সাম্প্রদায়িকতা : আমাদের করণীয়

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০১৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

তামিম শিরাজী
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে আবার লেগেছে ধর্মান্ধতার আগুন। ধর্ম অবমাননার মিথ্যে গুজবে একের পর এক পুড়ছে হিন্দু বাড়ি, মন্দির, মরছে মানুষ, হারাচ্ছে ভিটে-মাটি সর্বস্ব। সেই সাথে চলছে আদিবাসি নির্যাতনের মহাউৎসব। আদিবাসি নারী ধর্ষণ, দলগতধর্ষণ, খুন, জমিদখল এখন নিত্যদিনের পত্রিকার শিরোনাম। সম্প্রতি সময়ে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার কারণ জানতে হলে আমাদের একটু পেছাতে হবে। সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার কৌশল এই উপমহাদেশে বেশ পুরোনো। এর সাথে জড়িয়ে আছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন হিসেব নিকেশ। এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় বৃটিশ শাসকশ্রেণির হাতে। এক চেটিয়া বৃটিশ রাজ্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে মানুষ, সে স্তরে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃষ্টান সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরু কোন বিভেদ ছিল না। বৃটিশরা বুঝতে পেরেছিল তাদের মসনদ টেকাতে এই ঐক্য ভাঙ্গার বিকল্প নেই। ১৯০৬ সালে একই বছর বৃটিশ শাসকদের প্রত্যক্ষ মদদে জন্ম নেয় দুটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভা। কারণ বৃটিশরা ভালো করেই জানত এই ঐক্য ভাঙ্গার একমাত্র হাতিয়ার হলো “ধর্ম”। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট বাংলার মুসলিম লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ প্ররোচণায় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ১০ অক্টোবর হতে নভেম্বর পর্যন্ত বৃহত্তম নোয়াখালী জেলায় প্রায় ২০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে হিন্দুদের উপর নারকীয় হত্যাও চালানো হয়। ধারণা করা হয় ৫০০০ এরও বেশি হিন্দু হত্যা ও শতাধিক হিন্দু নারী ধর্ষণের ঘটনা সে সময় ঘটেছিল। হাজারো হিন্দুকে জোর করে মুসলিম করা হয়েছিল। ঘটনার ভয়াবহতা এতই ছিল যে, নোয়াখালীর হিন্দুদের রক্ষা করতে শেষ পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধীকে আসতে হয়েছিল। ৪৭-দাঙ্গা আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। কলকাতায় দাঙ্গা, লুটপাট অগ্নিসংযোগ, হত্যা শুরু হয়। সরকারি হিসেবে সেই হত্যার পরিমাণ ছিল ১০ লাখ। বেসরকারি হিসেবে নিশ্চিতভাবেই সেটি বেশি হবে। অবশেষে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে জন্ম নেয় দুটি দেশ, হিন্দুস্থান এবং পাকিস্তান। ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, বিনয়, বাদল, দিনেশদের আত্মদানকে উপেক্ষা করে তাদের রক্তকে পদদলিত করে মোহন লাল করমচাঁদ গান্ধী, জওহর লাল নেহেরু আর জিন্নাহ সাহেবকে নিয়ে মাউন্টব্যাটেন সাহেব সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করে। দেশ ত্যাগের আগে এটি ছিল বৃটিশদের সর্বশেষ এবং মারাত্মক ষড়যন্ত্রÑ যার বিষবাষ্পে আমরা এখনো পুড়ে চলেছি। পাকিস্তান শাসন আমলে ১৯৫০ সালে আবার দাঙ্গা লাগানো হয়। পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের একটি মহল দাঙ্গা ছড়াতে খবর রটিয়েছিল যে, কলকাতায় হিন্দুরা একে ফজলুল হককে মেরে ফেলেছে। শুরু হয়ে যায় তীব্র দাঙ্গা-হাঙ্গামা। ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ৯দিনে মেরে ফেলা হয় দশ হাজার হিন্দুকে। বরিশালের মাধবপাশার জমিদার বাড়িতে ২০০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। সে সময় মুলাদীর নদী লাল হয়ে গিয়েছিল হিন্দুদের রক্তে। মেরে ফেলা হয়েছিল ২৫০০ হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ। পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল বাড়িঘর, লুট হয়েছিল সহায় সম্পদ, ধর্ষণের শিকার হয়েছিল অসংখ্য হিন্দু নারী, দখল করা হয়েছিল জমি। ’৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হলে পাকিস্তানের বিদায় ঘণ্টা বেজে যায়Ñ সেই সাথে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগকে প্রত্যাখ্যানের মধ্যদিয়ে পাকিস্তানের জনগণ মূলত সাম্প্রদায়িকতাকেই প্রত্যখ্যান করে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনা তখন থেকেই বাঙালি জাতিসত্তার মূল ভিত্তি যা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। তদানিন্তন আয়ূব- মোনায়েম সরকারের সরাসরি প্ররোচণায় ১৯৬৪ সালে আরো একবার দাঙ্গা লাগানো হয়। ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। শুধুমাত্র খুলনার মংলা ঘাটেই হত্যা করা হয় ৩০০ জনকে। সে সময় বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলিমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বায়ক ও কমিউনিস্ট পার্টির আলী আকসাদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। যার কার্যালয় ছিল ভাসানী ন্যাপের সাইদুর রহমানের তোপখানায় রোডের অফিস। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠে। ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে বাংলার হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃস্টান সংখ্যালঘু সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শুরু করে মুক্তির লড়াই। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনা প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘৭২-এর সংবিধানে দেশ পরিচালনা মূলভিত্তির চারটির মাঝে ধর্মনিরপেক্ষতা স্থান পায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন রাজাকার, আলবদর, আল শামস এদেশিয় লুটেরাদের নিয়ে বহু হিন্দু বাড়ি লুট, অগ্নিসংযোগ, হিন্দু নারীদের ধর্ষণ হত্যা ও হিন্দুদের জমি দখল করেছিল। সেই সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয় এবং বাংলাদেশে সকল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের যাত্রা হোঁচট খায়। ১৯৭৫ এÑ ইতিহাসের ঘৃণ্যতম হত্যকা-টি সংঘটিত হয়। শেখ মুজিবকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালির হাজার বছরের আকাক্সক্ষার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনাকে চিরতরে মাটি চাপা দেয়া হয়। ’৭৫ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এলে ইনডিমনিটি অধ্যাদেশ জরি করে সকল যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে, রাজাকার কমান্ডার গালাম আজমকে পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরিয়ে আনে এবং মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। যুদ্ধাপরাধী রাজাকাররা পরবর্তীতে জিয়ার রাজনৈতিকদল এবং মন্ত্রিসভায় জায়গা পায়। স্বৈরশাসক এরশাদও নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে ধর্মকে ব্যবহার করে। রাষ্ট্রধর্ম বিল পাশের মাধ্যমে আরেক দফা সাম্প্রদায়িকতাকে উষ্কে দেয়া হয় যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এভাবেই ধীরে ধীরে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটানো হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না ঘটলেও থেমে নেই সংখ্যালঘু নির্যাতন। হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান আদিবাসিদের উপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। হিন্দু- বৌদ্ধ-খৃষ্টান পরিষদ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছেন, ২০১৫ সালে সংখ্যালঘুদের উপর ২৬২টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্যাতনের মধ্যে ২৪ জনকে হত্যা, ২৪ জন নারীকে অপহরণ এবং ২৫ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এর ফলে ১৫৬২টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, সংখ্যালঘুদের ২০৯টি প্রতিষ্ঠান লুট হয়েছে এবং ৬০টি পরিবার তাদের ভিটা বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছে। অপরদিকে ২০১৫ সালে আদিবাসিদের উপর নির্যাতনের ৬৯টি ঘটনার মধ্যে ৩৮টি পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বাকিগুলো সমতলে সংঘটিত হয়েছে। কাপেং ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ আদিবাসি নারী নেটওয়ার্ক “বাংলাদেশের আদিবাসি নারীদের সামগ্রিক পরিস্থিতি রিপোর্ট ২০১৫” তে দাবি করেছেন ৬৯টি ঘটনার মধ্যে ১৪টি ধর্ষণ, ১২টি দলগতধর্ষণ, ১১টি শারীরিক লাঞ্ছনা, ৬টি শারীরিক ও যৌন হয়রানি এবং ১৬টি ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। যার একটিরও সুষ্ঠু বিচার হয়নি। বিচারহীনতা এসব ঘটনাকে উৎসাহিত করছে। সাম্প্রদায়িক হামলার অতীত বর্তমান লক্ষ্য করলে দেখা যায় সাধারণত তিনটি কারণে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হয়ে থাকে, আর সেগুলো হলÑ (১) দেশিয় রাজনীতি (২) লুটেরাবৃত্তি (৩) আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। দেশের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক মহল বিএনপি-জামাত জোট রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা চালিয়ে থাকে। ধর্মের নামে রাজনীতি করা এ মহল দেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটাতে চায়। বিএনপি-জামাতের সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতা আজ উগ্র সশস্ত্র জঙ্গিবাদ রূপে আবির্ভুত হয়েছে। বিএনপি জামাত জোট আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গি তৈরির ঘটনার আমরা দেখেছি। এবার আসি লুটেরাবৃত্তি প্রসঙ্গে। আমাদের দেশে এক শ্রেণির লুটেরা আছে যারা সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর জমি জায়গা দখলের সাথে জড়িত। সেই সাথে সংখ্যালঘু নারীদের ধর্ষণ, দলগতধর্ষণ, অপহরণ, গুম-খুনের মত ঘটনাও তারা ঘটিয়ে থাকে। এসব কাজে এরা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এদের দলে বিএনপি-জামাতের সাথে পিছিয়ে নেই আওয়ামী লীগের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটি চক্র। অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের মদতেও এসব ঘটনা ঘটে থাকে। সংখ্যালঘুদের জমি দখল কিংবা লুটপাটের ক্ষেত্রে বিএনপি জামাত আওয়ামী লীগ প্রগতিশীল প্রতিক্রিয়াশীল সবার মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বন্ধন লক্ষ্য করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল চিন্তার জোট সরকার ক্ষমতায় থাকলেও, চলমান সংখ্যালঘু নির্যাতনের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এর মাত্রা আগের তুলনায় বেড়েছে পক্ষান্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিষয়টা এখন আর কারোও অজানা নয়। দেশে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করে দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে চায় মার্কিনীরা সেটা আমরা সবাই জানি। ইদানিং লক্ষ্য করা যায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে মার্কিনপন্থি মানবাধিকার সংগঠন “হিউম্যান রাইট ওয়াচ” ভীষণ সোচ্চার। শোনা যায়, মার্কিনীরা মায়ানমারের আরাকান এবং বাংলাদেশের কক্সবাজারের কিছু এলাকা নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম দিতে চায়। যাতে নিজেদের সামরিক ঘাটিটি তারা নির্বিঘেœ করতে পারে। সারা বিশ্বে নিজেদের মোড়লিপনা টিকিয়ে রাখতে এবং পরাশক্তি চিনকে মোকাবেলায় মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের এই ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। এভাবেই নানান ষড়যন্ত্রে একের পর এক টার্গেট হচ্ছে সংখ্যালঘুরা। বাঙালির লড়াই এবং বাংলাদেশ  সৃষ্টির পেছনে যতখানি অবদান বাঙালির ঠিক ততখানি অবদান সংখ্যালঘুদের। মুক্তির লড়াইয়ে যতখানি ত্যাগ বাঙালির ঠিক ততখানিই ত্যাগ আছে সংখ্যালঘুদের। তাই বাংলাদেশ বাঁচাতে হলে, বাঁচাতে হবে সংখ্যালঘুদের। সাম্প্রদায়িকতা মোকাবেলার একমাত্র হাতিয়ার হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই পারে সংখ্যালঘুদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তাই সকল ধর্ম-বর্ণ-জাতি সম্প্রদায়ের অধিকার বাস্তবায়ন ও নিরাপত্তা রক্ষায় ‘৭২-এর সংবিধানের কোনই বিকল্প নেই। এই সাম্প্রদায়িকতার আগুন যদি এখনই থামানো না যায় তাহলে হয়তো এক সময় কালো কয়লার নিচে চাপা পড়ে যাবে লাল সবুজ।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রমৈত্রী, রাজশাহী মহ্নগর