সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ বরেন্দা

আপডেট: মার্চ ২২, ২০২০, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু


বরেন্দ্র ভূমিতে বরেন্দা গ্রাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাধীন নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের একটি মৌজা এবং ওই মৌজাতেই অবস্থিত বরেন্দা গ্রাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-নাচোল সড়কের বটতলী থেকে ডানদিকে এক কিলোমিটার গেলেই সেই বরেন্দা গ্রাম। গ্রামে যাবার জন্য বাইসাইকেল, মোটর সাইকেল ও রিক্সাভ্যান একমাত্র ভরসা। তবে বর্ষাকালে পায়ে হেঁটে যাবার বিকল্প নেই। গ্রামের চারিদিকে উর্বর ভূমিতে ধান খেত। বরেন্দ্র প্রকল্পের গভীর নলকূপ বছরে তিনবার ফসল চাষের সুযোগ করে দিয়েছে। ৩০ বছর আগে মাত্র ১টি আবাদ হতো। যা ছিল বর্ষাকালের বৃষ্টি নির্ভর। গ্রামটি গাছগাছালিতে ভরা সবুজ শ্যামল। যেন শান্তির প্রতীক। শুধু প্রকৃতিতে শান্তি তা নয়, গ্রামের মানুষগুলোর মধ্যে বিরাজ করছে অনাবিল শান্তি। যা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
একটি রিক্সাভ্যানে গ্রামে প্রবেশ করতে দেখা গেল একটি ছোট্ট সাইন বোর্ড, তাতে লেখা আছে গ্রামটি পাখিদের অভয়ারণ্য। এখানে পাখি শিকার নিষিদ্ধ। জানা গেল গ্রামের জনৈক মনসুর রহমান অত্যন্ত পাখিপ্রিয়। তিনি নিয়মিত তার বাড়ির আঙিনায় পাখির খাবার দেন। পাশাপাশি গ্রামের মানুষদের উদ্বুদ্ধ করেন পাখিদের যেন কেউ কষ্ট না দেয়। এই একটি মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই গ্রামটি পাখিদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত হরেক রকমের হাজার হাজার অতিথি পাখি গ্রামের গাছে গাছে বাঁশ ঝাড়ে ভরে যায়। অন্যান্য সময় এই এলাকার পাখিরা বাস করে। পাখিদের কলকাকলিতে ভরে ওঠে বরেন্দার আকাশ বাতাস।
প্রায় ২০০০ একর বিশিষ্ট ওই নিভৃত গ্রামটিতে বসতি স্থাপন হয়েছিল ১০০ বছরেরও আগে। ৬২ বছর বয়স্ক বরেন্দা গ্রামের লালজাত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান জানালেন, তিনি তার বাবার মুখে শুনেছেন ১০০ বছরের আগে অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে কিছু উপজাতি হিন্দু ও মুসলমান ভারতের রাঢ় এলাকা থেকে এসে এই পতিত ভূমিতে বসতি স্থাপন করেন। তারাই ঝোপঝাড় কেটে জমিগুলোকে আবাদযোগ্য করে এবং গ্রামের নাম দেয় বরেন্দা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য লোকের মধ্যে ছিল ক্ষুদিরাম সর্দার ও খোদা বক্স মন্ডল। ১৯২২ সালের সিভিল সেটেলমেন্ট রেকর্ডে তাদের সহ কিছু মানুষের নাম দেখা যায়। এই মৌজার একাংশের মালিক ছিল উপজাতিরা। উপজাতিরা চাষাবাদের ব্যাপারে তেমন উৎসাহী ছিলনা। তারা শিকার করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পছন্দ করত। এই সুযোগ মুসলমান কৃষকরা পর্যায়ক্রমে তাদের জমি কিনে নেয়। ফলে উপজাতিরা প্রায় ভূমিহীনে পরিণত হয়। তাই বলে তারা এই গ্রাম ছেড়ে যায়নি- দু’চারজন ছাড়া। যেমন যোগেন মুন্ডা, সাধুচরণ পাহান, নাথুরাম মন্ডল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গ্রামের হিন্দুরা ভারত চলে গেলেও স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসে এবং তাদের সহায় সম্বল ফিরে পায়। এই গ্রামের তাপস মুখার্জী, ঝড়ু পাহান, ফড়িং মুন্ডা, পপি মুখার্জী, রজনী চক্রবর্তীর সাথে কথা বলে এমনটাই জানা গেল। বরাবরই এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় ছিল এবং এখনো আছে। গ্রামে প্রায় দেড়শ’ পুকুর আছে। এর অধিকাংশই খাস পুকুর। এগুলো যে যেমনভাবে পারতো ভোগ দখল করতো। সেগুলো কেউই জবর দখল করেনি, আজও করে না। আর বড় দিঘিটি ছিল সার্বজনীন। ১৯৯৭ সালের দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে মাছ চাষ জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৯৮ সালে বরেন্দা গ্রামের ৭ যুবক যুব উন্নয়ন কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা একটা যুব সমিতি গঠন করে এবং গ্রামের ওই বড় দিঘিটি জেলা প্রশাসনের কাছে লিজ গ্রহণ ও মাছ চাষের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ৩০ বিঘা আয়তন বিশিষ্ট এই দিঘিটি ছিল গ্রামের সার্বজনীন। ফলে গ্রামবাসীর সাথে ওই গ্রামের যুব সমিতির মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ সৃষ্টি হয়। ভয়ানক এই বিরোধ চলে ৪ বছর। ঝগড়া, ফ্যাসাদ, মারামারি, বাড়িঘর লুটপাট সহ ফকির মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি মারা যায়। ফলে পরস্পর বিরোধী ৪/৫টি মামলা হয়। অনেককে গ্রাম ছাড়তে হয়। এবং ২/৩ জনের হাজতবাস হয়। গ্রামের যে নিবিড় বন্ধন ছিল সেটা নষ্ট হয়ে যায়।
এই সময় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও ওই ইউনিয়নের তৎকালিন চেয়ারম্যান আব্দুল আওয়ালের শক্ত ও সাহসী পদক্ষেপে এই দীর্ঘ বিবাদের মীমাংসা হয়। যুব সমিতি ও গ্রামবাসী সকলেই তাদের মনের কালিমা মুছে আবার এক হয়। আর এক হবার মূল মন্ত্র হলো ওই দিঘীটি। গ্রামের প্রত্যেকেই হলো ওই পুকুরের সমান অংশীদার। যুব সমিতিকে পুণর্গঠিত করা হলো। আকারে বড় করা হলো। ৮০ সদস্য বিশিষ্ট ওই কমিটির নাম দেয়া হলো বরেন্দা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন কমিটি। ২০০৬ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ৮/৯ বছরে ওই পুকুরের আয় থেকে মামলার খরচ ও ক্ষতিপূরণ দিয়ে গ্রামের পূর্বের সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় এই নবগঠিত সমিতি। সমিতির কার্যক্রম আজও অব্যাহত আছে। গ্রামের বয়জেষ্ঠ্য ব্যক্তি সকলের প্রিয় ও বিশ্বস্ত হাজি আব্দুল কাদের ওই সমিতির সভাপতি আছেন। সভাপতি, সমিতির সদস্য আবুল হাসান, রুহুল আমিন, মিজানুর রহমান, আতাউর রহমানের সাথে আলাপ করে জানা গেল- ওই দিঘিতে মাছ চাষ করে প্রতি বছর ১০/১২ লাখ টাকা আয় হয়। সবই ব্যয় হয় ওই গ্রামের উন্নয়নের কাজে। ২০০৭ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দিঘির আয় থেকে হিন্দুদের শ্মশানের জায়গা কেনা হয়েছে এবং সীমানা প্রাচীর, ১টি বড় চকচকে মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। মুসলমানদের গোরস্থান ও ঈদগাহের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে, সমিতির জন্য ১টি ক্লাব ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এজন্য বিল বাবদ প্রায় ৫০/৬০ হাজার টাকা ব্যয় বহন করে ওই সমিতি। প্রতি বছর একবার ওই দিঘির চাষ করা মাছ থেকে মাথাপিছু ২৫০ গ্রাম করে মাছ বিতরণ করা হয় গ্রামবাসীকে। গরিব মেয়েদের বিয়ে, গরিব বয়স্কদের চিকিৎসার জন্য ২/৩ হাজার টাকা করে সাহায্য দেয়া হয়। মুসলমানরা দুই ঈদে হিন্দুদের বাড়িতে খাবার পাঠায়। হিন্দুদের পূজা-পার্বনে মুসলমানরা অংশগ্রহণ করে, উৎসাহ দেয়। পাশাপাশি পাহারা দেয়। হিন্দু-মুসলমানরা পরস্পর পরস্পরের বাড়িতে যাওয়া আসা করে, কোনো জাতপাতের বিচার করে না। গ্রামের কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবার আছে। সেখানে উপজাতি ও শুদ্ররা নির্দ্বিধায় যাতায়াত করে। প্রয়োজনে পরস্পরকে সাহায্য করে। মনে হয় এটি একটি গ্রাম নয়, একটি পরিবার।
শুধুমাত্র একটি দিঘির আয় থেকে এই সমিতি গ্রামের এত উন্নয়ন করতে পারে, হিন্দু মুসলমান এক সূত্রে গেঁথে দিতে পারে- তাহলে ‘বরেন্দা গ্রাম’ একটি মডেল গ্রাম হতে পারে। বরেন্দা গ্রামে প্রায় ৬ শত মুসলমান ও ২ শত হিন্দু পরিবার বসবাস করে। সবার মাঝেই লেখাপড়ার প্রসার ঘটেছে। প্রতি বছর ২/৪ জন করে এসএসসি, এইচএসসি ও ডিগ্রি পাশ করছে। শিক্ষক, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও এনজিওতে চাকরি করে ১০/১৫ জন। প্রতিটি বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে। গ্রামের আশেপাশে ৯টি নলকূপ ও ৩টি মিনি গভীর নলকূপ আছে। যদিও খরার সময় ভূগর্ভস্থ পানি নিচে নেমে যাওয়ায় পানির সংকট দেখা দেয়। সেচ মৌসুমে ধান আবাদে সংকট হয়। গ্রামে ২৭টি মোটর সাইকেল ও ৬/৭টি বাই সাইকেল থাকলেও বর্ষকালে অচল হয়ে যায়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে পাকা রাস্তা না থাকার কারণে এখানকার উৎপাদিত খাদ্য শস্য বাজারজাতকরণে ব্যয় বেড়ে যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া। গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এবং বর্তমানে লালজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া এখানে কোনো হাই স্কুল নেই। প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে হাই স্কুল হওয়ায় প্রাইমারি পাস করার পরে বিশেষত মেয়েরা ঝরে পড়ে। আর আশেপাশে ৪/৭ কিলোমিটারের মধ্যে ২/৩ টি কলেজ থাকলেও যাতাযাতের সমস্যার কারণে বহু ছাত্র ঝরে যায়। বর্ষাকালের পুরো ৩ মাস ওই গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। গ্রামবাসীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বটতলী থেকে দোগাছী পর্যন্ত ৬/৭ কি.মি. পাকা রাস্তার দাবি জানিয়েছে। এতে তাতে বহু সমস্যার সমাধান হবে।
বাংলাদেশের বহু গ্রামে উল্লিখিত দিঘির মত অর্থনৈতিক সম্পদ আছে যা দিয়ে ওইসব গ্রামে ‘বরেন্দা’র মত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গ্রাম বানানো যায়। সরকার বরেন্দার এই দৃষ্টান্ত স্থাপনে এই সব গ্রামে পৃথক একটি প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক