বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

সিএবি নিয়ে উত্তাল ভারত ভারত কি পাকিস্তানের পথেই হাঁটছে?

আপডেট: December 13, 2019, 1:26 am

ভারত কি আত্মঘাতি পথে এগুচ্ছে? এই প্রশ্নটি এখন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় যেমন, তেমনি ওই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিভাবেই আলোচনায় স্থান পাচ্ছে। এই আলোচনাটা আরো গভীররূপ পেয়েছে এই কারণে যে, শেষ পর্যন্ত ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ দেশের ঐতিহ্যবাহী ধারা আদৌ রক্ষা করা যাবে কি না? ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও করুণ পরিণতি পাকিস্তানের রুগ্ন ও রক্তাক্ত চেহেরা দেখলেই বুঝতে পারি। তা হলে কি ভারত পাকিস্তানি মার্কা দেশ হতে যাচ্ছে? এটা নিয়েই ভারত ও ভারতের বাইরের সংবাদ মাধ্যমগুলো নানাভাবে পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করছে। ভারতের অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনৈতিক দল ও সমর্থকগণ ভারতের অখণ্ডতা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করছে। একই সংশয় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক দেশগুলোরও।
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ইতোমধ্যেই নিম্নকক্ষ লোকসভার পর উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায়ও পাস হয়েছে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বা সিএবি। এর ফলে বিলটি আইনে পরিণত হতে চলেছে। তবে সংসদের উভয়কক্ষে তুমুল বিতর্কিত বিলটি পাস করার প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছে উঠেছে সারা ভারত। আইনটি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে বাংলাদেশেও।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারত এতদিন ধরে নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক’ রাষ্ট্র বলে পরিচয় দিয়ে এলেও এই বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনটির মাধ্যমে তারা সেই পরিচয়টি হারিয়ে ফেললো। এমনকি তাদের ‘হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচয়ই প্রকাশ্য হয়ে গেল। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশেও এই আইনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
নতুন এই আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অমুসলিমরা ‘ধর্ম, প্রাণ ও সম্মান রক্ষার তাগিদে অত্যাচারিত হয়ে’ ভারতে গেলে তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে। আগের আইন অনুযায়ী কেউ ১২ বছর ভারতে থাকলে দেশটির নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য বিবেচিত হতেন। সংশোধিত আইনে এই সময়সীমা অর্ধেক কমিয়ে ছয় বছর করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ওই সব দেশের সংখ্যালঘুরা গভীর আস্থার সঙ্কটে পড়তে পারে।
এই বিলের তুমুল সমালোচনা করছে ভারতের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসসহ বিরোধী রাজনৈতিক শিবির ও সুশীল সমাজ। ধর্মীয় বিবেচনায় দেশের একটি সম্প্রদায়কে (মুসলিম) বিতাড়িত করতে এমন বিলের বিরোধিতায় দেশব্যাপি প্রতিবাদ কর্মসূচিও নিয়েছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদাতা কংগ্রেস।
এই উপমহাদেশে দুশ’ বছরের ওপর ধর্ম ও জাতিসত্তা নিয়ে হানাহানির তিক্ত অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আছে। দেশ ও জাতিকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি এবং অন্যদিকে কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা ও মূঢ়তা থেকে মুক্তির দৃঢ়তর অঙ্গীকার নিয়েই বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে এই উপমহাদেশের মানুষ। এই চেতনার আলোকেই ভারত জাতিরাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মানুষও একটি জনযুদ্ধের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের বুনিয়াদ রচনা করেছে। বাংলাদেশ এখন সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। এ ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের অনুপ্রেরণা ছিল। কিন্তু ভারত ঐতিহ্যগতভাবে চর্চিত বহুত্ববাদের ধারণা থেকে সরে যাচ্ছেÑ এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ভারতের শেকড় ছেঁড়া এই অবস্থান এ অঞ্চলের রাজনীতিতে অস্থিরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এরফলে ভারত সব চেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আশপাশের দেশগুলোতও সে আঁচ থেকে রক্ষা পাবে না। ভারতের ক্ষমতাসীনরা বুঝতেই চেষ্টা করছে না যে, তারা কুঠারাঘাতটা একটি জাতিগোষ্ঠিকে নির্দিষ্ট করলেও মূলত সেটি তাদের পায়েই আঘাত করছে। এতে ভারতই জর্জরিত হবে। বিভেদের রাজনীতি প্রকট হবে এবং বিভেদ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। ভারতের মধ্য থেকেই সে উপলব্ধি জাগরিত হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা হবে তো?

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ