সরকারি বিল দখল নিয়ে পুকুর খনন দেড়হাজার বিঘা জমি পানিবন্দি হবার আশঙ্কা

আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০১৭, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

বিল পাতিকোলায় সরকারি জলাশয়ের জমি দখল করে খনন করা হচ্ছে পুকুর- সোনার দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক


রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সরকারি বিল পাতিকোলার দখল নিয়ে চলছে পুকুর খনন। সংশ্লিষ্ট পুকুর খননকারী বলছেন, উচ্চআদালত থেকে অনুমতি নিয়ে পুকুর খনন করা হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট আদালত পুকুর খননের অনুমতি দিয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৪৫ একর জমিতে। এ নির্দেশনার বিপরীতে প্রায় ৫০ একর জমিতে পুকুর খনন করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, আদালতে মৌজা নম্বর ভুলভাবে উপস্থাপন করে পুকুর খননের নির্দেশ নিয়ে এসেছেন নগরীর উপকণ্ঠ কাটাখালি এলাকার বাসিন্দা গোলাম হোসেন।
পাশাপাশি গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কার্যালয় থেকে একটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে বিলের লিজ নেয়া জমিতেও পুকুর খনন করা হচ্ছে। এঘটনায় ওই এলাকার সাধারণ কৃষকের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫টি পুকুর খনন করা হচ্ছে। এর ফলে খননকৃত পুকুরের পার্শ্ববর্তী দেড় হাজার জমি পানিবন্দি হবার আশঙ্কা রয়েছে। একারণে এসব জমি হয়ে পড়বে ফসল চাষের অনুপযোগী। এছাড়া দীর্ঘদিন থেকে থেকে এ বিলে মাছ ও ফসল চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েক হাজার মানুষ হয়ে পড়বেন কর্মহীন।
এদিকে প্রভাবশালী মহলের পুকুর খনন বন্ধের দাবিতে ফরিদপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি মুনিরুল ইসলাম গতকাল সোমবার গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। স্মারকলিপিতে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির লিজকৃত জলাশয় প্রভাবশালী মহলের কাছ থেকে দখলমুক্ত করে বুঝিয়ে দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। স্মারকলিপির অনুলিপি রাজশাহীর জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মন্ত্রীসহ বিভিন্ন দফতরে প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে রোববার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুকুর খননের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তিনটি এসকেভেটর। ইতোমধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে দশটি পুকুর খননের কাজ শেষ হয়েছে। আরো পাঁচটি খনন চলছে। এর মধ্যে তিনটি পুকুরে মাছ ছেড়েছেন ব্যবসায়ী গোলাম হোসেন।
ঘটনাস্থলে কথা হয় বিল পাতিকোলার পার্শ্ববর্তী মুলকিডাংগা ও কমলাপুর এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে। এদের মধ্যে ওবায়দুর রহমান, রিপন হোসেন ও আবদুল মালেক নামের তিনজন কৃষক বলেন, আমরা এবং আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম কয়েক যুগ থেকে এ বিলে মাছ ও ফসলচাষ করছি। গত তিনমাস থেকে দেখছি বিলে পুকুর খনন করা হচ্ছে। এর ফলে বিলকে কেন্দ্র করে যেসব কৃষকের জীবন ও জীবিকা সম্পৃক্ত তারা বেকার হয়ে পড়বেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে পথে বসবেন। প্রায় ১০ হাজার কৃষক ও কৃষিশ্রমিক ইতোমধ্যে বেকার হয়ে পড়েছেন। এরই মধ্যে এলাকার মানুষকে সরকারি এ বিলে যেতে দিচ্ছেন না গোলাম হোসেনের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা। এছাড়া বিলটিতে শুকনো মৌসুমে গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু পুকুর খননের পর থেকে সেখানে আর গবাদিপশু যেতে পারছে না। ফলে এ এলাকার কৃষক চড়ামূল্যে পশুখাদ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে আমরা চরম সঙ্কটের মধ্যে পড়েছি।
ফরিদপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি মুনিরুল ইসলাম বলেন, গত ২৩ মার্চ আমাদের সমিতির নামে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ১৪২৩ থেকে ১৪২৫ পর্যন্ত তিন বছরের চুক্তিতে মাছচাষের জন্য লিজ নেয়া হয়। লিজকৃত জলাশয়ের পরিমাণ ৯ একর। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আমাদের লিজ নেয়া জলাশয়ে পুকুর খনন করা হচ্ছে। এরপর বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়। লিজ নেয়া জলাশয়ের বাস্তব অবস্থা বোঝার জন্য আমরা সরকারি সার্ভেয়ার দিয়ে জরিপ করেছি। দেখা গেছে, লিজ নেয়া ৯ একর জলাশয়ের মধ্যে ৬ একর জমিতেই পুকুর খনন করেছেন গোলাম হোসেন। আর বাকি তিন একর জমি অবশিষ্ট রয়েছে। তাই দখলকৃত ৬ একর জলাশয় আমাদের বুঝিয়ে দেয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট দফতর আমাদের দখল বুঝিয়ে না দিলে দাবি আদায়ের জন্য বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় মৌজা ২৬৩ নম্বর বিল পাতিকোলায় আরএস খতিয়ান ১৫৩ এর ৩২ দাগে ৩.৬৬ একর, ৩৩ দাগে .৮৩ একর, ৩৪ দাগে ১.১৩ একর, ৩৫ দাগে ১.৮৩ একর এবং আরএস খতিয়ান ১২৭ এ ৩১ দাগে ১ একর মোট ৮.৪৫ একর পুকুর খননের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু উচ্চ আদালতে ২৬৩ মৌজার উল্লেখ থাকলেও বিল পাতিকোলার প্রকৃত মৌজা নম্বর ৩৫৩। কিন্তু আদালতের নির্দেশনার অপব্যবহার করে ৩৫৩ মৌজার ৬০৪ নম্বর দাগের ৪৮.৮৯ একর সরকারি খাস জলাশয় দখলে নিয়ে এসকেভেটর দিয়ে চলছে পুকুর খনন।
অভিযোগের ব্যাপারে পুকুর খননকারী গোলাম হোসেন বলেন, সরকারি জলাশয় দখল করার অভিযোগ ঠিক না। এলাকার মানুষকে ‘ম্যানেজ’ করেই পুকুর খনন করা হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বাইরে বেশি পরিমাণ জলাশয় দখল করার বিষয়টি সঠিক বলে তিনি স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, উচ্চআদালত যে পরিমাণ জলাশয়ে পুকুরের খননের অনুমতি দিয়েছে, তাতে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব। তাই ব্যবসায়িক লাভের দিকটি বিবেচনা করেই প্রায় নয় একরের পরিবর্তে ৫০ একর জমিতে পুকুর খনন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ নেওয়াজ বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বাইরে অতিরিক্ত জায়গা দখল করে পুকুর খনন করা হচ্ছে কী না- বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে কেউ আমাকে অভিযোগ করেন নি। তবে বিলের বেশি পরিমাণ জমি দখল করে পুকুর খনন করা হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।