সামাজিক অবক্ষয়

আপডেট: আগস্ট ৩০, ২০১৭, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


সমাজের অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অর্ধামিকতা, দরিদ্রতা, অসচেতনতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকা সমাজিক অবক্ষয়ের কারণ হিসাবে সবাই চিহ্নিত করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে সামাজিক অবক্ষয়ের জন্য উল্লিখিত সূচকগুলি কতটা দায়ী? ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য মতে জানা যায়, দেশের সাক্ষরতার  হার ৬৪.৬৬ শতাংশ। ১৯৭২ সালে সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৫-১৮ শতাংশের মত।
দৈনিক পত্রিকা বাংলাদেশ প্রতিদিনের ২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি তারিখে প্রকাশিত সংখ্যা থেকে জানা যায়, পরিকল্পনামন্ত্রী আ.হ.ম মোস্তফা কামাল বলেছেন দেশে দরিদ্রতার হার ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। আগামী ২০২০ সালে দরিদ্রতার হার ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ হবে। ১৯৮৪ সালে গ্রামে দারিদ্রের হার ছিল ৬৩ শতাংশ। দেশের মানুষ স্বাধীনতা উত্তর কতটুকু ধর্মপ্রাণ হয়েছে তা তুলনামূলকভাবে দেখলে দেখা যায়, আগে যে গ্রামে একটি শুক্রবারে জুম্মা নামাজ পড়ার জন্য টিনের চৌচালা ঘরটিকে গ্রামের মানুষ মসজিদ হিসাবে ব্যবহার করতো। এখন সেই গ্রামটিতে দেখা যায়, প্রতিটি পাড়ায়ই পাকা হয়ে গেছে। তাছাড়া অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। গ্রামের মানুষ শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে অসচেতন ছিল তার কারণ তখনকার দিনে সচেতনতামূলক তথ্যের যোগাযোগ ছিল না। ইন্টারনেট, মোবাইল, ত্রিশটির অধিক ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম, কয়েক হাজার প্রিন্ট মিডিয়া, হাজার খানেক কমিউিনিটি রেডিও, ফেইসবুক সহ নানা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন বার্তা ও সচেতনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে। এই অনুষ্ঠান ও তথ্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হয়। স্বাধীনতার পর দেশে শিক্ষা, কুসংস্কার, অসচেতনতা হার যে পর্যায়ে ছিল তা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করার ফলে সেই কুসংস্কার, অসেেচতনতার দেয়াল ভেঙ্গেছে। মানুষ আগের চেয়ে কয়েকশ গুণ সচেতন হয়েছে। স্বাধীনতার পর গত  ৪৭ বছরে প্রযুক্তির যে অভাবনীয় পরির্বতন ঘটেছে তাকে কি সমাজিক অবক্ষয়তার হার কমেছে?  ১৬ জানুয়াূির ২০১৭ বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক সংবাদ সূত্র থেকে জানা যায়, বংলাদেশ মহিলা পরিষদ ১৪টি দৈনিক পত্রিকার তথ্য সংগ্রহ করে জানিয়েছে, ২০১৬ সালে দেশে ১০৫০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৬ সালে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি শিশু ধর্ষিত হয়। দৈনিক প্রথম আলোর প্রকাশিত সংবাদের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ জন নারীকে, ধর্ষণজনিত কারণে আত্মহত্যা করেছে ৮ জন নারী, সালিশ ও ফতোয়ার নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১২ জন নারী, গত এক বছরে ৬৪ জন নারী গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সমাজ বিরোধীরা অ্যাসিড নিক্ষেপ করে ৩৪ জন নারীর শরীর পুড়িয়ে দিয়েছে। আজ থেকে ৪৫ বছর আগেও ধর্ষণের চিত্রটা এত ভয়াবহ ছিল না। বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদ- এবং ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু হলে মৃত্যুদ- দেয়ার আইন বহাল রয়েছে। কিন্তু এই কঠোর আইনের মাধ্যমেও ধর্ষণের মত অপরাধ কমছে না। দৈনিক ইনকিলাবের ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের সংখ্যায় প্রকাশিত তথ্য মতে জানা যায়, কথিত ক্রসফায়ারে আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে মারা যায় ১৫৭ জন, জঙ্গি গোষ্ঠির হামলায় নিহত হন ৬৩ জন। এছাড়াও বিভিন্ন ঘটনায় খুন হয়েছেন ২ হাজার ৪২৯ জন জন, তার মধ্যে সন্ত্রাসীদের হাতে সবচেয়ে বেশি খুন হয়েছে সাধারণ মানুষ। সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হওয়া মানুষের সংখ্যা ১০৫২ আর গত এক বছরে সন্ত্রাসীদের হামলায় মারাত্মকভাবে জখম হয়েছেন ৮৩৯ জন। গত এক বছরে পারিবারিক সহিংসতার হারটাও বেড়েছে। পারিবারিক কলহের জেরে নিহত হয়েছেন ৩৮৪ জন নারী পুরুষ। এছাড়াও নানা কারণে আত্মহত্যা করেছে ৫১৪ জন। গত বছর গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা যান ৫০ জন। সারাদেশে একটি বেসরকারি সংস্থার দেয়া তথ্যে দেখা গেছে, ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ২৩৭ টি। গত বছর সারা দেশে সামাজিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২২০ জন আর এই সহিংসতার কবলে পড়ে আহত হয়েছেন ৬৫৫৩ জন। গত এক বছরে ১৯৭ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। গত এক বছরে রাজনৈতিক কোন্দল এবং হানাহানিতে প্রাণ ঝরে গেছে ৬৪ জনের, আর আহত হয়েছে ২৪২৪ জন।
গত বছরটিতে রাজনৈতিক অঙ্গন এককভাবে আওয়ামী লীগের দখলেই ছিল। ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে ঘটেছে নানা সহিংস ঘটনা। আধিপত্য বিস্তার, ভূমি দখল, টেন্ডারবাজি, ক্ষমতার দাপট এরকম বিষয়গুলি নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ঘটেছে ১২৩৯ টি ঘটনা। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকালীন ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে কয়েক গুণ ২০০৮ সাল থেকে অদ্যবধি থাকা ঘটনাগুলি। সামাজিক মূল্যবোধের জায়গাটি আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে তা ভাবতে অবাক লাগে।
একটি দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের পৌর এলাকায় ভবানী ফতেপুর মহল্লায় মাত্র পৌনে এক ভরি স্বর্ণের জন্য পাঁচ ও ছয় বছরের দুটি শিশুকে হত্যা করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাসেই নরসিংদীতে ছয়, আট ও দশ বছরের তিন ভাই বোনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে আপন বড় ভাই। গত ১৩ জুন ২০১৭ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশিত এক সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, বাংলাদেশে গত আড়াই বছরে ইভটিজিং বা প্রেমের নামে ছেলেদেরে হাতে উত্ত্যক্ত হয়ে বা হয়রানির শিকার হয়ে প্রায় ৪০ জন তরুণী আত্মহত্যা করে। সংবাদটি থেকে আরো জানা যায় যে, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন  পর্যন্ত ৭৫৪টি ইভটিজিং এর ঘটনা বিভিন্ন সংবাদ পত্রে প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটি দৈনিক সংবাদপত্রের প্রকাশিত সংবাদের তথ্যমতে জানা যায় যে, চলতি বছরের ২৪ মার্চ গুলশানের কালাচাদপুরের এক বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রধারী দুই যুবক এক দম্পত্তিকে গুলি করে হত্যা করে। নিহত সাদেকুর রহমানের স্কুল পড়–য়া মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ছিল বখাটেরা- তাতে তিনি রাজি হন নাই। তার জের ধরেই বখাটেরা এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে বলে পত্রিকাটির সংবাদসূত্র থেকে জানা যায়।
সামাজিক অবক্ষয়ের অধঃপতন এখন চরম পর্যায়ে, এটা উন্মত্ত নেশার মতোই পরিণত হয়েছে। অপরাধ এক প্রকার নেশা তা ঠিক তবে এটা যে কী পরিমাণে বিকৃত রূপ লাভ করেছে তা ভাবতেও অবাক লাগে। পায়ুপথে গাড়ি চাকায় হাওয়া দেয়া মেশিনের হাওয়া দিয়ে শিশুকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়। রাজন হত্যা লোমহর্ষক কাহিনী সবারই জানা। বগুড়ায় মা মেয়েকে ধর্ষণ করে বখাটেরা, আর এই বখাটেদের পক্ষ নিয়েছে সমাজপতিরা। সমাজে প্রতিনিধিত্বকারীরা মা মেয়েকে ব্যাভিচারিণি হিসাবে আখ্যা দেয়। আর ব্যাভিচারে শাস্তি হিসাবে তাদের মাথা ন্যাড়া করে দেয়া হয়। এই যদি হয় সমাজ প্রতিনিধিত্বকারীদের সমাজিক অবক্ষয় রোধের ভূমিকা তাহলে সমাজে অপরাধ কি আসলে কমবে, না উত্তরোত্তর বেড়েই চলবে? এ রকম অপরাধ ঘটিয়ে সমাজিক অবক্ষয়ের জন্য দায়ী কারা সমাজ সচেতন মানুষ তা সহজেই অনুমান করতে পারেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের জেলা পর্যায়ের অঙ্গ সংগঠনের নেতা ২০১৬ সালের জুন মাসে মা মেয়েকে ট্রলারে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। তাছাড়া  প্রতিদিনের খবরের কাগজ খুললে এ ধরনের অপরাধমূলক সংবাদ পাওয়া যায়। সামাজিক অবক্ষয়ের এই দৃশ্যপট দিন দিন বাংলাদেশে বেড়েই চলেছে। দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগ নামে একটি বিভাগ খোলা হয়েছে। সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগটি চালু করেছেন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক বিষয়ে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ নিয়ে। ইতোমেধ্য বেশ কিছু ব্যাচ গ্রাজুয়েশন করে বেরিয়েছে। দেশের আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে এলিট ফোর্স হিসাবে খ্যাত র‌্যাব। র‌্যাব এক যুগের অধিক সময় ধরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন বাহিনী থেকে নেয়া চৌকষ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে র‌্যাব। এই চৌকষ বাহিনীর নারায়ণগঞ্জের ইউনিট প্রধানসহ বেশ কয়েকজন সদস্য নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের সাথে জড়িত। তাহলে সমাজের অপরাধমূলক কার্যক্রম নিরোধ হবে কীভাবে?
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি  সংবাদের তথ্য থেকে জানা যায, ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কিশোর অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই দশ বছরে রাজধানী ঢাকায় কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ৩ হাজার ৫৬টি। অর্থাৎ ৩ হাজার ৫৬ টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিশোর কর্তৃক। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কিশোর অপরাধের মামলা ছিল তিন হাজার ৫০১ টি। এর মধ্যে ৮২ টি হত্যা আর ৮৭টি নারী নির্যাতন। তবে ১৯৯০-২০০০ পর্যন্ত কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা যা ছিল তা ২০০০-২০১২ পর্যন্ত সেই সংখ্যাটি  কমেছে।
কিশোর অপরাধের চাইতে অন্যান্য অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সামাজিক অবক্ষয়ের মূল কারণ অনৈতিকতা। দেশে অবৈধভাবে আয়ের পথ বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে অপরাধ। আর অপরাধ বাড়ার সাথে সাথে দেখা দিচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়। সামাজিক অবক্ষয়রোধ করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। ঘুষখোর সরকারি আমলা তার হীন কৃতকর্মকে চালিয়ে যাওয়ার জন্য এলাকার যুবকদের চাঁদা দেয়, অর্থবিত্তশালী ঠিকাদারা টেন্ডারবাজি করার জন্য যুবকদের মাসোহারা দিয়ে পুষছেন, চোরাকারবারী, মাদক ব্যবসায়ীসহ অবৈধ পথে আয় রোজগারকারীরা নানাভাবে সমাজের উঠতি বয়সের যুবকদের মাসোহারা দিয়ে ম্যাসলম্যানে পরিণত করেছে। তাছাড়া রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ এখন চলে গেছে,  অর্থ বৈভব ও বিত্তশালীদের কাছে। তারা নিজ দলের নীতি, উদ্যেশ্য ও আর্দশ প্রচার করার চাইতে নিজের নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্ব ধরে রাখার কাজে ব্যস্ত। তাই দেখা যায়. রাজনৈতিক নেতাদেরই ছত্রচায়ায় একদল অপরাধী বেড়ে উঠছে। এভাবেই সামাজিক অবক্ষয় দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সামাজিক অবক্ষয়তার হাত থেকে দেশ এবং সমাজকে রক্ষা করতে পারেন রাজনৈতিক নেতারা। নেতারা আদর্শিক রাজনৈতিক অনুশীলন এবং রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করলেই সামাজিক অপরাধ অনেক কমে যাবে।
লেখক:- কলামিস্ট