সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাবি শিক্ষক সমিতির ক্ষোভ ও নিন্দা

আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০২১, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি:


বাংলাদেশের কুমিল্লায় কয়েক দিন আগে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা চলাকালীন একটি পূজাম-পে ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনের অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৩ অক্টোবরের কুমিল্লার এ ঘটনার রেশ ধরে পরবর্তী কয়েক দিনে নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, রংপুরসহ কয়েকটি জেলায় পূজাম-পে হামলা-ভাঙচুরসহ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি-ঘরে হামলা, আগুন দেওয়া, লুটপাট, হত্যাকা- ঘটানো, নারীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে।

সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা এ দেশেরই নাগরিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তারাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন, অনেকে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু আমরা বাংলাদেশে নানা সময়ে ইসলাম ধর্মের প্রতি অবমাননার অভিযোগ তুলে সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর উপর বর্বরোচিত সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটতে দেখেছি। কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপরও একই কায়দায় হামলা হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এসব ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। আমরা ক্ষুব্ধ, মর্মাহত, পীড়িত ও লজ্জিত বোধ করছি। আমরা এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। আবহমানকাল থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছে। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি, দেশে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীসহ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অতীতে নানা সময়ে এই সহাবস্থান নষ্টের চেষ্টা করেছে।

সাম্প্রতিক এসব সহিংসতার সূত্রপাত কীভাবে হলো, কীভাবে এর বিস্তার ঘটল তা এখনো তদন্তাধীন বিষয়। কারা এসব ঘটিয়েছে তা এখনো নিশ্চিত করে জানা না গেলেও এটা নিশ্চিত যে, এ ঘটনা আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সহিংসতার শিকার এসব মানুষের জীবন এতে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, নিজ দেশে তারা পরবাসীর মতো বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে কখনোই কাম্য নয়।

এসব ঘটনায় একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে যে, সাম্প্রদায়িক এসব সহিংসতার সূত্রপাত ঘটানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ধর্মীয় উসকানিমূলক নানা বক্তব্য, গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে। দেশে সকল মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও চরমপন্থা রুখতে সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আমরা সরকারের কাছে এই দাবিও জানাই, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পাঠাগার স্থাপন, নাটক-সঙ্গীত- চলচ্চিত্রসহ সকল সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়ানো ও খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সঠিক বিকাশের ব্যবস্থা করুন। তাহলে এসব ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এ দিকেও সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি। অন্যথায় মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ অচিরেই ধর্মীয় গোঁড়ামি ও উগ্র মতাদর্শের মানুষদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে বলে আমরা মনি করি। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের মানুষের, সকল ধরনের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের যে পরিচিতি রয়েছে তা সমুন্নত রাখতে সকলেরই এগিয়ে আসা উচিত বলে আমরা মনে করি।

রাবি শিক্ষক সমিতি সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছে, কুমিল্লা, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এসব সহিংসতার পেছনে যারাই জড়িত থাকুক সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার স্বপ্নের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল সেই চেতনার বিনাশকারী এসব অপচেষ্টা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শক্ত হাতে দমন করা হোক।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ