সাপ হত্যা : হুমকির মুখে জীববৈচিত্র

আপডেট: জুলাই ১৮, ২০১৭, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


ব্যাঙ, ইঁদুর, ছুঁচো, পাখি, বাদুড়, গিরগিটি, ইত্যাদি খেয়ে খাদ্য শৃঙ্খলের এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করে থাকে সাপ। এদের খাদ্যাভ্যাস উপকৃত হয় কৃষি, ভারসাম্য রক্ষা করছে আমাদের প্রকৃতির। অথচ মানুষ না বুঝে প্রকৃতির এমন উপকারী সরীসৃপ সাপকে অবাধে মেরে ফেলছে। রাজশাহী অঞ্চলে গত ১৫ দিনে নিধন করা হয়েছে ২৫৮টি গোখরা সাপ। এসময় ১৫৮টি সাপের ডিমও নষ্ট করে ফেলা হয়।
এভাবে একের পর এক সাপ নিধনের ফলে একদিকে যেমন ফসলি জমিতে বেড়ে যাবে ইঁদুরের উৎপাত, অন্যদিকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য পড়ছে হুমকির মুখে। এক্ষেত্রে জনগণের সচেতনতার পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের অবহেলাকে দায়ী করছেন প্রকৃতি গবেষকরা।
গবেষকরা বলছেন, প্রতিবছর বীজতলা থেকে শুরু করে খাদ্যগুদাম পর্যন্ত ইঁদুরে বিনষ্ট করে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের ৩০ শতাংশ। তাছাড়া ইঁদুর নিধনে যেসব বিষ প্রয়োগ করা হয় সেই বিষের প্রভাবে অন্যান্য প্রাণীও আক্রান্ত হয়ে থাকে। ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এ বিষ খাদ্যবস্তুর মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নানাবিধ রোগের প্রভাব বিস্তার করে। যা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে মানুষকে। একটি সাপ প্রায় তিন একর ফসলি জমির ইঁদুর নিধন করতে সক্ষম। তাই আমরা কীটনাশক ও বিষ প্রয়োগ থেকে সরে এসে যদি পরিবেশবান্ধব সাপ সংরক্ষণ করি। তাহলে আমরা অনেক উপকৃত হবো। এতে প্রতিবছর ইঁদুর দমন অভিযানের মাধ্যমে অর্থব্যয়ও কমে যাবে। ইঁদুরের কবল থেকে এদেশকে মুক্ত করতে চাইলে সাপ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রকৃতি থেকে সাপের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও সাপের উপকারি দিক তুলে ধরে চাষিদের সচেতন করতে পারেন। বাড়ির ভেতর থেকে যে সাপগুলোকে উদ্ধার করা হচ্ছে, সেগুলোকে আশেপাশের জঙ্গলে ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দেন এ গবেষকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলে গত ১৫ দিনে নিধন করা হয়েছে ২৭২টি গোখরা সাপ। এসময় ১৮৮টি সাপের ডিম ভেঙে নষ্ট করা হয়েছে। রাজশাহীর তানোর, মোহনপুর, দুর্গাপুর, বাগমারা ও চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন বাড়িতে সাপগুলো মারা হয়েছে। গত ৪ জুলাই নগরীর বুধপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে ২৭টি গোখরা সাপ নিধন করা হয়। এনিয়ে নগর জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরের দিন একজন সাপুড়ে এসে ওই বাড়ি থেকে আরো একটি সাপ উদ্ধার করে।
এ বাড়ির মালিক মাজদার আলী বলেন, আমরা অনেকটাই আতঙ্কে আছি। যদি আরো সাপ বের হয়ে কাউকে দংশন করে। আর দংশন করলে নির্ঘাত মৃত্যু। কারণ এতোগুলো সাপ মারা হয়েছে, তাহলে আরো কতই না সাপ থাকতে পারে। এর দুইদিন পর ৬ জুলাই তানোর উপজেলার ভদ্রখ- গ্রামের কৃষক আক্কাস আলীর বাড়িতে মেলে ১২৫টি গোখরা সাপের বাচ্চা। পাওয়া যায় ১৩টি ডিমও। সাপগুলোকে পিটিয়ে মারা হয়, ডিমগুলোও ধ্বংস করা হয়।
এরপর ১১ জুলাই দুর্গাপুর উপজেলার দুই বাড়িতে ৩১টি গোখরা সাপ মারা হয়। এই দুই বাড়িতে পাওয়া যায় ৯০টি সাপের ডিম। তবে ৩০টি বাচ্চা সাপ পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় ও ডিমগুলোও ভেঙে ফেলা হয়। আর একটি বড় আকারের সাপ ধরে নিয়ে গেছেন সাঁপুড়ে। স্থানীয়রা জানায়, ওই দিন দুপুরে উপজেলার মাড়িয়া ইউনিয়নের হোজা অনন্তকান্দি পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম তার বাড়িতে বড় আকারের একটি গোখরা সাপ দেখে প্রতিবেশিদের ডাকাডাকি শুরু করেন। পরে মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে ৩০টি সাপের বাচ্চা। আতঙ্কিত লোকজন এ সময় সব সাপগুলোকেই পিটিয়ে মেরে ফেলেন। ওই গর্তে ৪৫টি ডিমও পাওয়া যায়। এ ঘটনার পরপরই পাশের পানানগর ইউনিয়নের বেলঘরিয়া গ্রামের এক বাড়িতে পাওয়া যায় সাপের আরও ৪৫টি ডিম। ওই বাড়ির মালিকের নাম সিদ্দিক আলী। পেশায় তিনি মুরগি ব্যবসায়ী। সিদ্দিকের শোয়ার ঘরের দরজার পাশের একটি গর্ত থেকে ডিমগুলো পাওয়া যায়। এসময় মা সাপটি ধরে ফেলে সাপুড়ে।
এর একদিন পর ১২ জুলাই মোহনপুর উপজেলার বসন্তগেদার ফকিরপাড়া এলাকার মাইনুল ইসলামের বাড়িতে একটি মা সাপসহ ২০টি গোখরা সাপ মারা হয়। এ ঘটনায় মাইনুল ইসলামের স্ত্রী সুমি বেগম জানায়, ওই দিন তার নিজ শয়ন কক্ষে প্রবেশের সময় দেখেন একটি সাপের বাচ্চা গর্তের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। এসময় তিনি চিৎকার দিলে পাশের বাড়ির লোকজন ছুটে আসে। পরে গর্তেরে একটি ব্যাঙ বরশিতে গেথে একটি মা সাপ ধরে। পরে মাটি খুরে আরো ১৯টি বাচ্চা সাপ মারা হয়।
এরপরে গত ১৪ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেলে বাগমারা উপজেলার গণিপুর ইউনিয়নের বাসুবোয়ালিয়া গ্রামের কৃষক কফের আলীর বাড়িতে ৫৫ ডিমসহ ২৬ গোখরা মারা হয়েছে। তার একদিন পরে চারঘাট উপজেলার শলুয়া ইউনিয়নের গ্রামশিবপুর গ্রামের একটি বাড়ির  শোবার ঘর থেকে দু’দফায় ১২টি বাচ্চা গোখরা পিটিয়ে মেরেছে স্থানয়ীরা।
সবশেষ ১৫ জুলাই দুর্গাপুর উপজেলায় শালঘরিয়া গ্রামের মৃত জিন্নাতের ছেলে আফাজ আলীর বাড়ির শয়ন ঘরের ইদুরে গর্ত থেকে আবারো ১৬টি গোখরা সাপ উদ্ধার করা হয়। তবে ওই গর্তে বড় গোখরা সাপ ও কোন ডিম পাওয়া যায় নি। বাড়ির মালিক আফাজ উদ্দিন জানান, শনিবার দুপরে হঠাৎ তার শয়ন ঘরে একটি গোখরা সাপের বাচ্চা দেখতে পাওয়া যায়। এসময় বাড়ির লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এসময় তিনি বাড়ির পাশের আশাদুল নামের এক অভিজ্ঞ লোক ডেকে নিয়ে তিনি ঘরের ভিতরে ইদুরের গর্ত খোড়াখুড়ি করতে থাকেন। সেখান থেকে খোড়খুড়ির এক পর্যায়ে গোখরা সাপের বাচ্চা বাহির হতে থাকে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম সাপ নিধনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এভাবে পাওয়া মাত্রই সাপগুলো মেরে ফেলা পরিবেশের জীববৈচিত্রের জন্য বড় ধরনের হুমকি। কারণ সাপ ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। এভাবে সাপ মেরে ফেললে প্রকৃতির মাঝে আমাদের টিকে থাকায় হুমকির মুখে পড়বে।’ আর এভাবে সাপ মারতে গেলে সাপের ছোবল খাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।
ঘরের মধ্যে সাপের আশ্রয়স্থলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গাছপালা-জঙ্গল কমে যাওয়ায় এবং বর্ষা মৌসুমে সাপ উঁচু স্থানে আশ্রয় খোঁজে। বাড়ি-ঘর উঁচু স্থানে হওয়ায় তারা মাটির বাড়ির ইঁদুরের গর্তে আশ্রয় নিয়ে ডিম দিচ্ছে। এজন্যই মূলত এই সময় ঘরের মধ্যে ডিমসহ বাচ্চা সাপগুলো পাওয়া যাচ্ছে।’ এক্ষেত্রে সাপগুলো নিজেরা না মেরে সাপুড়েদের মাধ্যমে বা প্রাণি সম্পদ অধিদফতরে যোগাযোগ করে তাদের হাতে তুলে দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সাপের বংশ বিস্তারের বিষয়ে রাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম খালেকুজ্জামান বলেন, মিলনের পর পুরুষ সাপ অন্য জায়গায় চলে যায়। আর মা সাপ গর্তে গিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম দেয়া শেষ হলে সেও অন্য কোথাও চলে যায়। ৬০ দিন পর সাপের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এর এক সপ্তা পর বাচ্চা সাপগুলোর খোলস বদল হয় এবং চোখ ফোটে। এরপরই প্রায় সব সাপ একসঙ্গে গর্ত থেকে বের হতে শুরু করে।
গোখরা বিষধর উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অঞ্চলে উদ্ধার হওয়া সাপগুলো (গোখরা) খুব বিষধর। এক্ষেত্রে বন বিভাগ, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় একযোগে যদি মানুষকে সচেতন করে তোলে, সাপগুলোকে না মেরে খবর দিতে উৎসাহিত করে তাহলে সাপগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে সাপ নিয়ে আতঙ্কিত মানুষকে ফেসবুকে পরামর্শ দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তিনি লেখেন, ‘ঝুঁকি মনে হলে বাসায় কার্বলিক অ্যাসিড রাখবেন। খুব সমস্যা মনে হলে সাপ ধরে (গ্রামে সাপ ধরার মানুষ পাওয়া যায়) বন বিভাগ বা প্রাণি বিভাগে দিয়ে দিবেন। কিন্তু অযথা মেরে নতুন বিপদ ডেকে আনবেন না দয়া করে।’ ‘ভয়ে ভয়ে একটা কথা বলি!’ শিরোনামে রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের এই সংসদ সদস্য নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লেখেন, ‘যতদূর জানি সাপ নিরীহ প্রাণিদের একটা। সাপ শুধুমাত্র আঘাত পেলে ছোবল দেয়। দেশের হাসপাতালগুলোতে এখন যথেষ্ট পরিমাণ এন্টিভেনম আছে।’
সাপ নিধনের ক্ষতির দিকটি তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘আপনারা জানেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধরে রাখতে সাপের অবদান? পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ সাপের প্রধান খাবার। সাপ এগুলো না খেলে আমরা হয়তো টিকতে পারতাম না। ইঁদুরের গর্তে ঢোকে সাপ ইঁদুর ধরার জন্য। যেসব জায়গায় সাপ ধরে ধরে মারা হচ্ছে সেসব জায়গায় আগেও সাপ ছিলো, বাচ্চা হতো। সেই সাপগুলো ইঁদুর নিধন করতো। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে এই জায়গাগুলো ইঁদুরের দখলে চলে যাবে। আর ইঁদুর যে কি ক্ষতি করতে পারে তা আমরা সকলেই জানি এবং বুঝি।’
রাজশাহীর সহকারী বন সংরক্ষক একেএম রুহুল আমিন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে এ অঞ্চলে বাড়ি-ঘরে অধিকহারে সাপ মারা পড়ছে। এটি অবশ্যই জীববৈচিত্রের জন্য ক্ষতিকর। এর মধ্যেই আমরা সাপ না মেরে আমাদের খবর দেয়ার জন্য বলে দিয়েছি।’ লোকবল সঙ্কটের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর আগে সাপ উদ্ধারের জন্য আমাদের আলাদা লোকবল ছিল। এখন লোকবল সঙ্কট রয়েছে। এরপরও খবর দিলে আমরা দ্রুত সাপ উদ্ধার করে অনত্র ছেড়ে দিবো বলে জানান তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ