সমস্যায় জর্জরিত সোনামসজিদ স্থলবন্দর

আপডেট: আগস্ট ২৬, ২০১৭, ১:৩০ পূর্বাহ্ণ

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি


জনবল সঙ্কট, অপর্যাপ্ত গুদামঘর, রাস্তা, ওয়েব্রিজসহ নানা সমস্যায় দীর্ঘদিন যাবত জর্জরিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনামসজিদ স্থলবন্দর। এসব নানাবিধ সমস্যায় হামাগুড়ি দিয়ে চলছে উত্তরবঙ্গের সর্ব্বোচ রাজস্ব আদায়কারী এ প্রতিষ্ঠান। তবুও যেন দেখার কেউ নেই। সরজমিনে গিয়ে স্থলবন্দরের রাজস্ব বিভাগের উপকমিশনার সাইদুল ইসলামের সঙ্গে আলাপ করে নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে।
উপকমিশনার সাইদুল আলম জানান, বর্তমানে স্থলবন্দরে সকল ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করে স্বচ্ছতা আনয়নে বন্দরের বিভিন্ন স্থানে ৩২টি সিসি ক্যামেরার প্রয়োজন। অনেক চেষ্টা তদবির করে এ পর্যন্ত ১২টি সিসি ক্যামেরা বসানো সম্ভব হয়েছে। আরো ২০টি সিসি ক্যামেরা বসানো অপরিহার্য। এ ১২টি সিসি ক্যামেরা বসানোর ফলেই অনেকটা স্বচ্ছতা এসেছে বলে গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৬৮ কোটি টাকার স্থলে ৫১৫ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা বেশি। এছাড়া চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৬৫ কোটি টাকা। গত জুলাই মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৯ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ২৮ কোটি টাকা। বন্দরের শতভাগ স্বচ্ছতা থাকলে শতভাগ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। জুলাই মাসে রাজস্ব কম হওয়ার কারণ হলো ভারতে জিএসটি বৃদ্ধি ও অন্যান্য কারণে ভারত থেকে পণ্য কম আমদানি হওয়ায় মাত্র  এক কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।
তিনি আরও জানান, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া কিছু ব্যবসায়ী পণ্য আমদানি কম করছে। তাই কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় সাধন আবশ্যকীয় হলেও কোন উদ্যোগ নেই। স্থলবন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোন আবাসসিক এলাকা না থাকায় কর্মস্থল হতে ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরে বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়। ফলে যাতায়াতে ভীষণ অসুবিধায় পড়তে হয় তাদের। কোন কোন সময় জীবনের নিরাপত্তা থাকে না। আবার কোন কোন সময় ব্যবসায়ীরা হঠাৎ করে কোন সমস্যায় পড়লে সহজ যোগাযোগের অভাবে তা সমাধান করা যায় না। বন্দরের পানামা এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক গুদামঘর নেই। বর্তমানে মাত্র সাতটি গুদাম ঘরের মধ্যে একটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যগুলি রাখার স্থান না থাকায় খোলা আকাশের নীচে পড়ে থাকে। যার অনেকাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আমদানিকারকরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হন। কমপক্ষে ৫-৬টি গুদাম ঘর হলে পণগুলো নষ্টের হাত থেকে রক্ষা পেত। ভারত থেকে পণ্যসহ আসা ভারতীয় ট্রাকগুলো দাঁড়াবার স্থান না পাওয়ায় এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক সময় ওয়েব্রিজে ট্রাক ওজনের সময় স্কেলের সামনে হঠাৎ করে কোন ট্রাক নষ্ট হয়ে গেলে সরানোর জায়গা না থাকায় কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়।
স্থলবন্দরের রাজস্ব বিভাগ, অ্যাসোসিয়েশন, পানামা পোর্টের মধ্যে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরে মধ্যে পরিচয়পত্র  সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক না থাকায় সাধারণ মানুষ ও কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে পার্থক্য বোঝা না যাওয়ায় অনেক সময় নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয়। তাই প্রত্যেকের পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করা বাঞ্চনীয়। বন্দরের ও পানামা পোর্টের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো ট্রাফিক ব্যবস্থা জোরদার করা। বর্তমানে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে কোন ট্রাফিক ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর জ্যাম লেগে বিশৃঙ্খার সৃষ্টি হয়। যদিও এখান থেকে প্রতিবছরই সরকার শত শত কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকেন বলে জানান তিনি।
উপকমিশনার সাইদুল আলম জানান, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে জনবল কাঠামোর তীব্র সংকট চলছে। স্থলবন্দরে মোট ১৩টি পদে ৫৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার নিয়ম থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৮ জন। বিভিন্ন পদে শূন্য আছে ২৭ জন। যুগ্মকমিশনার পদে এক জন থাকার নিয়ম থাকলেও দীর্ঘদিন যাবত পদটি শূণ্য রয়েছে, উপকমিশনার  ও সহকারী কমিশনার পদে চার জনের স্থলে কর্মরত আছেন দুই জন, সহকারী প্রোগ্রামার পদটি দীর্ঘদিন যাবত শূন্য, রাজস্ব কর্মকর্তা ছয় জনের স্থলে কর্মরত আছেন মাত্র দুই জন, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে ২০ জনের স্থলে কর্মরত আছেন ১৪ জন, উচ্চমান সহকারী পদে তিনজন থাকার নিয়ম থাকলেও ৩টিই শূণ্য, সিসিআর ও সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কম্পিউটার অপারেটর পদটি শূণ্য, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে এক জন কর্মরত আছেন। উপপরিদশকের পদটি দীর্ঘদিন যাবত শূণ্য রয়েছে। গাড়ির চালক পদে তিন জনের স্থলে কর্মরত আছেন এক জন, সিপাই পদে ১২ জনের মধ্যে কর্মরত আছেন ৮ জন, অফিস সহায়ক পদে দুই জনই শূন্য, নৈশ প্রহরী পদটিতেও কেউ কর্মরত নেই।
উপকমিশনার জানান, তাছাড়া স্থলবন্দর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে থানা অবস্থিত হওয়ার কারণে জরুরি ভিত্তিতে সহজে পুলিশ পাওয়া কষ্টকর। তাই এখানে বন্দরের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকতে হয় নিরাপত্তাহীনভাবে। বন্দরের আরো একটি প্রকট সমস্য হলো রাস্তা। বন্দর এলাকার রাস্তাটি অরক্ষিত এবং সরু। দীর্ঘদিন যাবত রাস্তা সংস্কার না করায় শতাধিক গর্র্তের ভাঙা রাস্তা দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করতে গিয়ে একদিকে সময় বেশি লাগে, অন্যদিকে প্রতিদিনই ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটে। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চালক ও সহকারীরা পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে চলাচল করে থাকে। রাস্তাটি জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার ও  দুই লেনে উন্নিত করা প্রয়োজন। আরেকটি বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় মাদকাসক্তরা যেখানে সেখানে মাতলামী করায় কাজের বিঘœ ঘটে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সমস্যাগুলো সম্পর্কে ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে না জানালেও তারা  সবকিছুই অবগত রয়েছে।
এ ব্যাপারে কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে কোন জনবল সঙ্কট নেই। পর্যাপ্ত সংখ্যক জনবল দেয়া হয়েছে। অন্যান্য সমস্যাবলীর সমাধান এখতিয়ার বহির্ভুত বলে সেগুলি সম্পর্কে তিনি কোন মন্তব্য করেন নি।