সরকারি ঘর দখলে রাখতে যুবলীগের সাইনবোর্ড ।। রাতে বসে মাদকের আসর

আপডেট: জুলাই ১৫, ২০১৭, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


ভেতরে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি। কয়েকটি চেয়ার টেবিল। বাইরে ঝুলানো যুবলীগের একটি সাইনবোর্ড। তবে এখানে যুবলীগের কোনো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড হতে কখনো দেখেননি এলাকার মানুষ। সংগঠনটির সাধারণ নেতাকর্মীরাও কখনো এখানে আসা যাওয়া করেন না। স্থানীয়দের ভাষায়, রাতে এখানে আসা-যাওয়া করেন চিহিৃত কয়েকজন পাতি নেতা যারা বিশেষ সব কারণে এলাকার মানুষের কাছে চিহ্নত। রাত নামলেই কক্ষটির ভেতরে চলে অন্যরকম মজমা। চলে ভোর পর্যন্ত। ঘরটি সারাদিন আর কাউকে খুলতে দেখা যায় না।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বিদিরপুর হাটে উপজেলা যুবলীগের সদস্য মোমিনুল ইসলাম চারটি সরকারি ঘর দখল করে তিনটি দিয়েছেন ভাড়া। নিয়মিত ভাড়া আদায় করেন। আর সরকারি ঘর দখলে রাখতে এই নেতা কৌশলে একটিতে লাগিয়েছেন যুবলীগের সাইনবোর্ড। এটি যুবলীগ নেতা মোমিনের ব্যক্তিগত চেম্বার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে অনেকদিন ধরে। মাস দুয়েক আগে বিদিরপুর হাটের ইজারাদার ও আওয়ামী লীগ নেতা বদরুল আলম স্বপন সরকারি ঘর চারটি দখলমুক্ত করতে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু উপজেলা প্রশাসন নানা টালবাহানা করে সময়ক্ষেপণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাটের ইজারাদার বদরুল আলম স্বপনের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিদিরপুর হাটটি চলতি বাংলা বছরে ইজারা নেন তিনি। এলাকার সবচেয়ে বড় এই হাটে হাটুরেদের আশ্রয়, তাদের অবিক্রিত মালামাল রাখা ও ইজারাদারদের টোল আদায় সুবিধার্থে কয়েক বছর আগে এলজিইডি হাটে চারটি ঘর নির্মাণ করে। সরকারি এই ঘরগুলি ইজারাদারের তত্ত্বাবধানে রাখা ও ব্যবহার করার কথা। কিন্তু নির্মাণের পর থেকে সরকারি ঘরগুলির দখলে নিয়ে যুবলীগের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন মোমিন। চারটি ঘরের তিনটি ভাড়া দেন ও একটিতে যুবলীগের সাইনবোর্ড দিয়ে নিজের চেম্বার বানিয়েছেন।
জানা গেছে, চারটির মধ্যে তিনটি ঘর যুবলীগ নেতা মোমিনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেন বিএনপি কর্মী শহীদুল, টুটুল ও জামায়াত কর্মী সোলেমান। ভাড়াটিয়ারা জানান, মোমিনকে এককালীন ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে তারা ঘরগুলি ভাড়া নিয়েছেন। মাসে ৭০০ টাকা করে ভাড়াও দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলা মোমিনের ঘরটিতে বসে মাদকের মজমা। রাতভর চলে ফেন্সিডিল, ইয়াবা ও গাঁজা সেবন। এই মজমায় প্রায় নিয়মিত যোগ দেন বিপ্লব, রাজেশ, সারিকুল, টিয়া, তসিকুলসহ আরো কয়েকজন। এঁরা যুবলীগ করেন বলে এলাকাবাসী জানান। রাতভর মাদক সেবনের কারণে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে একাধিকবার গোদাগাড়ী থানা পুলিশকেও অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এটি উচ্ছেদ করা হয়নি। শেষে মোমিনকে উচ্ছেদ করে ঘরগুলি হাট মালিককে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আবেদন করেও ফল পাননি ইজারাদার বদরুল আলম স্বপন।
স্বপন জানান, ঘরগুলি সরকারের সম্পত্তি। সেই হিসাবে হাট ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। কিন্তু সেগুলি বেদখল হয়ে আছে। ফলে উচ্ছেদের জন্য তিনি উপজেলা নির্বাহী নির্বাহী অফিসে আবেদন করেন। ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, ঘরটির আশপাশে ফেনসিডিলের প্রচুর খালি বোতল পড়ে রয়েছে।
বিদিরপুর হাটের সরকারি ঘর দখলমুক্ত করা ও মাদকের আখড়া উচ্ছেদের বিষয়ে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাহিদ নেওয়াজ বলেন, কিছুদিন আগেই তিনি বিদিরপুর হাট ইজারাদারের আবেদন পান। সেটি উচ্ছেদে এসি ল্যান্ডকে নির্দেশ দেন। মাঝে ঘরগুলি ছেড়ে দিতে মোমিনকেও নোটিশ দেয়া হয়েছে। তবে মাঝে এসি ল্যান্ড না থাকায় দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এখন দ্রুতই তা করা হবে বলে জানান তিনি।
সরকারি ঘর দখলে রেখে চেম্বার বানানো ও ভাড়া দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যুবলীগ নেতা মোমিনুল ইসলাম বলেন, ঘরটা যুবলীগের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয়। দলীয় নেতাকর্মীরা এখানে আসেন সাংগঠনিক কাজে। তবে ভেতরে মাদক সেবনের মতো কোনো কিছু হয় না বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু দখল প্রসঙ্গটি তিনি এড়িয়ে যান।