সাহিত্য সংগঠনের দায় দায়িত্ব

আপডেট: মে ১৮, ২০২৪, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু


অতি সম্প্রতি রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হাসান আজিজুল হক সাহিত্য উৎসবের দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় পর্বের আলোচ্য বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের সাহিত্য সংগঠনের দায় দায়িত্ব’। আলোচ্য বিষয়ে বেশ কয়েকজন বক্তা এবং যারা সাহিত্য সংগঠনের দায় দায়িত্ব পালন করছেন তারা বলেন, দেশে সাহিত্যের বিকাশের জন্য সংগঠন অপরিহার্য। সেখানে সাহিত্য চর্চা কেমন হচ্ছে তার দেখভালসহ তার উন্নয়নের জন্য সংগঠনকে সচল রাখা জরুরি। সংগঠনগুলি লেখকদের মাধ্যমে দেশের, অঞ্চলের, জেলার এবং প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষা সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে তুলে ধরবে জাতির কাছে। চলমান জীবনের ছবি প্রকাশিত হবে লেখনিতে। লেখকদের নিয়মিত আড্ডা চালু রাখতে হবে। এই ছিল মোটামুটিভাবে বক্তাদের বক্তব্যের সারাংশ।

এর বাইরে অনেক কথা আছে, অনেক কাজ আছে সাহিত্য সংগঠনগুলোর। যেগুলো কেউ বলে না। আমি সেগুলো বলতে চাই। ২০২১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন বইমেলাসহ স্থানীয় লেখক সাহিত্যিকদের সংবর্ধনার একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু সেখানে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কোনো সংগঠন ছিল না সে সময়। ফলে কিছু হ য ব র ল হয় এবং লেখকদের কিছু অংশ অসন্তুষ্ট হয়।

সেসময় জেলায় জাতীয় সাহিত্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন থাকলেও তা মোটেও কার্যকর ছিল না। গাংচিল নামে আরও একটি সংগঠন ছিল সেটা অকার্যকর ছিল। প্রেক্ষিতে একটি সাহিত্য সংগঠন করার প্রয়োজন অনুভব করি এবং কয়েকজন মিলে ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৮৭ জন লেখক ও সাহিত্যিকদের এক সমাবেশ করা হয়। সেই সমাবেশে লেখক পরিষদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। সেইদিন লেখক সাহিত্যিকদের কিছু সমস্যা নিয়ে আমি কিছু বিষয় অনুভব করি। সেসময় এ বিষয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে থাকলেও লেখা হয়নি।

কিন্তু হাসান আজিজুল হক সাহিত্য উৎসবে এসে এই আলোচ্য বিষয়টি দেখে মনে হলো অবশ্যই কিছু লেখা যায়। কারণ সাধারণ লেখকদের অনেক অব্যক্ত কথা আছে, বেদনা আছে যা তারা বলতে পারেন না। এ জন্যই আমার এ লেখার প্রয়াস। যদি এই জগতে সামান্য পরিবর্তন আনা যায়। সেগুলোই বিস্তারিতভাবে বলবো।

প্রথম কথা কব্,ি ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধ্কি, গল্পকার, নাট্যকার, সাংবাদিক, সাহিত্যিক প্রত্যেকের লেখার ক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে লেখক। নিশ্চিতভাবে তারা শিক্ষিত। সবাই লেখকের তালিকাভুক্ত হতে চান। কিন্তু সবার লেখার হাত একরকম নয়। সেক্ষেত্রে তাদের সম্পর্কটা কেমন হয় ? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যাদের লেখার হাত ভালো তারা একটু হলেও উচ্চাকাক্সক্ষা পোষণ করেন এবং যাদের লেখার হাত ভালো নয়- তারা হীনমন্যতায় ভুগেন। ফলে তারা ভালো লেখকদের করুণার পাত্র হয়ে থাকেন। অথবা এক সময় লেখার জগৎ থেকে বিদায় নেন। এক্ষেত্রে ব্যক্তি পর্যায়ে এমনকি সাংগঠনিক পর্যায়েও তাদের উৎসাহিত করা হয় না। নূন্যপক্ষে তাদের ভুলত্রুটি নিয়ে সমালোচনার মধ্যেও রাখা হয় না। তাদের উন্নত লেখার জন্য পরামর্শ বা প্রশিক্ষণ দেওয়ার গঠনতান্ত্রিক রীতি কোনো সংগঠনে আছে বলে মনে হয় না। থাকলে তাদের কেউ কেউ ভালো লেখক হয়ে উঠতে পারতেন। সাহিত্য উৎসবের জনৈক বক্তাতো সরাসরি বললেন কবি সাহিত্যিক তৈরি করা যায় না।

প্রকৃতিগতভাবে বা খোদা প্রদত্তভাবেই যোগ্যতাপ্রাপ্ত হয়। কথাটা পুরোপুরি সঠিক নয়। তাহলে লেখকের সাথে লেখকের সম্পর্কটা কি শুধু অনুষ্ঠান ভিত্তিক? অর্থাৎ বছরে ২/১ বার লেখক সম্মেলনে বা কবি সম্মেলনে আর সাম্প্রতিককালে ফেসবুকে, সেতো ভালো লেখকদের প্রশংসা। সাধারণ লেখকদের জন্য সমালোচনার পথটাও উন্মুক্ত থাকে না। আর মফস্বলে তো মোটেও নেই। এ থেকে বোঝা যায় লেখকদের কোনো গোত্র বা সম্প্রদায় নেই, তারা বিচ্ছিন্ন। তারা কোনো সময় বিশেষ প্রয়োজনে সংঠিত হয় আর সামান্য কারণেই বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জেলায় জেলায় এমন সংঠনের অভাব নেই।

দ্বিতীয় কথা: বিখ্যাত বা অখ্যাত লেখক যারা বই লেখেন তাদের উদ্দেশ্য বিবিধ। নিজের লেখা ছাপা অক্ষরে প্রকাশ পাবে, পাঠকরা পড়বে, গুনকীর্তন করবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মনে করবে, লেখাটা কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে, বইটি মানসম্মত হলে লেখকের নাম মুখে মুখে ছড়াবে,পাঠকেরা বই কিনবে, ভবিষ্যত বংশধর গর্ব করে বলবে আমার অমুক সেই লেখক ইত্যাদি। যারা বিখ্যাত লেখক হয়েছেন তাদের বই বাজারে বিক্রি হয়। প্রকাশকের কাছ থেকে রয়্যালটি পান। কিন্তু এমন লেখকের সংখ্যা হাতে গোনা। সাধারণ লেখকরা এ সুযোগ পান না। টাকা-পয়সা খরচ করে বই ছাপান কিন্তু বাজারজাত করতে পারেন না। এদের সংখ্যাই ৯৯ভাগ । কবিগুরুর কথায় পনের আনা দলভুক্ত। তবে দলে ভারি। সমাজের মূল অংশ এবং গতি। এরা এক আনা বা অসাধারণ হতে পারেন না।

তাদের বই-এর পাঠক থাকে না বলে বাধ্য হয় বিনে পয়সায় বিতরণ করতে। যদি ২/১ জনও পড়ে, একটু সমালোচনা করে, দেখা হলে বলে আপনার বই পড়েছি তাহলেই বই লেখা সার্থক হবে এই আশায়। কেউ পড়ে না। রাফ কাগজের মধ্যে ফেলে দেয়। কোনো এক সময়ে মুদির দোকানে ঠোঙ্গা হিসেবে দেখা যায়। অবশ্য কোনো কোনো পাঠক তার সখের আলমারিতে সাজিয়ে রাখেন। আরও একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় তাহলো আজকের লেখকদের ৯০ ভাগই কবি। আর কবিতার বইয়ে পাঠকের আগ্রহ আরও কম। এই পনের আনা লেখকদের জন্য যদি এমন নিয়ম করা হয় যে প্রত্যেকে প্রত্যেকের বই কিনবে নুন্যতম মূল্য দিয়ে তাহলে সব লেখকই তাদের বই ছাপানো অব্যাহত রাখতে পারবে। আর কোনো লেখকের কাছেই বই কেনাটা অসাধ্যের ব্যাপার নয়। সাহিত্য সংগঠনগুলি এ কাজটি দিব্যি করতে পারে। সেই সাথে বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রাখতে পারে।

তৃতীয় কথা: লেখকদের কেউ বিপদে আপদে, দুঃখকষ্টে বা অসুখবিসুখে পতিত হলে বিশেষত আর্থিক সংকটে পড়লে তেমনভাবে কেউ এগিয়ে আসে কি? আসে না। শক্ত বন্ধন না থাকলে। খুব বেশি হলে দূর থেকে সহানুভুতি জানাতে পারে। লেখকদের মধ্যে তেমন কোনো শক্ত বন্ধন দেখা যায় না। পারস্পারিক সহযোগিতা সহমর্মিতার জন্য যৌথভাবে ভূমিকা নিতে দেখা যায় না। কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক। তাই অর্থনৈতিক বন্ধন গড়া যেতে পারে। একটি সঞ্চয় সমিতি প্রাথমিকভাবে গড়তে পারলে পরবর্তিতে সেটাই কল্যাণ সমিতিতে পরিণত করা যায়। সেখানে নিয়মিত চাঁদা দানের মাধ্যমে ও নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে আপদকালিন এবং বিশেষত মৃত্যুকালে তার পরিবারকে বড় ধরনের সহযোগিতা করা যায়। দেশে এমন অনেক সংগঠন আছে যারা এই কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে নিজেদের আত্মিক বন্ধন গড়ছে। সাহিত্য সংগঠনগুলি জেলায় এমন বন্ধন গড়তে পারে।

চতুর্থ কথা: ঢাকায় প্রকাশকদের কাছে বই ছাপাতে গিয়ে কী ধরেনের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিতে হয় তা লেখকদের অজানা থাকার কথা নয়। যারা বিখ্যাত লেখক তাদের কথা বাদ দিয়ে। যারা মৌসুমি লেখক তাদের জন্য কী কোনো সহজ পথ নেই ? অবশ্যই আছে। এজন্য জেলাভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা গড়া যায় স্থানীয় লেখকদের মধ্যে থেকে। এখানেই লেখা কম্পোজ করা হবে, প্রুফ দেখা হবে, প্রচ্ছদ আঁকা হবে, বই ছাপানো হবে, বাঁধানো হবে। এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করতে পারলে এখানেও মানসম্মত বই প্রকাশ করা যেতে পারে। তাহলে অতিরিক্ত সময়, অর্থ, হয়রানির হাত থেকে রক্ষা পাবে লেখকরা। সাহিত্য সংগঠনগুলি এটা করতে পারে। এজন্য একই জেলায় একাধিক সাহিত্য সংগঠনের দরকার হবে না বিভেদও থাকবে না। শুধু তাই নয়. স্থানীয় বইগুলো নিয়ে গবেষণার কাজও করা যেতে পারে। যখন কোনো বড় সম্মেলন বা প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করতে চাইবে তখন নিজেদের অর্থেই করতে পারবে। বিভিন্ন সংস্থার কাছে চাঁদা ভিক্ষা করার অপবাদ ও অপমান থেকেও মুক্তি পাবে।

লেখক: সাংবাদিক