সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নগরীতে মানববন্ধন ও সমাবেশ

আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০২১, ১০:৩৮ অপরাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক:


দেশব্যাপী পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে নগরীতে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন ও সমাবেশ করা হয়েছে। এসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর বঙ্গবন্ধুর সংবিধান ফিরিয়ে দিন ‘মওদুদিবাদ’, ‘ওহাবিবাদ’ ও ধর্মের নামে রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষে অবিলম্বে ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ ও জাতীয় সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন গঠন করার দাবি জানানো হয়। পৃথকভাবে রোববার (২৪ অক্টোবর) দিনব্যাপী বিভিন্ন সময় নানান সংগঠন তাদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। সেই সাথে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানানো হয়।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি :

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি রাজশাহী জেলা ও মহানগর শাখার রোববার বিকাল সাড়ে ৪টায় সাহেব বাজার জিরোপয়েন্টে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি রাজশাহী মহানগরের নির্বাহী সভাপতি সুজিত সরকারের সভাপতিত্বে ও মহানগর নির্বাহী সদস্য ছাত্র নেতা তামিম শিরাজীর সঞ্চালনায় সমাবেশ টি পরিচালিত হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ আজ যখন একটি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তখন একাত্তরে পরাজিত শক্তি ও জনগণের প্রত্যাখ্যাত একটি মহল বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল একটি অসম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বৈষাম্যহীন বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে।

বক্তারা আরও বলেন, সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া হবে, এদেশে তাদের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে’৭২ এর সংবিধানের অপরিহার্যতা অনিস্বীকার্য। এই চেতনা বাস্তবায়নে’৭২ এর সংবিধানের চার মূলনীতি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙ্গালী জাতীয়বাদ ও সমাজতন্ত্র পূনঃপ্রতিষ্ঠা করার কোনো বিকল্প নেই।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক উপাধ্যক্ষ কামরুজ্জামান, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি, রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাক্ষ রাজকুমার সরকার, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি রাজশাহী জেলার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী বরজাহান, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের রাজশাহী মহানগরের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল ঘোষ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার ঘোষ, রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি সিদ্ধার্থ শংকর সাহা, সেক্টর কমান্ডার ফোরাম রাজশাহী মহানগর এর সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক অন্জনা সরকার, স্টুডেন্ট ফ্রন্ট নির্মুল কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইখতিয়ার প্রামানিক। এ ছাড়াও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন, নির্মুল কমিটির মহিলা ইউনিট এর সাধারণ সম্পাদক আয়েশা ইসলাম মুন্নী, নির্মুল কমিটির নেতা নাফিউল হক নাফিউ, রনি সরকার, মিলন, হ্যাপি, আলামিন সহ আরও অনেকে।

মন্দির ও মন্ডপে হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন বিএমএ :

সারাদেশে হিন্দুদের বাড়ি, মন্দির ও মন্ডপে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও প্রতিমা ভাঙচুরের প্রতিবাদে, বিএমএ কেন্দ্রিয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজশাহীতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। রোববার সকালে রামেক কলেজের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে রাজশাহীর কর্মরত মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।

এ সময় নেতৃবৃন্দ বলেন, দ্রুত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নেপথ্যের কুশীলবদের চিহ্নিত করে ও দায়ীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ‘আমাদের দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কোনো ঠাঁই নাই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সবসময় এসব উগ্রবাদীদের প্রতিহত করতে হবে। আমরা বাঙ্গালীদের ঐতিহ্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে হবে। আমরা মিলে মিশে সমাজে বসবাস করবো যে যার ধর্ম পালন করব। মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিএমএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা.আতাউর রহমান বাবু সাধারণ সম্পাদক ও রামেক অধ্যক্ষ ডা. মো. নওশাদ আলী, অধ্যাপক ডা. মো.খলিলুর রহমান, ডা.মাহবুবুর রহমান বাদশা, ডা.হাফিজুরর রহমান সহ হাসপাতালের চিকিৎসক ,নার্স,কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা।

সম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে রাবিতে প্রতিরোধ সমাবেশ :

দেশ জুড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের জানমাল, ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদে প্রতিরোধ সমাবেশ করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মীরা।

রোববার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টায় রাবি শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলকের সামনে এই প্রতিরোধ সমাবেশের অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মলয় কুমার বলেন, সাম্প্রদায়িক হামলা এটি নতুন কোন ঘটনা নয়। কুমিল্লা, রংপুর ছাড়াও অন্যান্য জায়গায় যে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে এগুলো একটি পরিকল্পিত ঘটনা। একটি গোষ্ঠী ধর্ম, বর্ণ, জাতির মাঝে উস্কানি দিয়ে রাজনীতি ও ব্যবসায় সুবিধা নিচ্ছে। এর পেছনে কারা ঘাপটি মেরে আছে তা উন্মোচনে জোর দাবি জানাই।

এ ধরনের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে হবে বলে জানান অধ্যাপক মলয়।

দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. আবু বক্কর বলেন, ১৯৪৭ সালে আগস্ট মাসে আমাদের দেশ ভাগ হয়। অক্টোবরে দুর্গা পুজায় প্রতিমা বিসর্জনে বরিশালের মুসলমানরা নিরাপত্তা দিয়েছিলো। তখন রাষ্ট্র ভালো ছিলো, মানুষও ভালো ছিলো। আজকে আমরা সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছি।

রূপসা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লায় ঘটনা কি ছিলো সরকার এগুলো তুলে ধরুক। সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হিন্দু, মুসলমানের মাঝে ভাগ করতে থাকবে। আমাদের এগুলো প্রতিহত করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি মো. আজমের সঞ্চালনায় ও কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মহিউদ্দিন মানিকের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড মাইক্রো বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক অমিত কুমার সাহা, মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ আজম, উদীচির সাধারণ সম্পাদক রবিন, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের রাবি শাখা সাধারণ সম্পাদক মুহব্বত হোসেন মিলন, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের আমান উল্লাহ ও তীর্থক নাটকের কর্মী দিপু রায় প্রমুখ।

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ আয়োজনে সম্প্রীতি সমাবেশ :

সনাতন ধর্মালম্বীদের বাড়ীঘর, উপসানালয়ে হামলা, ভাঙচুর অগ্নি সংযোগের প্রতিবাদে রাজশাহীর বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আয়োজনে সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। রোববার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টায় নগরীর আদালত চত্বরে সমাবেশ করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী জেলা ও সদস্য বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, কেন্দ্রীয় প্রস্তুত কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন।

এ সভায় বক্তব্য দেন, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, কেন্দ্রীয় সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি সদস্য অ্যাড. একরামুল হক, রাজশাহী মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আইনজীবী নুরুল ইসলাম আসলাম সরকার, মহানগর আওয়ামীলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ও মহানগর দায়রা পিপি মুসাব্বিরুল ইসলাম , রাজশাহী জেলা আওয়ামীলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এজাজুল হক মানু, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ স্থানীয় নেতা অ্যাড. বজলে তৌহিদ আল হাসান বাবলা। একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেন, ওয়ার্কার্স পার্টিও নেতা অ্যাড. এন্তাজুল হক বাবু, জেলা পরিষদ সদস্য অ্যাড. গোলাম মোস্তফা ও এ্যাড. আব্দুর রহমান। সভা পরিচালনা করেন আওয়ামীলীগ রাজশাহী জেলার সদস্য ও শিশু আদালতের পিপি অ্যাড. নাসরিন আকতার মিতা। সভায় রাজশাহী মহানগর আওয়ামীলীগ সদস্য শামসুন্নাহার মুক্তি, যুব মহিলা আওয়ামীলীগ রাজশাহী মহানগর সভাপতি ইসমত আরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও মহানগর মহিলা আওয়ামীলীগ নেত্রী শামিমা ইয়াসমিন শিখা, রাজশাহী আইনজীবী সমিতির সিনিয়র আইনজীবী মোহন কুমার, শফিকুল ইসলাম, শরৎ চন্দ্র, বিশ্ব জিৎ শোভন, মোবারক সেলিম, শাজেমান আলী, আঞ্জুমনোয়ারা লিপি, আলমগীর সরদার, নজমুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান, শামিম আখতার, মমিনুল ইসলাম, মোজাহারুল ইসলাম, লতিফা খানম, মাজেদুল আলম শিবলি, আমজাদ হোসেন, সরওয়ার জাহান সাদি, আহসান হাবিব রঞ্জু, আতিকুজ্জামান পরাগ, মোযাহারুল ইসলাম, চন্দন কুমার, মনিরুল মনি, শাহবুর রহমান, আনোয়ারা বেগম বিউটিসহ শতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা দেশের অভ্যান্তরে এবং দেশের বাহিরে যারা ইলেকট্রিক মিডিয়া ভ্যবহার করে উস্কানিমূলক মিথ্যা প্রচার করে সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করছে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান।

খেলাঘর রাজশাহী জেলা কমিটি :

খেলাঘর আসর রাজশাহী জেলার উদ্যোগে সারাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে, পুজামন্ডপে ও বাড়ীঘরে হামলা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার আহবানে আয়োজন করা হয়েছে। সোমবার (২৫ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় নগরীর আলুপট্টির বঙ্গবন্ধু চত্বরে এ মানববন্ধন, গণসংগীত ও প্রতীকী ডিসপ্লের আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠানে খেলাঘরের সকল সংগঠক, সদস্য ও প্রগতিশলি চিন্তা চেতনার সকলকে অংশগ্রহণ করার আহবান জানানো হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ