়। ছুটি আর আনন্দের দিনগুলো সাধারণত একটু ছোট হয়। এই ভেবে ঘুমাতে যাবে রাফি। তার ঘুমের সঙ্গী হতে হলো আমাকেও।
ঘুম ভাঙতে ভাঙতে ৯টা বেজে গেল। মামি রান্না করে রেখেছে। খেয়েই ভূঁ দোড় দিল সানি, রাফি। তাদের স্কুলের সময় হয়ে গেল গেল বলে। আর এই দিকে আমি একা হয়ে গেলাম। নানা বাড়িতে সানি ও রাফিই আমার সঙ্গ দেয়। অন্যরা সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। খাওয়া শেষ করে আমি একটু নেটে কাজ করছিলাম। হঠাৎ একটি পাহাড়ের ছবিতে আমার চোখে আটকে গেল। আমি আবেগ থামাতে না পেরে চলে গেলাম মামা বাড়ির পাশের টিলাগুলোতে। আমি বাচ্চা পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে সামনে অগ্রসর হতে থাকলাম। যখন আমার খেয়াল আসল ততক্ষণে আমি হারিয়ে গেছি টিলার আঁকা বাঁকা পথে। আমি বাসায় ফেরার জন্য হাঁটতে থাকলাম একটি পাশর্^ রাস্তা ধরে। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই চোখে পড়লো একটি পতাকা অবয়ব। সাহস পেয়ে সামনে এগোতে থাকলাম। গিয়ে দেখি এটা সত্যি পতাকা নয়। এটি একটি ছোট্ট ঘরের দেয়াল। সারা দেয়ালে সবুজ রং করা। আর লাল বৃত্তটিতে একটি দরজা বিদ্যমান। তাতে একটি লাল থালা লাগানো, তবে একটি রিংয়ে। আমি অল্প সময় দাঁড়াতেই ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল এক বৃদ্ধ। আমাকে দেখে বৃদ্ধ বলল, কে তুমি বাবা? এখানে কী কর?
আমি মিহির। পথ হারিয়ে এখানে। তবে আপনি কে? কী করেন এখানে? প্রশ্ন করলাম বুকে সাহস নিয়ে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বৃদ্ধ উত্তর দিলেন।
আমি হাবুল। একজন মুক্তিযোদ্ধা।
তাহলে আপনি এখানে কী করেন?
প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে থেমে গেলেন বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা হাবুল। সে যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। আমাকে ইঙ্গিতে বলল রুমের ভিতরে যাওয়ার জন্য। আমিও কিছু না ভেবে রুমে প্রবেশ করলাম। রুমের ভিতরের পরিবেশ দেখে আমি আনন্দে কেঁদে ফেললাম। বেশি আনন্দিত হওয়ার পর যা হয় মানুষের। আমারও তাই হলো। ঘরের ভিতরটা সাজিয়েছেন তিনি একাত্তরের শহিদদের রক্তমাখা জামা দিয়ে। আমার মাথায় হাজার প্রশ্নের জটলা বেঁধে যাচ্ছে। বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার দিকে ছুঁড়ে দিলাম মাথার প্রশ্নগুলো। আচ্ছা আপনি মুক্তিযোদ্ধা, তবে এই টিলায় থাকেন কেন? তিনি উত্তরে বললেন, সে অনেক কথা।
কী হয়েছে? আমাকে বলা যাবে?
বলা যাবে না কেন। তাহলে শোন, দেশ মুক্তির যুদ্ধে আমি আর ফজল এক সাথে অংশগ্রহণ করেছিলাম।
তারপর?
ফজল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানিরা তার পরিবারের সকলকে হত্যা করে। ফজল বুকে স্বজন হারানোর ব্যথা লালন করে নিজের যুদ্ধ আরো বেগমন করে।
তারপর কী হলো?
হাবুল চাচার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। চোখ ভিজে যাচ্ছে। তবু সে পুনরায় বলতে লাগলোÑ তারপর আর কী! দেশ স্বাধীন হলো।
বুঝলাম। তবে আপনি এখানে এলেন কিভাবে তা তো জানা হল না। বলেন না কিভাবে এখানে এলেন? কেন এলেন?
স্বাধীনতার পরে গ্রামে গিয়ে দেখি, রাজাকার হাকিম দেশ গঠনের সভা করতেছে। যা দেখে ফজলের গা জ্বলে গেল। প্রতিবাদ করতেই রাজাকার হাকিম আমাকে আর ফজলকে বন্দী করে ফেলে। তারপর মুক্তিযোদ্ধা ফজলকে মিথ্যে রাজাকার বলে চিন্তিত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আর আমাকে আধমরা করে নদীতে ফেলে যায়।
ফজলের কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন মুক্তিযোদ্ধা হাবুল চাচা। তারপর কী হলো জানতে চাইলে বলল, অনেকের কাছে বিচার চাইলাম কিন্তু কেউ বিচার করলো না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন বিচার করবেন কিন্তু ঘাতকেরা তাকেও বাঁচতে দিল না।
হাবুল চাচা আর কথা বলতে পারছে না। বিছানায় শুয়ে পরল। আর আমাকে বলল, বস বলতেছি, একটু বিশ্রাম নিয়ে নিই।
হাবুল চাচা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকল। আর আমি ঘরের চারপাশে লাল সবুজের পরিবেশটা দেখতে থাকলাম। তারপর আবার বলতে থাকে হাবুল চাচা, যে দেশের জাতি তার পিতাকে হত্যা করতে পারে, তারা মানুষ হতে পারে না। তাদের সাথে একজন মুক্তিযোদ্ধা আপোষে থাকতে পারে না।
চাচা দেশে তো রাজাকারদের বিচার শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকের ফাঁসিও হয়েছে। অন্যদের বিচার কাজ চলছে।
এই শুনে মুক্তিযোদ্ধা হাবুল চাচা চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’।