সিরাজগঞ্জে বাল্যবিয়ে বন্ধে রেকর্ড করেছেন এসিল্যান্ড সদর

আপডেট: জানুয়ারি ২২, ২০২০, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি


সিরাজগঞ্জে দায়িত্ব পালনের ২২ মাসে ২০৩ বাল্যবিয়ে বন্ধ করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আনিসুর রহমান। এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রার টার্গেটগুলোর অন্যতম বাল্যবিয়ে বন্ধে তার এ অর্জন ইতিবাচকভাবে দেখছে জেলা প্রশাসনসহ সিরাজগঞ্জবাসী। এজন্য ২০১৯ সালের ২৩ জুন আন্তর্জাতিক পাবলিক সার্ভিস দিবসে সদরের এই সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) বাল্যবিবাহ বন্ধে অবদান রাখায় বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা।
দক্ষ কর্মঠ ও পরিশ্রমি কর্মকর্তা আনিসুর রহমান যেখানেই দায়িত্বে ছিলেন সেখানেই নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন। ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যশোরে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার ভেজাল বিরোধী অভিযানে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গে সাড়া পড়ে যায়। ভেজাল কারবারীরা নয়-ছয় কারবার বাদ দিয়ে নিয়ম মানতে বাধ্য হন। এজন্য যশোরের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের মুখে এখনো ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমানের প্রশংসা অবিস্মরণীয়।
২০১৭ সালের শেষ দিকে তিনি বদলি হন যমুনা নদী বিধৌত সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলায়। তিনি সেখানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এরপর এখানে অনিয়মের বিরুদ্ধে মাঠে নামেন তিনি। দুটি ইলিশ প্রজনন মৌসুমে তিনি নিয়ম ভঙ্গকারী ১২৪ জন জেলেকে কারাদণ্ড প্রদান করেন।এছাড়া এ বছর মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে সিরাজগঞ্জ সদরে ১১৬ জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করে ইলিশ রক্ষায় অবদান রাখেন। যা এখনো চৌহালীবাসীর মুখে মুখে তার সততার কর্মকাণ্ডের নিদর্শন। চৌহালী উপজেলা থেকে সকল পাবলিক পরীক্ষায় নকল একেবারে দূর করেছিলেন তিনি। শুধু তাই নয় চৌহালী উপজেলায় কর্মকালীন ৩৩ সপ্তাহে ৩৪ টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেন। এরপর বদলি হয়ে আসেন সদর উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে। এখানে সাড়ে ১২ মাসে ১৬৯ টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করেন। ইতোমধ্যে একদিনে৭ টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করে অনবদ্য রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এরমধ্যে পৌরসভায় ৩২টি, ইউনিয়ন পর্যায়ে খোকশাবাড়ীতে ১১টি, সয়দাবাদে ১৬টি, কালিয়া হরিপুরে ১৯টি, বাগবাটিতে ২৬টি, রতনকান্দিতে ২৯টি, বহুলীতে ১৩টি, শিয়ালকোলে ১০টি, ছোনগাছায় ১০টি, কাওয়াখোলায় ৩টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেন তিনি। এদের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির ৪ জন, ৪র্থ শ্রেণির ২ জন, পঞ্চম শ্রেণির ৬ জন, ষষ্ঠ শ্রেণির ১০ জন, সপ্তম শ্রেণির ২১ জন, অষ্টম শ্রেণির ৫৮ জন, নবম শ্রেণির ৩৭ জন, দশম শ্রেণির ২৭ জন, একাদশ শ্রেণির ছাত্রী ৪ জন। সিরাজগঞ্জ সদরে ২০১৯ সালে জানুয়ারি মাসে ২ টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ২ টি, মার্চ মাসে ১০ টি,এপ্রিল মাসে ২২ টি, মে মাসে ৮ টি, জুন মাসে ১৫ টি, জুলাই মাসে ১৭ টি, আগস্ট মাসে ২৭ টি, সেপ্টেম্বর মাসে ২৩ টি, অক্টোবর মাসে১৭ টি, নভেম্বর মাসে ১৬ টি, ডিসেম্বর মাসে ৫ টি এবং জানুয়ারী’ ২০২০ মাসে ৫ টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেন এসিল্যান্ড আনিসুর রহমান। এসময়ে বাল্যবিবাহ বন্ধে সদর উপজেলায় ১২ লাখ সাতচল্লিশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং ৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বর ও কনের বাবার মুচলেকা নেয়া হয়। তিনি চৌহালী উপজেলায় ৩৪ টি ও সদর উপজেলায় ১৬৯ টি সহ মোট ২০৩ টি বাল্য বিবাহ নিজে উপস্থিত হয়ে বন্ধ করেছেন। তিনি বাল্যবিবাহ বন্ধে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মা-বাবাদের বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন করেন। সিরাজগঞ্জ সদরের প্রায় সকল উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্র ছাত্রীদের বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, মাদক ও জুয়া সম্পর্কে সচেতন করেন এবং সামাজিক এ ব্যাধিগুলো দূর করার জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহযোগিতা চান। উপজেলা প্রশাসন এর মোবাইল নম্বর সরবরাহ করে সামাজিক এব্যাধিগুলো সম্পর্কে তথ্য চান। এছাড়া বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পাওয়া অসহায় গরীব ৩ ছাত্রীর পড়াশুনার দায়িত্ব নিয়েছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান। বিশিষ্টজনদের প্রত্যাশা এসিল্যান্ড আনিসুর রহমানের মতো যদি সবাই যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসেন তবে বাল্যবিবাহের অভিশাপ মুক্ত হবে লাখো শহীদের রক্তে রাঙা লাল সবুজের প্রিয় আমাদের এ মাতৃভূমি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ