সাক্ষাৎকারে মুনতাসীর মামুন বাংলাদেশের প্রতি বর্গমাইল এলাকায় গণহত্যা হয়েছে

আপডেট: মে ২২, ২০২২, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ


‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র’-এর উদ্যোগে রাজশাহীতে গত ১৩ মে থেকে ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্স’-এর অষ্টম ব্যাচের প্রক্ষিক্ষণ কর্মশালা শুরু হয়েছে। ১৩ মে সকালে রাজশাহী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ মিলনায়তনে এটির উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘গণহত্যা জাদুঘর ট্রাস্ট’-এর সভাপতি, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক প্রফেসর মুনতাসীর মামুন। ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র’ খুলনায় অবস্থিত ‘গণহত্যা জাদুঘর ট্রাস্ট’-এর অন্তর্গত সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প। মুনতাসীর মামুনসহ কয়েকজনের উদ্যোগে খুলনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই ‘গণহত্যা জাদুঘর ট্রাস্ট’।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন গণহত্যা জাদুঘর-এর ট্রাস্টি, সম্মানিক কিউরেটর রাবির ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাজশাহীর কাজলায় অবস্থিত হেরিটেজ আর্কাইভসের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. মো. মাহবুবর রহমান। তিনি রাজশাহীতে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণ কোর্সের সমন্বয়ক। এই অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য উপস্থাপন করেন রাজশাহী সরকারি টিচার্চ ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমান। এই প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালিত হচ্ছে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড-এর সহযোগিতায়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা নিয়ে, এর প্রকৃতি-পরিসর, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে গণহত্যা জাদুঘরের কাজ সম্পর্কে জানতে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের মুখোমুখি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, চলচ্চিত্রকার ও চলচ্চিত্র সংগঠক ড. সাজ্জাদ বকুল। অডিও রেকর্ড হিসেবে ধারণকৃত এই সাক্ষাৎকার অনুলিখনে সহায়তা করেছেন সোনার দেশ এর নিজস্ব প্রতিবেদক হাসান পলাশ । সোনার দেশ-এর পাঠকদের জন্য মুনতাসীর মামুনের সাথে সেই সাক্ষাতের চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
সাজ্জাদ বকুল : আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই। বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে আপনার উদ্যোগে যে প্রশিক্ষণ কর্মশালা চলছে তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই
মুনতাসীর মামুন: আপনাকেও ধন্যবাদ।
সাজ্জাদ বকুল: আপনি তো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার পাশাপাশি ইতিহাস চর্চা করছেন। এর বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে গণহত্যা হয়েছিল তার প্রকৃতি ও পরিসর সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে কী পেয়েছেন?

মুনতাসীর মামুন: গবেষণা করতে গিয়ে আমার সব সময় মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটিতে একটি ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। আমরা মূলত মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। কিন্তু ইতিহাস থেকে মুক্তিযুদ্ধের বড় বৈশিষ্ট্য গণহত্যা ও নির্যাতন হারিয়ে গেছে। এর একটি রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। তা হলো, জিয়াউর রহমান থেকে বিএনপি পর্যন্ত যারা এদেশ শাসন করেছেন, তারা শুধুমাত্র ঘাতকদের সাথে স্বজনপ্রীতির জন্য গণহত্যার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণহত্যা একটি বড় বিষয়। তাই আমাদের গণহত্যা নিয়ে কাজ করতে হবে।
এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের একটি বহুমাত্রিক দিক রয়েছে। আমার গবেষণায় এই দিকটি তুলে ধরতে চেয়েছি। আমি মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পাশাপাশি গণহত্যা, বিশ্বের সুশীল সমাজ, শত্রুপক্ষ ও বন্ধুপক্ষের বিষয়ে গবেষণা করেছি। সেটি আমার সাম্প্রতিক ‘কার্টুনে মুক্তিযুদ্ধ’ বইগুলোতে ফুটিয়ে তুলেছি।
সাজ্জাদ বকুল: মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে যে বিতর্ক তোলা হয় বাস্তবতার নিরিখে তা মূল্যায়ণ করতে বললে আপনি কী বলবেন?
মুনতাসীর মামুন: গবেষণা করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই আসলে জানি না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা একাত্তরের প্রজন্ম বা এর পরের প্রজন্ম এই বিষয়টা সম্পর্কে অনেকটাই অন্ধকারে ছিলাম। আর স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের দোসরেরা সেই সুযোগটাই নিয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের সংখ্যা বাস্তবের চেয়ে অনেক কমিয়ে দেখানো এবং এর মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার ব্যাপকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।
আমরা ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র’-এর পক্ষ থেকে গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূমি ও টর্চার সেল নিয়ে দেশের ৬৪ জেলায় একটি জরিপ চালাচ্ছি। এর মধ্যে ৪০টি জেলায় কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছি। গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের প্রতি বর্গমাইল এলাকায় গণহত্যা হয়েছে। সরকারিভাবে ১৬ হাজার গণহত্যার সংখ্যা পাওয়া গেছে। আমাদের গবেষণার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের সংখ্যা ২ লাখ বলা হলেও এই সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। হাইকোর্টের একটি রায়ে আমার এই গবেষণাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সাজ্জাদ বকুল: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের পরিচালিত গণহত্যার সাথে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণহত্যাগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ আপনি কীভাবে করবেন? বাংলাদেশের গণহত্যা এখনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি কেন? এ ক্ষেত্রে সরকার কতটুকু ভূমিকা পালন করেছে?
মুনতাসীর মামুন: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণহত্যার একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। তা হলো, মুক্তিযুদ্ধের সময় সুপ্রিম পাওয়ারে থাকা সবাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিলেন। তারা কখনও ভাবেননি বাংলাদেশ জিতে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় অপরাধীদের সহায়তাকারিদের কথা বলতে গেলে চিন, আমেরিকা, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের নাম চলে আসে। সে জন্যই তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যাকে গুরুত্ব দিতে চায় না। নইলে রুয়ান্ডার গণহত্যাসহ অনেক গণহত্যাকে তারা স্বীকৃতি দিলেও বাংলাদেশের গণহত্যার মতো বড়ো পরিসরের গণহত্যাকে তারা স্বীকৃতি দেয় না কেন?
এ ক্ষেত্রে অবশ্য আমাদেরও ব্যর্থতা আছে। মাত্র কয়েক বছর আগে থেকে বাংলাদেশে সরকারিভাবে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার গণহত্যা নিয়ে কখনো কাজ করেনি। তাই এর আগে এই দিবসটি স্বীকৃতি পায়নি। দীর্ঘ ৪৮ বছর পর গণহত্যা দিবস পালিত হচ্ছে। এর আগে কেন পালিত হয়নি? সেনাবাহিনীর দিবস আছে, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা দিবস নেই কেন? এই প্রশ্ন আমাদের নিজেদের করা উচিত বলে আমি মনে করি।
সাজ্জাদ বকুল: বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেন জরুরি বলে আপনি মনে করেন? এই স্বীকৃতি আদায়ে আপনাদের ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট’-এর পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি?
মুনতাসীর মামুন: আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষকে জানানো যায় যে বাংলাদেশে একাত্তরে কী ভয়াবহ গণহত্যা হয়েছে। আমেরিকার একটি ইউনিভার্সিটিতে বারোশো গণহত্যার কথা লেখা আছে। এ ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবির অনেক কাজ করেছেন। আমরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য ডিজিটাইজেশন করেছি। বিদেশিরা গণহত্যার বিষয়ে ওয়েবসাইটে দেখছেন। সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার সঠিক তথ্য জানাতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা তাদের শেখাতে চাই কীভাবে হাতে-কলমে গবেষণা করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা তথ্যভা-ার সংগ্রহ ও বই বের করছি। আমরা স্বপ্ন দেখা, স্বপ্ন দেখানো ও স্বপ্ন কার্যকর করতে কাজ করছি।
সাজ্জাদ বকুল: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
মুনতাসীর মামুন: আপনাকেও ধন্যবাদ জানাই।