সুঘ্রাণযুক্ত ফুলের প্রজাতি বিলুপ্ত হতে চলেছে, রক্ষার জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যেগ

আপডেট: মে ১০, ২০২২, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


ফুল প্রকৃতির দান। উদ্ভিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উদ্ভিদের প্রজননে মুখ্য ভুমিকা রাখে। সপুষ্পক উদ্ভিদের রূপান্তরিত অংশ ফল ও বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে বংশ বিস্তারে সাহায্য করে তাকে ফুল বলে। ফুল উদ্ভিদের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন অংশ। ফুল মনলোভা সৌন্দর্য ও পবিত্রতার প্রতীক।

ভালোবাসা ও সম্মান জানানোর উৎকৃষ্ট উপহার ফুল। ফুল মানুষের মাঝে সৌরভ ছড়ায় অকৃপণভাবে, তৃপ্ত করে, চোখ জুড়ায়। সুখ-শান্তির অনাবিল উৎস, নির্মল আনন্দ দেয়। মানুষের সুখে-দুঃখে, জনমে-মরণে, প্রেমে ভক্তিতে, বিবাহে বিরহে, রোগে শোকে, পুজা পার্বণে, অনুষ্ঠানে অভ্যর্থনায় ফুল অতি আবশ্যক।
বলা হয় যে, হৃদয়কে সুর ও ফুল উদ্বেলিত করতে পারেনা সে হৃদয় পাথর সমতুল্য। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত খাদ্যের পরে মনের ক্ষুধা পূরণের জন্য ফুলকে স্থান দিয়ে গেছেন। বলেছেন,
জোটে যদি মোটে একটি পয়সা, খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি ;
দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনিও হে অনুরাগী।
বাজারে বিকায় ফল তন্ডুল সে মিটায় শুধু চোখের ক্ষুধা,
হৃদয় প্রাণের ক্ষুধা নাশে ফুল, দুনিয়ার মাঝে সেইতো সুধা ।
আবার কিছু কবি ভিন্ন সুরে বলেছেন,
ফুলের সৌরভ মানুষের গৌরব চিরদিন থাকেনা।
ফুল ফুটে ঝরে যায় দুনিয়ার রীতি, মানুষ মরে যায় রেখে যায় স্মৃতি ।
কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মোহিতে ?
মানুষ স্বার্থপরের মত ফুলের সৌরভ গ্রহণ করে তৃপ্ত হয়, তারপরে তা অকৃতজ্ঞের মত পথে ছুড়ে ফেলে দেয়। ফুল নিয়ে কবি সাহিত্যিকদের লেখার যেমন অন্ত নেই, তেমনি ফুলের নাম লিখেও শেষ করা যাবেনা। রাজা বাদশাহরা তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান করতেন দেশ বিদেশের সব বিখ্যাত বাগান থেকে ফুল কিনে এনে।

কিছু রাজা বাদশাহ তো নিজেরাই বড় বড় ফুলের বাগান তৈরি করে গেছেন। স্পেন ও ফ্রান্স সহ কয়েকটি দেশে সরকারিভাবে জাফরান বা সেফরন নামে এক মূল্যবান ফুলের চাষ করে। এ ফুলের পাপড়ি এতই মূল্যবান যে তাকে লাল সোনা ফুল বলে। এই জাফরান হেকিমি চিকিৎসায় ব্যবহার হয়।

বহু মৌলভী সাহেবকে দেখেছি বিভিন্ন স্নায়বিক চিকিৎসার জন্য জাফরানের ঈষৎ লাল রঙ দিয়ে মেনিফোল্ড পেপারে কোরানের আয়াত লিখে তাবিজের মধ্যে ঢুকিয়ে রোগীকে ব্যবহার করতে দিতেন। জাই ফলের ফুলের নাম জৈত্রী। অত্যন্ত সুঘ্রাণযুক্ত এই ফুল ব্যবহার হয় মাংস পোলাও সহ বিভিন্ন উপাদেয় খাদ্য রান্নায়।

জৈত্রীর ফল বা বিচি জাইফল রান্নাবান্না সহ বিভিন্ন অসুখ বিসুখে কবিরাজেরা ব্যবহার করে। এমন অসংখ্য ফুল আছে যা হাজারো ভেষজগুণে সমৃদ্ধ। এই ফুলের নির্যাস দিয়ে এলোপ্যাথিক হোমিওপ্যাথিক ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করা হয়। তাই ফুল আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আগে আমরা দেখেছি পথে-ঘাটে ট্রেনে বাস স্ট্যান্ডে লঞ্চ স্টিমারে কিছু শিশু-কিশোরকে বকুল ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। পথিককে আকৃষ্ট করে একটু করুণা ও সামান্য উপার্জন করার উদ্দেশ্যে।

পথিকদের কেউ হয়তো একটা মালা নিয়ে ২/১ টাকা ধরিয়ে দিয়েছে। বাকি ফুল হয়তো তাকে ফেলে আসতে হয়েছে। এ দৃশ্য হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। মহান ভাষা দিবসে শহিদ মিনারে আমরা যখন ফুল দিতে গেছি তখন ফুলের দোকান ছিলনা। আমরা বিভিন্ন ব্যক্তির ফুলবাগানে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করে ফুল নিয়ে এসে সবাই মিলে মালা গেঁথেছি এবং ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২ টার পরে শহিদ মিনারে অর্পন করে এসেছি।

তাতে যে অনুভূতি ছিল তা একান্তভাবে মনের গহিনে। নিজেদের গর্বিত মনে হয়েছে। আর এখন রেডিমেড ফুলের মালা পাওয়া যায়। এ মালা শহিদ মিনারে অর্পন করে কেমন অনুভূতি হয় তা বলতে পারিনা।
ফুল এখন পণ্য ]
এতক্ষণ ফুলের সৌরভ, সৌন্দর্য আর ঔষধি গুনের কথা হলো। কিন্তু ফুল এখন এসব গুন ছাড়িয়ে পণ্যের গুন পেয়েছে। এখন বেচাকেনা হয়। এর জন্য রীতিমত পৃথক ফুলের বাজার রয়েছে। ক্রেতা বিক্রেতা আছে। আছে বিনিময় মূল্য। এটা ভোগবাদী পণ্য না হলেও বিলাসবাদী পণ্য তো বটে। আগে কিছু সৌখিন মানুষ ফুলের বাগান তৈরি করেছেন নিজের প্রশান্তির জন্য। রুচিশীলতা ও আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য। ফুলের বাগানটি ঘিরতেন শক্ত বেড়া দিয়ে, যেন কেউ চুরি করতে না পারে।

তবে কেউ ফুল চাইতে এলে নিরাশ করেননি বরং নিজহাতে তুলে দিয়েছেন গ্রহিতাকে। এতে তিনি নিজেকে দাতা ভেবে তৃপ্ত হয়েছেন। কিন্তু সেদিন ফুরিয়ে গেছে। এখন ফুলচাষিরা ফুলের চাষ করেন বিক্রির জন্য। তবে তারা হাতে গোনা কয়েকটি ফুলের চাষ করেন। অর্থাৎ যে ফুলগুলির বাজারে চাহিদা আছে।

এ ফুলের ক্রেতা হলো গ্রামে-গঞ্জে গড়ে ওঠা ফুলের দোকাদারেরা। এরা আবার গ্রামের নারীদের নিয়োজিত করে ফুলের মালা তৈরি করার জন্য। বহু নারী আছেন যারা সারাদিন শুধু বিভিন্ন ফুলের দোকানদারের ফুলের মালা গেঁথেই সংসার চালায়। মূলত এভাবেই ফুল বাণিজ্য একটা স্থান করে নিয়েছে অর্থনীতিতে। এ ব্যবসায় লাভ যেমন প্রচুর তেমনি লোকসানও কম হয়না। প্রার্থিত গ্রাহক না পেলে ফুল বিক্রি করতে পারেনা লোকসান হয়। কারণ পচনশীল পণ্য বলে তা ফেলে দিতে হয়। অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মত ফুলের মূল্য স্থির নয়। চাহিদার উপর নির্ভর করে এর মূল্য ।

১৯৯৮ সালে উবিনিগের নারী শিশু পাচার প্রতিরোধ কর্মসূচীর অধীনে পাচারকৃত নারীরা ভারতে কে কোথায় কিভাবে বেঁচে আছে তার খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য আমাকে ভারত যেতে হয়েছিল। সে যাত্রায় কোলকাতা দিল্লি সহ উত্তর প্রদেশের কয়েকটি জেলায় ঘুরেছিলাম। কোলকাতায় গিয়ে প্রথমেই গেলাম হাওড়া ব্রিজের শেষ প্রান্তে নীচে সর্ব বৃহৎ ফুলবাজারে। এ ফুলবাজারের ফুলের একটি বিরাট অংশ আসতো খুলনা ও যশোর জেলা থেকে এবং সেইসাথে আসতো ফুল ব্যবসার সাথে জড়িত এই দুই জেলার নারীরা। তাদের অনেকে সেখানকার হিন্দু পুরুষদের বিয়ে করে অথবা বিয়ে না করেই সেখানে থেকে গেছে।

এদের অনেকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। এদের একজন ছিল খুলনার নুরীর মেয়ে ফুলীর সাথে ও তার স্বামী গনেষ মুখার্জির সাথে। এরা সবাই ফুলের ব্যবসা করে। এর অর্থ হলো ১৯৯৮ সালের ২/৪ বছর আগে থেকেই খুলনায় ও যশোরে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হতো। যদিও সে সময় বাংলাদেশে তেমন ফুলবাজার গড়ে উঠেনি। আর মফস্বল জেলাগুলোতে ফুলের কোনো দোকান ছিলনা। এখন চাহিদার প্রেক্ষিতেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুলের দোকান হয়েছে এবং বানিজ্যিক চাষ হচ্ছে।

ফুলের অনেক প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে
এদিকে বাণিজ্যিক ফুলচাষের তোড়ে এবং সৌখিন ফুল বাগানের অভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সবার প্রিয় সুঘ্রাণযুক্ত ফুলের প্রজাতি হারিয়ে যেতে বসেছে। যা রীতিমত আশংকাজনক। এই ফুলগুলোর মধ্যে রয়েছে গন্ধরাজ, কাঁঠালিচাপা, বেলী-জুঁই-চামেলি, কামিনী টগর, কাঠগোল্পা, সন্ধ্যামনি, হাস্নাহেনা। গন্ধরাজের গাছ বেশ বড়। সাদা সাদা এবং বড় ফুল হয়। যখন ফুল ফুটে তখন ১০০ গজ দূর থেকে এর সুগন্ধি ভেসে আসে। পথিককে তার সুগন্ধে মাতিয়ে তুলে।

এফুল পাওয়ার জন্য মানুষ উদগ্রিব হয়ে উঠে। এ ফুল গাছটি গ্রামে-গঞ্জে দেখা যায়না। কাঁঠালিচাপা ফুল হয় এক প্রকার লতানো গাছে। এ গাছটি বাহনের সাহায্যে কোনো গাছে, প্রাচীরের উপরে, বাড়ির গেটের উপরে বা টালে বেড়ে উঠে। এফুলের সুগন্ধ ১০০ গজ দূর থেকে মানুষকে আকৃষ্ট করে। এর মনমাতানো ঘ্রাণ মানুষকে বিভোর করতে পারে। এ ফুল গাছটি দেখা পাওয়া ভার। এত আকর্ষণীয় ফুল খুব কম হয় এবং গাছে ফুল ধরে কম। বেলী জুঁই চামেলি ছোট গাছেই হয়।

এগুলোরও আছে মন মাতানো গন্ধ। এ ফুল গাছগুলি খুব সংবেদনশীল। নির্দিষ্ট তাপমাত্রাসহ অতি যতœ নিতে হয়। অন্যথায় শুকিয়ে মারা যায়। ফলে, সব বাগানে এফুলগুলি দেখা যায়না। কামিনী ফুলের গাছ বেশ বড় ঝাঁকড়া এবং জায়গা জুড়ে। এতে সাদা সাদা তারার মত ফুল ফুটে ঝাঁকে ঝাঁকে। চোখ জুড়ানো এ গাছ ও ফুল। আশেপাশে অন্ততপক্ষে ৫০ গজ জুড়ে এর সুগন্ধ ছড়ায়। এ ফুল গাছটি হারিয়ে যেতে বসেছে। টগর ফুলের গাছ অপেক্ষাকৃত ছোট তবে একই জাতের গাছ।

এফুল গাছটি খুব কম দেখা যায়। সুন্দর এফুলটিও বেশ সুগন্ধ ছড়ায়। কাঠগোলাপের বেশ বড় হয়, অনেক জায়গা দখল করে। অপূর্ব এর সুগন্ধ। হলুদ ও সাদা রঙের সমন্বয়ে এই ফুলটির মন্ মাতানো গন্ধ। এ গাছটি এখন দেখা যায়না। হাসনাহেনা একটি লতানো ফুলের গাছ। এটিও কোনো বাহনে অথবা টালে বেড়ে উঠে। ছোট ছোট সাদা ফুল সন্ধে বেলায় ফুটে এবং সারা রাত সুগন্ধ ছড়ায়। আগে সব বাড়িতেই দেখা যেত। এখন ২/৪ টা পাড়ায় পাওয়া যায়না।

সন্ধ্যামনি ফুলও লতানো গাছে হয়। তবে খুব বেশি বড় হয়না। বেগুনি রঙের এ ফুলটি সন্ধে বেলায় ফুটে ও অপুর্ব গন্ধ ছড়ায়। এফুল গাছটিও কম দেখা যায়। বর্ণিত এ ফুলগুলির মধ্যে বিশেষত কাঁঠালিচাপা, কামিনী, কাঠগোলাপ একেবারে হারিয়ে যাওয়ার পথে। এফুল গাছগুলি সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনা। এছাড়া গন্ধরাজ টগর বেলী জুঁই ফুলের প্রজাতি গুলোকেও রক্ষা জরুরি। প্রতিটি হর্টিকালচার সেন্টারে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি বাগানে এ জাতগুলো লাগানোর নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

অন্যথায় সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রবীণদের মুখে শুধু ইতিহাস হয়ে থাকবে। আর প্রবীণরা বিদায় নিলে ইতিহাসটাও হারিয়ে যাবে। তাই মনের ক্ষুধা মেটানোর জন্য এ সুঘ্রাণজাত ফুলগুলি রক্ষার আকুল আবেদন সরকারের কাছে।
লেখক : সাংবাদিক