সারাদেশে বিচারাধীন পৌনে দুই লাখ মানবপাচার মামলা

আপডেট: জুন ১০, ২০২০, ১:৫৩ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক:


দেশে মানবপাচারের অভিযোগ নতুন কোনও ঘটনা না হলেও সম্প্রতি লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার পর পুনরায় তা আলোচনায় উঠে এসেছে। দেখা গেছে, মানবপাচারের অনেক অভিযোগই মামলা পর্যন্ত গড়ায় না, আড়ালে থেকে যায়। আবার মামলা হলেও তার বিচার শেষ হতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। সুপ্রিম কোর্ট থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় মানবপাচারের অভিযোগে দায়ের হওয়া এক লাখ ৭৫ হাজার ৬৭৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে ৩০ হাজার ৭১১টি মামলা।
মামলা ঝুলে থাকার বিষয়ে মোটা দাগে চারটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন বিভিন্ন জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর ও বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, অভিযোগকারীর চেয়ে আসামিপক্ষ অর্থ-বিত্তে ক্ষমতাশালী হওয়া ও আসামিপক্ষ বেশি তৎপর থাকায় মামলার ওপর প্রভাব ফেলে। বাদীপক্ষ আদালতের বাইরে মীমাংসা করতে বাধ্য হয় এবং সেটি সম্ভব হয় অপরাধটির ভয়াবহতা নিয়ে প্রচার-প্রচারণা বেশি না থাকার কারণে। তারা এও বলছেন, কোনও অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকলে, সেটি খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেয় না কোনও পক্ষই। তারা আরও বলছেন, মানবপাচারের মামলাগুলো বিচারের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয় খুব জরুরি।
সম্প্রতি লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের গুলিতে নিহত ২৬ জন বাংলাদেশি মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ ও যশোরের অধিবাসী ছিলেন। এসব জেলার মানবপাচার বিষয়ক আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটরদের সঙ্গে কথা বলেও মানবপাচারের চলমান মামলার দীর্ঘসূত্রতাসহ এই চার কারণ জানা যায়।
মাদারীপুরের পাবলিক প্রসিকিউটর সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানবপাচারের অভিযোগে খুব বেশি যে মামলা হয়, এমন না। এখন আদালত বন্ধ। কয়েকটি মামলা আছে এখনও তদন্তাধীন। জরুরি কিছু ছাড়া এসব মামলা আবার কবে বিচারের মুখোমুখি হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’
যশোর জেলা আদালতের ট্রাইব্যুনাল-২ এর পাবলিক প্রসিকিউটর রহমান মুকুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসামিপক্ষের তৎপরতায় মামলাকে ভিন্ন রূপ দেওয়া হয়।’ তিনি মার্চে এই দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আদালত লকডাউনে চলে যাওয়ায় কত মামলা চলমান, সেসব তথ্য দিতে পারছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের মামলা আদালতের বাইরে মীমাংসা হয়। টাকা-পয়সা লেনদেন করে পরস্পর মামলা তুলে নেওয়া, সাক্ষী হাজির না করা, সাক্ষী না পাওয়ার মতো বিষয়গুলো ঘটায় এবং মাঝখান থেকে প্রক্রিয়াটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।’
মানবপাচারের ঘটনাবহুল জেলা সুনামগঞ্জের পাবলিক প্রসিকিউটর শাহানা রাব্বানী উল্লিখিত কারণগুলো উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক মামলা আটকে আছে তা নয়। তবে ক্ষমতার প্রভাবের কারণে শেষ পর্যন্ত মামলা চালানোর আগ্রহ বা সামর্থ্য বাদীপক্ষের থাকে না।’ অপরাধটি যে জঘন্য তেমন কোনও প্রচার-প্রচারণা না থাকাও সচেতনতার অন্তরায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রংপুরের আইনজীবী আব্রাহাম লিংকন, যিনি বহুল আলোচিত ফেলানি হত্যা মামলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি মনে করেন, মানবপাচারের মামলাগুলো সাধারণত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকতে দেখা যায়, কিংবা দৃষ্টান্তমূলক বিচার দেখি না। এর বড় কারণ সাক্ষী আদালতে এসে মামলার পক্ষে বলে না।
অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন বলেন, ‘প্রভাবশালীরা এর পেছনে যুক্ত থাকায়, তারা সাক্ষী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় এবং যতটা সম্ভব দুর্বল তদন্ত প্রতিবেদনে যা যা করণীয় সেটাও তারা করে।’ একজন আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় প্রসিকিউটররা ম্যানেজ হয়ে গেলেও সমস্যা হয়। সাক্ষীর নিরাপত্তা দিতে না পারাও বড় সমস্যা।’ অপরাধটিকে যথেষ্ট ভয়াবহ বিবেচনা করে যুদ্ধাপরাধীদের মামলার ন্যায় গুরুত্ব দিয়ে যদি তদন্ত, সাক্ষী ব্যবস্থাপনা ও প্রসিকিউশন গড়ে তোলা যায়, তবে সাজা নিশ্চিত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অ্যাডভোকেট লিংকন বলেন, ‘শুধু এলাকায়ই নয় সীমান্তের এপার-ওপার দুপারেই এই চক্র ক্রিয়াশীল। এদের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।’
বেসরকারি সংগঠন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, “মামলা হলেও নিষ্পত্তির ঘটনা হাতে গোনা। শাস্তি আরও কম। কারণ, আসামিদের টাকা ও ক্ষমতা থাকে। বছরের পর বছর গেলেও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় কিছুদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে বের হয়ে যায় আসামিরা। আর পাচারের শিকার ব্যক্তিরা আর্থিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে হেয় হয়। পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘টায়ার-২ ওয়াচ লিস্টে’ রাখা হয়েছে।’’
সমস্যা চিহ্নিত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে মূলত এখন শ্রম অভিবাসনের নামে মানবপাচার বাড়ছে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়টা আরও জোরদার হওয়া জরুরি। যখনই বিদেশে পাচারের বিষয় সামনে আসে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় মনে করে, এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবার মনে করে, যেহেতু বিদেশে কাজের জন্য যায়—কাজেই ওটা প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের কাজ।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে ২০১২ সালে যে আইনটি করা হয়েছে, সেটি চমৎকার একটি আইন। তদন্ত ও শাস্তিসহ বেশকিছু বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। কিন্তু এই আইনের পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এছাড়া, জাতীয় যে কর্মপরিকল্পনা রয়েছে—সেটাও ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মানবপাচারের মামলাগুলো বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যায়নি আট বছরেও। এ বছর সাতটি বিভাগে ট্রাইব্যুনাল হওয়ার কথা। আমরা যদি সমন্বিত হয়ে কাজ করতে পারি, এনপিএ বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।’
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন