সাপ মানুষের শত্রু নয়, আতঙ্কের পরিবর্তে সর্তকতা জরুরি II স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত মজুদ আছে অ্যান্টিভেনম

আপডেট: জুন ২৫, ২০২৪, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত বিষয় হলো রাসেল ভাইপার সাপের উৎপাত। নানা বিভ্রান্তিকর তথ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই সাপ ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন রাসেল ভাইপার সাপ। তবে বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সাপ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সাপ মানুষের শত্রু নয়। আতঙ্কের পরিবর্তে সর্তকতা ও সচেতনতা জরুরি। আর স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রগুলোতেও পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের মজুদ রয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষিত চিকিৎসক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাসেল ভাইপার সাপ অত্যান্ত নিরিহ একটি সাপ। সে কখনোই মানুষকে দংশন করে নিজের বিষ নষ্ট করতে চাই না। মূলত সে ভীত ও আতঙ্কিত হয়েই মানুষকে দংশন করে বসে। আর রাজশাহী অঞ্চলে আগেও রাসেল ভাইপার ছিলো। বর্ষার সময় এ সাপের আনাগোনা বাড়ে। এবারও কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবৈজ্ঞানিক নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি করছে। যেটা কোনভাবেই কাম্য নয়। প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় আমাদের সকলকে সতর্ক হতে হবে।

এদিকে, রাজশাহী অঞ্চলজুড়ে সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র পর্যন্ত পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের ব্যবস্থা আছে। দংশনের পর ওঝার কাছে না গিয়ে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আনোয়ারুল কবীর বলেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সাপ নিয়ে যে তুলকালাম দেখা যাচ্ছে, তা অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক। বর্তমানে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা অন্য স্বাভাবিক সময়ের মতোই আছে। আর শুধু যে রাসেল ভাইপারের দংশনই বেড়েছে এমনটাও না। অন্য সাপের দংশন ও রাসেল ভাইপারের দংশনের চিত্র অন্য সময়ের মতোই আছে। অস্বাভাবিক কোন পরিবর্তন দেখা যায় নি। মানুষকে সবসময়ই সতর্কতার আহ্বান আমরা জানিয়ে আসছি। কারণ মানুষ এখনও সাপে কাটা রোগী নিয়ে আগে ওঝা বা কবিরাজের কাছে দৌঁড়ায়। এরপরে আসে চিকিৎসকের কাছে। অথচ যত দ্রুত রোগীকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসবে, তত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে। রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। সুতরাং আমাদের সর্তকতার কোন বিকল্প নেই। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা আছে।

রাজশাহী বণ্যপ্রাণি সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর বারি বলেন, সাপ আতঙ্ক না ছড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাপ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। কিন্তু মানুষ উল্টো পথে হাঁটছে। সাপ আমাদের প্রাণ-প্রকৃতিরই অংশ। এটিকে নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর কিছু নেই। সাপ হত্যাও কোন সমাধান নয়। বরং একটি দন্ডনীয় অপরাধ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ আংশিক আবার কেউ বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। এতে সঠিক তথ্য না পেয়ে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। আমাদের সকলকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে।

সোনার দেশের নওগাঁ প্রতিনিধির রিপোর্ট:
নওগাঁর হাসপাতালগুলোতেও মজুদ রয়েছে অ্যান্টিভেনম। নওগাঁয় এখন পর্যন্ত রাসেল ভাইপার সাপের দংশনের তথ্য পাওয়া যায় নি। তবুও যে কোনো সাপের প্রতিষেধক হিসেবে জেলার ১১টি সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম মজুদ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নওগাঁর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মুনির আলী আকন্দ। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ তারও।

জেলার রাণীনগর উপজেলার পশ্চিম বালুভরা গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, শুনতে পাচ্ছি রাসেল ভাইপার নামের সাপ নাকি খুবই ভয়ঙ্কর। ইদানিং নাকি মাঠে-ময়দানে কাজ করার সময় এই সাপ বের হয়ে কামড় দিচ্ছে। এখনো আমাদের এলাকায় এই ধরনের সাপের উপদ্রব লক্ষ্য করা যায় নি। এছাড়া সাপ কামড়ালে সরকারি হাসপাতালে গেলে নাকি বিনামূল্যে ইনজেকশনও দেয়া হয়। তাই আমরা সাপ নিয়ে তেমন একটা উদ্বিগ্ন নই।

রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খান অংকুর বলেন, সম্প্রতি রাসেল ভাইপার কিংবা অন্য সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে আসে নি। তবুও আমরা হাসপাতালে সব সময় একাধিক অ্যান্টিভেনম ডোজ মজুদ করে রেখেছি।

নওগাঁর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মুনির আলী আকন্দ বলেন, জেলার সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপের অ্যান্টিভেনম ডোজ মজুদ রাখা হয়। এছাড়াও আরো বেশি সংখ্যক অ্যান্টিভেনমের জন্য মন্ত্রণালয় বরাবর চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে দ্রুতই বরাদ্দ পাওয়া যাবে। এছাড়া সাপ কামড়ালে সঙ্গে সঙ্গে করণীয় কী এবং কীভাবে এর চিকিৎসা সেবা নিতে হয় এই ধরনের নানা বিষয়ে সচেতনতামূলক বিভিন্ন প্রচারণা কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখা হয়েছে। আমি আশাবাদি নওগাঁয় রাসেল ভাইপারসহ বিষাক্ত সাপের দংশনে কেউ আক্রান্ত হবেন না।

নাটোর প্রতিনিধির প্রতিবেদন:
জেলার লালপুরে পদ্মার চরে বিষধর রাসেলস ভাইপার (চন্দ্রবোড়া) সাপের দেখা মেলাতে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চরাঞ্চলজুড়ে। শনিবার (২২ জুন) দুপুরে উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের নসাড়া চরের বাদামের জমিতে চারটি সাপের দেখতে পান স্থানীয় কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ওই চরে ৭/৮ জন কৃষক বাদাম উঠাতে যান। এসময় তারা বাদামের জমিতে একটি বড় ও তিনটি বাচ্চা সাপ দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং পিটিয়ে মেরে ফেলেন। এ নিয়ে পদ্মা নদীর চরাঞ্চল তীরবর্তী বসবাস করা মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানান।

তবে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, নাটোরে ২০২৩ সালে ৪ জন সাপে কাটা রুগীকে অ্যান্টি ভেনেম দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে ৯ জন রুগীকে অ্যান্টি ভেনেম দেয়া হয়। সরকারি হাসপাতাল গুলোতে অ্যান্টি ভেনমের কোন সংকট নেই। উপজেলা পর্যায়ে দুইজনকে এবং জেলা সদরে ১০ জনকে অ্যান্টি ভেনেম দেওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে।
নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে দুইজনকে এবং জেলা সদরে ১০ জনকে অ্যান্টি ভেনেম দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। কোন উপজেলায় চাহিদা বেশি হলে জেলা সদর থেকে তা সরবারাহ করা হবে। এছারা একজনের ডোজ হাতে থাকতেই আমরা চাহিদা প্রেরণ করে থাকি।

নাটোরের জেলা প্রশাসক আবু নাছের ভুঁইঞা বলেন, রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নাই। আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। এজন্য জেলার স্বাস্থ্য বিভাগকে বলা হয়েছে। সাপ দেখলেই তা ধরা বা মারার চেষ্টা করা যাবে না। প্রয়োজনে জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩ নম্বরে কল করতে হবে বা নিকটস্থ বন বিভাগের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ