সর্বোচ্চ আদালতের প্রশংসনীয় রায় : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেট: মার্চ ২৪, ২০১৭, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

ফিকসন ইসলাম


গত বৃহস্পতিবার (১৬ মার্চ) দেয়া সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে আবারো প্রমাণিত হলো যে, ‘প্রকৃতি’ কাউকে কখনো কোন অন্যায়ের জন্য ছাড় দেয় না, মানুষ যখন নিগৃহীত হয়, নির্যাতিত হয়, নিবর্তিত হয় এবং কোন উপায় থাকে না তখন কিন্তু প্রকৃতি আপন মহিমায় সে অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে যারা অন্যায় করে তারা শাস্তি পায়, আর যাদের ওপর অন্যায় করা হয় তারা প্রতিকার না পেলেও স্বস্তি পেয়ে থাকে।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্ট এর আপিল বিভাগের চার সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গত ১৩ মার্চ’ ১৭ তারিখের যুগান্তকারী রায়ে হাইকোর্ট বিভাগের রায় কে বহাল রেখে সরকারের করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছিলো ২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যাকে বলা হয় এক-এগার’র সরকার। ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখে পূর্ববর্তী কথিত (মনগড়া) তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে হটিয়ে সেনাসমর্থিত সরকার গঠন করা হলে তাকে এক-এগার সরকার হিসেবে সম্যক পরিচিতি দেয়া হয়।
ওই এক-এগারো পরবর্তী সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন এর নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে অনেকটা ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক আদায় করা হয়েছিলো যার পরিমাণ ছিলো ১২০০ কোটি টাকারও বেশি। ওই টাকা ফেরত পেতে ১১টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, তাঁদের পক্ষ থেকে সর্বমোট ১১টি রিট আবেদন করা হয়। রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ১১টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে ওই অর্থ ফেরত প্রদানের জন্য হাইকোর্ট আদেশ প্রদান করলে ওই রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করে। সর্বশেষ ওই আপিলটি সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। ফলে ব্যবসায়ীদের উক্ত অর্থ ফেরত পেতে আইনগত আর কোন অসুবিধা নেই। সর্বোচ্চ আদালতের এই আদেশের ফলে ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি ফিরে এসেছে তাতে সন্দেহ নেই।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এস.কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় প্রদান করেন। ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভয়ভীতি ও দুর্নীতির ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকারও বেশি আদায় করা হয়েছিলো। বিধিবহির্ভুতভাবে অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে ১১টি রিট করা হয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। হাইকোর্ট বিভাগ দীর্ঘ শুনানির পর ওই অর্থ ব্যবসায়ীদের ফেরত দিতে নির্দেশ দেয়। সর্বোচ্চ আদালতে সে রায় বহাল থাকায় এখন ব্যবসায়ীরা অর্থাৎ কেবলমাত্র রিটকারীরা তাদের ওই অর্থ ফেরত পাবেন। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০১০ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিধিবর্হিভুতভাবে যে অর্থ আদায় করা হয়েছিলো তা ফেরত প্রদান করা হবে। কিন্তু সরকারের ওই প্রতিশ্রুতি পালনে পরবর্তীতে কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশের ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের অর্থ ফেরত পাবেন এটি নিশ্চিত হলেও কীভাবে তা ফেরত পাওয়া যাবে, কোন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবেÑ তা আদালতের আদেশের পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর জানা যাবে।
দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে পর্যাবেক্ষকগণ মনে করছেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় যে হয়রানি ও নিগ্রহের শিকার হয় তা ছিলো এক নজিরবিহীন ঘটনা। কেবল অর্থ আদায় নয়, দেশের নামিদামি মানুষদের যে ভাবে নাজেহাল করছে, যে ভাবে জেলজুলুম আর অত্যাচার করেছে তা খারাপ দৃষ্টান্ত হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাস “কালো অধ্যায়” হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। জোর করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের উৎসাহে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্যও যা ছিল অশনিসংকেত। উচ্চ আদালতের রায় সর্বোচ্চ আদালতেও বহাল থাকায় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে অবদান রাখবে এমনটিই প্রত্যাশিত। বর্তমান সরকার যেহেতু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তত্ত্বাবধায়ক আমলে বিধিবর্হিভুতভাবে আদায় করা অর্থ ফেরত প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন সেহেতু সরকার এক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাবের পরিচয় দেবে এমনটি আশা করা যায়। অতীতের ক্ষত নিরসনে যা সরকারের বক্তব্য বলেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
তবে কী কারণে এবং কেনই বা ওয়ান ইলেভেন সরকারের পক্ষ থেকে এমন একটি বিতর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিলো সে বিষয়টিও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়ে জোরপ্রয়োগ করা হয়েছিলো তাদের ব্যবসায়িক সুনামও খুব একটা নেই। এদের মধ্যে কেউ বা কর ফাঁকি কিংবা ভূমিদস্যু হিসেবে ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত। ফলে উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নের আগে সেই সময়কার সরকারের বিতর্কিত কর্মকা-ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ওইসব শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির কোন অভিযোগ আছে কিনা সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে পারে। তবে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যন্ত সকলকে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত সরকার যে সব কাজ ভাল করেনি যা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলকর হয়নি সেটা এখন পরিষ্কার। অকারণেই তারা সেদিন সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীকে (জননেত্রী শেখ হাসিনা ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে) কারাবন্দী করেছিলেন। কারাগারে নেয়ার আগে সেসব চিত্র আবার ষরাব পধংঃ করে জনসাধারণকে দেখার সুযোগ করে দিযে যে অপরাধ তারা করেছিলো- সে অপরাধের বিচার কেন যে দশ বছরে করা হলো না সেটাও ভাবনার বিষয়। এমনকি যে সময়ে কোন সভা-সমাবেশ করা নিষিদ্ধ থাকার  কথা ওই সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্মমহাসচিব ফেরদৌস আহমেদ কোরাইশীকে দিয়ে শরহমং পার্টি গঠন করে বিশাল বিশাল মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করেছিলো ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন নেতৃত্বাধীন সরকারÑ এসবেরও বিচার হতেই হবে। কারণ প্রকৃতি কাউকে কোনদিন ক্ষমা করে না।
লেখক: প্রকৌশলী