সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার জের || বন্যার্তকে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মারপিট করে বের করে দেয়ার অভিযোগ

আপডেট: আগস্ট ২৭, ২০১৭, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

নওগাঁ প্রতিনিধি


নওগাঁর মান্দায় ত্রাণ না পাওয়া ও আশ্রয় কেন্দ্রে বিভিন্ন হয়রানি বিষয়ে মিডিয়ার সামনে বক্তব্য দেয়ায় এক নারীকে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে চেয়ারম্যানের ছেলে ও তার লোকজন মারপিট করে সন্তানসহ বের করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে উপজেলার নুরুল্ল্যাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ পরিষদ (আশ্রয় কেন্দ্রে) এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী কোন জায়গা না পেয়ে রাতেই কাদাপানির মধ্যে তার ভাঙা বাড়িতে ফিরে মানবেতন জীবনযাপন করছেন। ওই ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, নিউজটি প্রকাশ হলেও সরকার দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তাকে হয়রানি করা হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট মান্দার আত্রাই নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কয়েকটি জায়গায় ভেঙে যায়। ফলে উপজেলার নূরুল্ল্যাবাদ, বিষ্ণপুর, প্রসাদপুর, মান্দা, কালিকাপুর, কশব, কাশোপাড়া ইউনিয়নের বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। বানের পানিতে মাটির বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় দক্ষিণ নূরুল্ল্যাবাদ গ্রামের অসহায় রাহেলা বেগম আশ্রয় নিয়েছেন নূরুল্ল্যাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ আশ্রয় কেন্দ্রে। তার মতো ৯০টি পরিবার ওই ইউনিয়ন পরিষদে আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। পরিষদের বানভাসিদের থাকা খাওয়া, পয়নিষ্কাশন ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে পড়েন। পরিষদ থেকে ওই আশ্রয় কেন্দ্র ৭০ পরিবারকে এখন পর্যন্ত ত্রাণ হিসেবে মাত্র ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। বাঁকি আরো প্রায় ২০টি পরিবারদের কোন সরকারি ত্রাণ দেয়া হয় নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিষদে থাকা রাহেলা বেগম, আমিনুল ইসলামসহ ত্রাণ না পাওয়া অন্যরা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, গ্রাম পুলিশদের অসদ অচারণে চিত্র তুলে ধরে মিডিয়ার সামনে বক্তব্য দেন।
আমিনুল ইসলাম জানান, ত্রাণ চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে চেয়ারম্যান তাদের ইউএনও মহোদয়ের কাছে যেতে বলেন। এছাড়া পায়খানা, টিউওয়েল ব্যবহার করতে বাধা দেন গ্রাম চেয়ারম্যান, সদস্য ও গ্রাম পুলিশরা। এতে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন নূরুল্ল্যাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদের ছেলে মকবুল হোসেন। গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রাহেলা বেগমকে চেয়ারম্যানের ছেলে মকবুল হোসেন, মেম্বার মোসলেম উদ্দিন ও নেতা কছিম উদ্দিন মারপিট করে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বের করে দেন। এরপর কোথায়ও থাকার জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে রাহেলা বেগম কাঁদাপানির মধ্যে তার ভাঙা বাড়িতে ফিরে যান।
ভুক্তভোগী রাহেলা বেগম বলেন, বানের পানিতে মাটির ঘর ভেঙে গেছে। বাড়ি থেকে কোন কিছুই নিয়ে আসতে পারি নি আশ্রয় কেন্দ্রে। শুধু ১০ কেজি চাল পেয়েছি। আর কোন সহযোগিতা পায় নি। এ কথাটি সাংবাদিকদের বলায় আমাকে মারপিট করে বের করে দিয়েছে মকবুল হোসেন, সদস্য মোসলেম উদ্দিন ও নেতা কছিম উদ্দিন। এখন কাঁদাপানির মধ্যে রাত থেকে অবস্থান করছি মা ও ছোট বোনকে নিয়ে। অনেকেই তো ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করেছিল। তাদের কিছু না বলে আমাদের অন্যায় ভাবে গালিগালাজ ও মারপিট করে বের করে দেয়া হয়। তিনিসহ অন্যরা অশঙ্কা করছেন, নিউজ প্রকাশ হলে তাদের উপর সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হবে।
পরিষদের গ্রাম পুলিশ বাবুল দাশ জানান, এখানে কয়েকটি বেয়াদব মহিলা আছেন। তাদের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। তাই বাধ্য হয়ে তাদের বকাঝকা করতে হয়।
সদস্য মোসলেম উদ্দিন বলেন, বন্যার প্রথমে পরিষদে আশ্রয় নেয়াদের তালিকা সবাইকে ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। যারা অভিযোগ করেছেন তারা হয়তো সেই তালিকার সময় তারা ছিলেন না। পরবর্তীতে বাঁকিরা কেন পেলে না এমন প্রশ্নে তিনি তাদের তালিকা করা হয়েছে কি না তা জানা নেই। তিনি আরো বলেন, রাহেলা কেন সাংবাদিকের কাছে মিথ্যা অভিযোগ করেন। এ কারণে চেয়ারম্যানের ছেলে রাতে এসে তাকে বের করে দিয়েছে। নূরুল্ল্যাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ বলেন, ত্রাণ দেয়া হয়েছে। তারা মিথ্যাবাদি। তাদের বাড়ি ঘরের পানি নেমে গেছে। তারপর ত্রাণের খাবার খাওয়ার জন্যে পরিষদ থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে না। তার ছেলে কোন মারপিট করে নি বলে দাবি করেন তিনি। তবে চেয়ারম্যানের ছেলে মকবুল হোসেনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয় নি।
জানতে চাইলে মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনিছুর রহমান জানান, এ ধরনের ঘটনাটি শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত থানায় কোন অভিযোগ দায়ের করা হয় নি। তারপরও বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুজামান জানান, সরকার থেকে ত্রাণ দেয়ার জন্যে নির্দেশনা রয়েছে। তবে উপজেলা পরিষদ থেকে ত্রাণ দেয়ার সুযোগ নেই। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ত্রাণ দেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, ঘটনাটির সত্যতা পেয়েছি। বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যাতে কোন কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষদের ওপর এ ধরনের অত্যাচার না চালায়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ