বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

সম্প্রীতির দেশ হোক বাংলাদেশ

আপডেট: November 12, 2019, 1:09 am

সুজিত সরকার


গত ৯ নভেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট উত্তর প্রদেশের বাবরি মসজিদ নিয়ে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের রায় ঘোষণা করেছেন। এই রায় নিয়ে জনমত স্বতন্ত্র হতে পারে। যে যার ধর্মীয় বিশ^াস থেকে অভিমত প্রকাশ করতেই পারেন। অবশ্য আরেকটি অভিমত আছে, যার নাম স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র মানে এই নয় যে তিনি বিশেষ রাজনীতিক চিন্তায় অনাস্থাশীল। তবে সামাজিক শান্তি ও নিরুপদ্রপ পরিবেশের খাতিরে এই স্বতন্ত্ররা ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। সবাই জানেন, রায় কি হয়েছে, বিশ^ময় তা ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই ও নিয়ে শব্দ ব্যয় না করাই ভালো। তবে এটা সত্যি যে, রায় ঘোষণার আগে ভারত-বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্ম বিশ^াসের মানুষের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা, অস্থিরতা ও শঙ্কা বিরাজ করতে থাকে। রায়ের পর কেউ কেউ সূক্ষ্মভাবে ভারতীয় রাজনীতির দৈন্যতা, ধর্মান্ধতা এবং শাসক ও জনগোষ্ঠির সংকীর্ণতা নিয়েও মন্তব্য করতে ছাড়েন নি। কিন্তু কোথাও কোনো সংঘর্ষ ও দাঙা হয়নি, এটাও আবার বাস্তব। বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে যথেষ্ট সহিষ্ণুতা আর সহৃদয়তার পরিচয় দিয়েছেন। ফলে রায়ের পরের দিন মহানবীর জন্মদিন ‘ঈদ-এ মিলাদুন্নবী’ হওয়ার পরও কোথাও কোনো উত্তেজনাকর পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়নি। ‘ঈদ-এ মিলাদুন্নবী’র ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা একত্রিত হন। সেখান থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অমূলক ছিলো না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা সেদিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টি রেখেছিলেন। দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় বিশাল বিশাল আনন্দ শোভাযাত্রা বেরিয়েছে। সেখান থেকেও কোনো বিরূপ মন্তব্য শোনা যায়নি। এতে মনে হয়েছে, যতোদিন দেশ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ^াসীরা রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকবেন এবং সেই আদর্শের আলোকে পঠন-পাঠনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার আয়োজন করা যাবে, ততোদিন দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ন হবে না। কারণ তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের আলোকে নিজেদের গড়ে তুলবে। শিক্ষায় এই পাঠের আবশ্যিকতা অনস্বীকার্য। এ ছাড়া দেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ^াসী জনগণকে নিয়ে সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে নিরাপত্তা টিম গঠন করে শঙ্কিতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফলে দেশে কতিপয় সমাজবিছিন্ন অপরাধপ্রবণ স্বার্থপর মানুষ দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজ-ধর্মান্ধর সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করলেও ৯ নভেম্বর সারা দেশ ছিলো সম্প্রীতির বাতাবরণে উল্লসিত। সে জন্য সরকার এবং প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আদর্শে বিশ^াসী সকলরই অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। সকলেই সরকারের সদিচ্ছের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন।
ফেসবুকে নাটোরের চিকিৎসক ও লেখক জাকির তালুকদারের পোস্ট পড়েছি। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত। তিনি লিখেছেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দুদের তাতে কোনো ইন্ধন নেই। তারা বাবরি মসজিদ ভাঙতে যায়নি এবং মন্দির গড়তেও যাবে না। তাই বাবরি মসজিদ ভাঙা ও মন্দির গড়ার প্রশ্ন তুলে এ দেশের হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করা হলে সেটা হবে নঞপুংশকের কাজ। ধর্মান্ধতার চাষ। লড়াই যদি করতেই হয়, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে করো। করো সৌদি ফেরত নির্যাতিত নারীদের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাও পশুপ্রবৃত্তি ধারণকারীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু ধর্মরক্ষার ধুয়া তুলে নিরস্ত্রদের ওপর সংগঠিত অস্ত্রবাজি হবে রাজাকারতুল্য দুষ্কর্ম। চা-খানা বা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও ভারতের বাবরি মসজিদ নিয়ে কূটমন্তব্য এবং কোনো রকম আলোচনা না করার পরামর্শ ও আহ্বান জানিয়েছেন ডাক্তার জাকির। এ ছাড়া খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও ডিসিপ্লিনের শিক্ষক আবুল ফজল আমাকে ফোন করে জানালেন, তিনি সমমনা সহকর্মী ও ছাত্রদের নিয়ে একটি টিম গঠন করে দুর্যোগপূর্ণ রাতে শহরময় ঘুরেছেন। তার ভাষায় যেখানেই কোনো গোলযোগ দেখবেন, সেখানেই সাম্প্রদায়িকদের প্রতিরোধ করবেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রয়োজনে জীবন দেবো, কিন্তু দাঙা বাধিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে দেবো না। দেবো না মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে কালিমালিপ্ত হতে।’
কিন্তু ১৯৯২ সালে ৬ ডিসেম্বর যখন ভারতের একদল সাম্প্রদায়িক মানুষ ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বাবরি মসজিদ ভাঙে, তখন বাংলাদেশেও তার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় রাজশাহীর খুব কাছে আড়ানি “ক্ষেপা পাগলার আশ্রম” লুটপাট করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। দেশের সমস্ত শহর ও গ্রাম ছিলো সন্ত্রস্ত। একাত্তরে যারা লুটপাট-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগ করেছিলো স্বল্পসংখ্যক ধর্মান্ধ। তারা সরকারি ছত্রচ্ছায়ায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় মানবতা ও শান্তি বিরোধী দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়েছিলো। ১৯৯২ সালেও একইভাবে ধর্মান্ধরা যেখানে সুযোগ পেয়েছে, সেখানে আক্রমণ করেছে। ২০০১-এর নির্বাচন পর তারা কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপরই আক্রমণ করেনি, যারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ তাদের ওপর একাত্তরের কায়দায় আক্রমণ করেছে। ঘরবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবই জ¦ালিয়ে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হিন্দু-মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্ম ও জাতি গোষ্ঠির ওপর চালিয়েছে সশস্ত্র আক্রমণ। করেছে লুটপাট-অগ্নিসংযোগ আর ধর্ষণ। উল্লাপাড়ার পূর্ণিমা, রাজশাহীর পুঠিয়ার মহিমাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ধর্ষণ থেকে শিশু-বৃদ্ধা বাদ যায়নি। বর্তমান সরকারের আমলেও ফেসবুকে কে বা কারা ইসলাম ধর্ম, কোরআন, মহানবী সম্পর্কে অসম্মানজনক ছবি ও কথা লিখে পোস্ট দেয়ায়, অভিযুক্ত কেবল নন, তাদের সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু সরকার তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতিরোধ করে বিচারের মুখোমুখিও করেছেন। অথচ সেগুলো সবই ছিলো সাজানো নাটক। যেমন যুদ্ধাপরাধী সাঈদীকে চাঁদে দেখার গুজব। ১৯৯২ এবং ২০০১-সালের অপরাধী কাউকেই তৎকালীন সরকার গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখিন করেনি। এটাই হচ্ছে বিএনপি-জামাত সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের পার্থক্য। বর্তমান সরকার মানবিক ও উন্নয়নকামী। ঘুস-দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা সরকারি দলের হলেও গ্রেফতার করে বিচারের উদ্যোগ নিয়েছেন। দলে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা আশ্রয় নিয়ে দলের কার্যক্রমকে বিভ্রান্ত-বিশৃঙ্খল করছে, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। বিএনপি-জামাতের চার দলীয় জোট ঠিক তার বিপরীত। লুটপাট-দলবাজি আর সাম্প্রদায়িকতা আস্ফালন ছাড়া উন্নয়নমূলক কোনো কাজের দৃষ্টান্ত তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার খতিয়ানে নেই। আছে বোমাবাজি, বাংলাভাই, আনছারুল্লা বাংলা ভাই প্রভৃতি নামের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী সৃষ্টি এবং তাদের দিয়ে নওগাঁর রানীনগরের খেজুর আলীর মতো নিরীহ কৃষকদের হত্যা করে ঠ্যাঙে দড়ি বেঁধে উল্টো করে গাছে ঝুলিয়ে রাখার মতো অমানবিক কাজের ক্ষতচিহ্ন। সে কারণে অনেকেই মনে করেন, অনন্ত যারা দেশটাকে, দেশের মানুষকে ধর্ম-বর্ণ বিবেচনা না করে ভালোবাসেন, তারা আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করে দেশ ও সরকার পরিচালনা আরো দীর্ঘায়িত হোক। তাহলে ক্রমান্বয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। অন্যরা তো দেশটাকেই শত্রু মনে করে। বাম-প্রগতিশীলদের সঙ্গে ঐক্য আরো দৃঢ়তর করে দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণ করতে হবে। অপরাধপ্রবণদের শাস্তি নিশ্চিত করলে, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নও কমে যাবে। বর্তমান সরকার সে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। জনসর্থন সরকারের এই উদ্যোগের সঙ্গে রয়েছে।
আমরা জানি, ভারতবর্ষ নানা জাতির শাসন-শোষণে তার অস্তিত্ব সংকটে পড়লেও তার সমন্বয় ঘটিয়েছে গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে। ভারতের মানুষ সকল জাতির ভাষা-সংস্কৃতি রপ্ত করেছে। মাতৃভাষার সমান্তরালে শিখেছে শাসকের ভাষা ও সংস্কৃতি। করেছে তার চর্চা। গ্রহণ করেছে ধর্ম। বৌদ্ধ ধর্মীয় শাসকেরাও সৃষ্টি করেছে অনন্য সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা। শিক্ষা ও ধর্ম প্রচারে তাদের আমলে তারা ছিলেন অগ্রগামী। মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের আমলেও ওই একই ঘটনা ঘটেছে। ধর্ম প্রচারের সমান্তরালে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে তাদের অবদান স্মরণীয়। পারস্যের কবি-দার্শনিক-বিজ্ঞানীদের অবদান অসামান্য। খৈয়াম-ইবনে সিনা-কবি রুমি-বিখ্যাত ভারত তত্ত্ব গ্রন্থের প্রণেতা আল্ বিরুনি প্রমুখের অবদান অনস্বীকার্য। আল্ বিরুনি এক যুগেরও অধিক সময় ভারতে থেকে সংস্কৃত শিখে তিনি ভারতের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনা করেছিলেন। তারা ভারত শাসন করলেও ভারতের সম্পদ নিজ জন্মভূমিতে পাচার করেন নি। ভালো-মন্দ যা করেছেন সবই ভারতের মাটিতে করেছেন। কিন্তু ইংরেজরা ভারত শাসন করলেও ভারতের সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করেছে। তাদের মিউজিয়ামগুলো দেখলেই সেটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। তারা যেখানেই শাসন করেছেন, সেখানের সম্পদ লুট করে নিজ দেশকে সমৃদ্ধ করেছেন। এটাই হচ্ছে ইংরেজ শাসকদের থেকে তাদের পূর্ববর্তী শাসকদের মধ্যে পার্থক্য। তার অর্থ এই নয় যে, ইংরেজরা ভারতীয়দের কিছুই দেননি, তা নয়। তাদের শিল্প-দর্শন ও বিজ্ঞান ভাবনা ভারতীয়দের দিয়েছেন, কিন্তু কোনো শাসকের অবদান নয়। ইউরোপের বিদ্বান ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন সৃজনশীল মানুষের অবদান। শাসকেরা দিয়েছেন বিভাজনের কুমন্ত্রণা। ভারতে দুই সম্প্রদায় প্রধান, হিন্দু ও মুসলমান। এই দুই শক্তি যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে ইংরেজদের পাততাড়ি দ্রুত গুটিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নিজ দেশে গিয়ে বরফ-পাথরের অনুর্বর ভূমিতে দিনভর কাজ করে ক্ষুধার অন্ন উৎপাদন করতে হবে। শিল্প শ্রমিক ভারতের মতো স্বল্প মূল্যে কেনাও সেখানে যাবে না। ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, উৎপাদিত পণ্য প্রতিযোগিতা করে বিক্রি করতে হবে। দখল নিতে হবে বাজার। এই বাজার দখলের প্রতিযোগিতার ফলশ্রুতিই দুই বিশ^যুদ্ধ। ইউরোপীয় শাসক ও বেনিয়ারা বিশ^বাসীকে কেবল এই মানবতাবিরোধী এই অশুভ উপহারই দেয়নি, দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতাও। ধর্মান্ধতা। বর্বরতা। তার ফলে আজকে ভারতবাসী কেবল নয়, বাংলাদেশের কতিপয় মনুষ্যরূপী জন্তুরা সেই শিক্ষায় উদ্ভাষিত হয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠি না চাইলেও শক্তি প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে নিজেদের প্রভূত্ব, আধিপত্য আর ভোগ-বিলাসিতা নিশ্চিত করতে তৎপর। মানুষকে হীন জ্ঞান করে তাদের ওপর চালায় নিপীড়ন। করে দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন। লুটপাট-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগ।
বাংলাদেশ সম্প্রীতির দেশ, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও এ দেশের মানুষ প্রমাণ করেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই সম্প্রীতি চিরস্থায়ী হোক, দেশের শুভবোধসম্পন্ন মানুষ সেটা কামনা করে।