সুন্দরবনের আয়ু আর মাত্র চার বছর!

আপডেট: জুন ২৪, ২০২৪, ৯:১৫ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক:


মেরেকেটে আর মাত্র চার বছর! সাধের সুন্দরবনকে গিলে খাবে সমুদ্র। ঐতিহ্যের এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে ঘিরে লাল সতর্কতার এমনই এক চাঞ্চল্যকর গবেষণাপত্র সদ্য প্রকাশিত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অফ সায়েন্টেফিক রিসার্চ (আইওএসআর) পত্রিকায়। ‘সুন্দরবন মাইট বি আ হিস্ট্রি’ শীর্ষক একুশ পাতার ওই রিপোর্টে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট ভূবিজ্ঞানী ড. সুজীব কর। বলেছেন, ‘এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের দেড় কোটি মানুষ আগামী দশ বছরের মধ্যে হয়ে উঠবেন ‘এনভায়রনমেন্টাল রিফিউজি’। পাশাপাশি সুন্দরবনের মানুষের জীবন-জীবিকার মানচিত্রটা এখন শুধু পাল্টে যাওয়ার অপেক্ষায়।’

২০০৫ থেকে ২০২০ সাল, দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে পাঁচজনের দল গড়ে এই সমীক্ষা চালিয়েছেন তিনি। চার বছর পর সেই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে শনিবার। সেখানে বলা হয়েছে, গোসাবা থেকে ক্যানিং, ডায়মন্ড হারবার, ঝড়খালি, নামখানা, কাকদ্বীপ–সহ গোটা সুন্দরবনটাই চার বছরের মধ্যে গিলে খাবে সমুদ্র। সুন্দরবনের জীববৈচিত্রেও ইতোমধ্যেই ধরা পড়ছে সেই ছবি। পাখি থেকে মাছ, সরীসৃপ থেকে উভচর, শামুক প্রজাতির বেশ কিছু প্রাণীকে আর সুন্দরবন–-তল্লাটে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। খাবারের লোভে জঙ্গল ছেড়ে বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এই কারণেই।

ধুয়েমুছে শেষ সুন্দরী, গরান-ঘেরা ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ৬০ শতাংশ গাছপালা। পাশাপাশি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে দ্রুতবেগে ঢুকছে সমুদ্রের লবণাক্ত জল। নদীর জলের মিষ্টতা কমে সেখানেও বেড়ে গেছে নোনা ভাব। অচিরেই ওই নদীর দু’ধার পরিণত হতে চলেছে গভীর অরণ্যে। কৃষিকাজ তো দূর–অস্ত্, লোটাকম্বল নিয়ে সরে যেতে হবে মানুষকেই। নতুন ওই বনভূমির দখল নেবে ব্যাঘ্রকুলসহ অন্য বন্যপ্রাণীরা।

সুজীববাবু জানান, একটা সময় এই কলকাতাতেই ছিল সুন্দরবন। বাঘেরা কলকাতাতেই দাপিয়ে বেড়াত। আস্তে আস্তে মানুষ কলকাতাকে দখল করেছে আর সুন্দরবন এগিয়ে গেছে সমুদ্রের দিকে। কিন্তু এখনকার চিত্রে সুন্দরবন যখন সমুদ্রের হুমকির মুখে, তখন সুন্দরবনই ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসছে লোকালয়ের দিকে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসছে বন্যপ্রাণীরাও। কুফল হিসেবে সমুদ্রের পাড় থেকে ৭০ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে দেখা দেবে জলকষ্ট। ভূগর্ভস্থ জল আরও লবণাক্ত হবে, হবে পান ও চাষের অযোগ্য।

ইতোমধ্যেই সুন্দরবনের ভূমিভাগের বেশ কিছু অংশ সাত মিটার থেকে সাড়ে চার মিটারে নেমে এসেছে। কারণ সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে গেছে প্রায় তিন মিটারের কাছাকাছি। সজনেখালি, সুধন্যখালি, মাতলা এবং বিদ্যাধরীর মাঝখানে বেশ কিছু জায়গায় মিলেছে তার প্রমাণ। সাগরদ্বীপের প্রায় ১৬ শতাংশ জমি, সুন্দরবন উপকূল অঞ্চল এবং ইছামতী, বিদ্যাধরী, মাতলা নদীর সাগরসঙ্গম বলয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ জমি প্রত্যেক বারই জোয়ারের সময় সমুদ্রে তলিয়ে গিয়ে আবার জেগে উঠছে ভাটায়। এ ছাড়াও প্রত্যেক বারই ষাঁড়াষাঁড়ি বা বিভিন্ন বানের সময় সুন্দরবনের নদীগুলিতে জোয়ারের জল ঢুকতে সময় লাগছে দু’থেকে আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু সেই জল বেরোচ্ছে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর। ফলে নদীখাতগুলির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পলি জমছে। নদীর ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে। বজায় থাকছে না নদীর ঢাল, দেখা মিলছে না স্রোতের। সেই সঙ্গে উপর্যুপরি ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত এই বনভূমি।

ভূবিজ্ঞানী ড. সুজীব করের কথায়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অঞ্চলকে বাঁচানোর জন্য এই মুহূর্তে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ না করলে চিরতরেই হারিয়ে যেতে পারে অনন্য সুন্দরী সুন্দরবন।
তথ্যসূত্র: আজকাল অনলাইন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ