সাঁওতালী ভাষার যাত্রা মসৃন হোক

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

মিথুশিলাক মুরমু:


সাঁওতাল ভাষার বর্ণমালা বির্তক যেন কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না। দীর্ঘ বছরের অর্জন এখন আমার দেশের সাঁওতালরা তিনটি বর্ণমালাকে হাজির করেছেন। একদল বলছেন রোমান বর্ণমালা, কেউ বলছেন অলচিকি, আবার কেউ বাংলা বর্ণমালা। কয়েক লক্ষ আদিবাসী সাঁওতালদের এই ত্রিমাত্রিক টানা হেঁচড়ায় বিবর্ণ হয়ে পড়েছে বর্ণমালাগুলো। পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের উদাহরণকে গুরুত্বারোপ দিয়ে অনেকে আবার আন্তর্জাতিকতা, সম্ভাবনাময় এবং সংখ্যাধিক্যের উপযোগী বলে পারস্পারিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে হ্যাঁ, ভারতের পৌনে এক কোটি সাঁওতালদের মধ্যে বর্ণমালার কমতি নেই বাংলা, অলচিকি, দেবনাগরী, উড়িয়া এবং রোমান বর্ণমালা। আমার দেশের ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক সৌরভ শিকদার অভিমত প্রকাশ করেছেন, ‘উত্তরবঙ্গ অর্থাৎ রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, বগুড়া, রংপুর, ঠাকুরগাঁও প্রভৃতি অঞ্চলে দুই লক্ষাধিক সাঁওতাল বসবাস করে। বাংলাদেশে সাঁওতালি ভাষায় বাংলা ও রোমান উভয় লিপিই ব্যবহৃত হয়। লিপি সমস্যার কারণে তাদের মাতৃভাষার পাঠ্যবই হয়নি। একটি সর্বজনসম্মত লিপি নির্ধারণ করা গেলে তারা মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ পেত’ (প্রথম আলো ১০.২.২০২১)। তিনি অবশ্য উল্লেখ করেছেন, ‘সরকারি উদ্যোগে পাঁচটি জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে নানা জটিলতায় তা এখনো ফলপ্রসূ হয়নি।’ পাহাড়ি অঞ্চলের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, উরাঁও জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক সম্ভবপর হলেও সাঁওতালদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমতা ঘটেছে। এক্ষেত্রে আমার দেশের আদিবাসী সাঁওতালরা কোন বর্ণমালা গ্রহণ করবে, সেটি অবশ্যই তাদের মতামতের ওপরই অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যিক।
আমার বাংলাদেশের সাঁওতালী ভাষা প্রেমিকরা ইতোমধ্যেই দু’দুটি অনলাইন পত্রিকা পরিচালনা করছেন। একটি দিনাজপুর থেকে ‘সান্তালীনিউজ২৪ডটকম’ এবং রাজশাহী থেকে ‘দিসান্তালস্টাইমস্ডটকম’ দু’টিতেই রোমান বর্ণমালা ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘দিসান্তালস্টাইমস্ডটকম’ যাত্রা শুরু করেছে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ আগস্ট, আর ভ্রুণের জন্ম হয়েছিলো ৩০ জুন মহান সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসে। অনলাইন পত্রিকা দুটি অবশ্যই ভাষা রক্ষার্থে একটি সাহসী পদক্ষেপ। যতটুকু জেনেছি, ইতোমধ্যেই ভারত, নেপাল, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকা, নরওয়ে এবং ডেনমার্কের নাগরিক কিংবা অভিবাসী সাঁওতালরা অনলাইন পত্রিকার নিয়মিত পাঠক হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে জানান দিয়েছেন। পত্রিকা দুটিতে নিয়মিতভাবে সাঁওতালদের নিত্যদিনের খবরাখবর, জাতীয় বিষয়াদিসহ প্রায় সবদিকগুলোই কম-বেশি প্রকাশিত হচ্ছে। রাজনৈতিক, ধর্মীয় বিতর্কিত বিষয়গুলো একেবারেই শূণ্যের কোঠায়। বোধকরি, ভাষা চর্চার একটি উপযোগী ও উপযুক্ত মাধ্যম হিসেবে নতুন প্রজন্মরা ভাষা রক্ষার আন্দোলনে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করবে।
রোমান বর্ণমালার পক্ষাবলম্বনকারী সাঁওতালরা বিগত ডিসেম্বরে ‘ওমেগা ট্রেড এণ্টারপ্রাইজ’ প্রিণ্টিং প্রেস থেকে একটি ‘সাঁওতালী গানবই’ উপহার দিয়েছেন। শ্রবণ করেছি, ‘দিসান্তালস্টাইমস্ডটকম’-এর কর্ণধারগণ টাইমস্রে মৌলিক ও সমাজের দিক-নিদের্শনামূলক লেখাসমূহ নিয়ে একুশে বইমেলা ২০২১-এ সাঁওতালী-বাংলা (বঙ্গানুবাদ) দ্বিতীয় বইয়ের মোড়ক উম্মোচিত করতে চলেছেন। কবি সামিয়েল মার্ডীর সাঁওতালী বর্ণমালার ‘বাহামনি’ কাব্যপুস্তক ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের একুশে বইমেলাতে ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সাঁওতাল ভাষা প্রেমিকের কাছে বইটি সমাদৃত ও বহুল প্রচারিত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সাঁওতালী রোমান বর্ণমালাতে মৌলিক কবিতাকে বাংলায় অনুদিত করে কবিতার ছন্দ, রসবোধকে অভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। সাঁওতালী ভাষার এই অগ্রযাত্রার ধুসর পথে ধুলির আবরণ ক্রমশঃই কমতে শুরু করেছে।
আমার দেশের সাঁওতালরা ভাষা সম্পর্কে সচেতন হলেও বর্ণমালা সম্পর্কে তাদের সঠিক ধারণা পোষণ করেন না। বিগত সময়গুলোতে চোখে পড়েছে সমানতালে রোমান বর্ণমালা ও অলচিকি বর্ণমালার ভাষা প্রেমিকরা নতুন প্রজন্মদের ভাষা ও বর্ণমালাতে আকৃষ্ট করতে সেমিনার, প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে। তবে মজার কথা হচ্ছে সাঁওতালদের বর্ণমালা দৌড়ে ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদ’-এর কর্ণধার রবীন্দ্রনাথ সরেন আলচিকি বর্ণমালার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। আর তারই জেষ্ঠ্যপুত্র মানিক সরেন বাংলা বর্ণমালা’র দাবি উত্থাপন করে বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন। একই পরিবারের দুটি অভিমত। সত্যিই রাজনীতির দোলাচলে সাঁওতালী ভাষার ভাগ্য নির্ধারণ বড়ই নির্মমতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। সাঁওতালী ভাষার বর্ণমালার এগিয়ে যাওয়া কী ভ্রান্তিতেই সমাপ্তি হবে!
আমার বাংলাদেশে প্রায় সত্তরোর্ধ জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। তাদের রয়েছে নিজস্ব মাতৃভাষা। অবশ্য কারো কারো মাতৃভাষা, বর্ণমালা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, আদিবাসী সাঁওতালরা বিশেষ করে রোমান বর্ণমালার মতাদর্শীরা ভাষা রক্ষার্থে প্রাক্ প্রাথমিক পর্যায় থেকে একটি সাবজেক্ট ‘ভাষা শিক্ষা’ হিসেবে দাবি করে আসছে; পুরো বিষয়গুলো নয়। অর্থাৎ সাঁওতাল শিক্ষার্থীরা অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই বাংলা, ইংরেজি, গণিত পড়বেন; তাদের জন্যে বাড়তি থাকবে ‘ভাষা শিক্ষা’ পাঠ্যবই। অধ্যাপক সৌরভ শিকদার-এর মতে, প্রায় ৪০টি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে চাকমা, সাঁওতাল, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, মান্দি, ককবোরক, সাদরি, মণিপুরি (মৈতেই ও বিষ্ণুপ্রিয়া), কুড়–ঁখ, হাজং, কোচ, খাসি, খুমি, খিয়াং, মু-া, ¤্রাে, চাক, পাত্র, সৌরা, পাংখোয়া প্রভৃতি। মডেল হিসেবে গৃহীত মাতৃভাষায় শিক্ষাদান কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ায় অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সেক্ষেত্রে অন্য ভাষাগুলো রক্ষার উদ্যোগ কতোটুকু ভূমিকা নিতে পারবে সরকার, তা প্রশ্নবিদ্ধ!
বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। সারা বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি বাঙালি বাংলা ভাষায় কথা বলেন। অতঃপরও ‘পাওয়ার ল্যাঙ্গুয়েজ ইনডেক্স’ অনুযায়ী বাংলা ভাষায় স্থান ৩০তম। পর্যায়ক্রমে ইংরেজি, ম্যান্ডারিন, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, অ্যারাবিক, রাশিয়ান, জার্মান, হিন্দি, জাপানিজ ও পর্তুগিজ রয়েছে। কখনো কখনো বাংলা ভাষায় বিদেশি ভাষার প্রবল প্রভাব গুণিজনদের হাই-হুতাস করতে দেখেছি। সেক্ষেত্রে আমার সাঁওতালী ভাষাসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে; সেটি সহজেই অনুমেয়। জাতিসংঘ ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদে ২০২২-৩২ সময়কালকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভাষা শহিদের দেশ বাংলাদেশে রয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট’, আমরা ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে আদিবাসীদের মাতৃভাষা রক্ষার কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণে সরকার কাছে বিনীত আবেদন জানাচ্ছি।
লেখক: সংবাদকর্মি