সেকালের বাঙালি মুসলমান ও বাংলা ভাষা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২২, ৬:২৮ অপরাহ্ণ

সাইফুদ্দীন চৌধুরী


খ্রিস্টিয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে দিল্লির মুঘল শাসকদের সেনাবাহিনীতে মৌখিক ভাষা হিসেবে উর্দুর প্রচলন শুরু হয়। উর্দুভাষা সেনাবাহিনীর গণ্ডির বাইরে আসে সম্রাট শাহজাহানের সময়- তখন উর্দুই হয়ে উঠে দরবারের ভাষা।
উর্দু অচিরাৎকাল পরেই উত্তর ভারতের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বঙ্গদেশেও চলে আসে, যখন ঢাকা মুঘলদের প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। দিল্লির সালতানাতের নির্দেশে, অনুগ্রহে, পরামর্শে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় নবাব, সুবেদার, মসনবদার, জায়গিরদার, আয়মাদার ও তাদের পরিবার-পরিজন সেনাবাহিনীর কর্মী এবং ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে উর্দু ভাষার চর্চা শুরু হয়। এছাড়াও ঢাকায় আসে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বনেদী ব্যবসায়ীগণ। তাঁদের সকলের পারিবারিক ভাষা হিসেবে উর্দু স্থান লাভ করে। ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলেও বঙ্গের অন্যান্য স্থানের ন্যায় অভিজাত মুসলমানদের ভাষা উর্দুই থেকে যায়। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে ঢাকার নবাবদের নামোল্লেখ করা যায়। এই নবাবদের পূর্বপুরুষ ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যেই কাশ্মীর থেকে এসে প্রথমে শ্রীহট্টে এবং পরে ঢাকায় অবস্থান করতে শুরু করেন। এই পরিবারের প্রথম পুরুষ নবাব আবদুল গণি সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতা করার দরুণ ‘নবাব’ উপাধি লাভ করেছিলেন। মুঘল সংষ্কৃতির অনুসারী এই নবাব পরিবার উর্দু ভাষার ব্যবহার আভিজাত্যের একটি বড় প্রমাণ বলে মনে করতেন। বঙ্গের অন্যান্য স্থানে উর্দু ভাষার অনুরাগী ব্যক্তির মধ্যে ছিলেন কুমিল্লার (ত্রিপুরা) নবাব সিরাজুল ইসলাম ও নবাব সৈয়দ শামসুল হোদা, শ্রীহট্টের আবদুল করিম, মেদিনীপুরের আবদুর রহিম ও ওবায়দুল্লাহ্ সোহরাওয়ার্দী, চুঁচড়ার সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ। ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী নবাব আবদুল লতিফ মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর এই শিক্ষা সম্প্রসারণ আন্দোলনে ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমর্থনে কাজ করেছেন যতটা তার চাইতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন মুসলমানদের মধ্যে আরবি, ফারসি ও উর্দু প্রয়োগের ক্ষেত্রে। নবাব আবদুল লতিফ এই উদ্দেশ্যেই মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি গঠন করেন। তিনি তাঁর হুগলী মাদ্রাসা রিপোর্টে লেখেন :
Unless a Mohamedan is a person and Arabian Scholar, he cannot attain a respectable position in Mohamedan society i.e he will not be regarded or respected as a scholar and unless he has such a position, he can have no influence in the Mohamedan community.
নবাব আবদুল লতিফ ও তাঁর সঙ্গীরা বাংলা ভাষাকে একেবারে বাতিল করেননি। তবে তাঁদের অভিমত ছিল বাংলা নিম্নবর্ণের মুসলমানদের ভাষা পক্ষান্তরে উর্দু হলো উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মুসলমানদের ভাষা। নবাব আবদুল লতিফ ১৮৮২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে শিক্ষা কমিশন গঠিত হলে এর সভাপতি ডব্ল্যু. ডব্ল্যু. হান্টারকে লিখিত প্রশ্নের যে জবাব দেন, তাতে তাঁর এই মনোভাবের পরিচয় ধরা পড়ে-
Briefly summerised, my opinion as regard Bengalis that Primary Instruction for the lower class of the people, who for the most part are ethnically allied to the Hindoos, should be in the Bengali language Purified, however from the superstructure of Sanskrtism of learned Hindoos and supplemented by the numerous words of Arabic and Persian origin which are current in everybody speech, for this the Bengal of the law-court furnishes a good example.
নবাব আবদুল লতিফ এবং তাঁর অনুসারীদের মূল লক্ষ্য ছিল অভিজাত শ্রেণির মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে সরকারি এবং সওদাগরী চাকরির সংস্থান করা যাতে করে তাঁরা সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেন। এসব কারণেই, তাঁরা মক্তব-মাদ্রাসার আরবি-ফারসি শিক্ষার দ্বারা চালু রাখার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। এই আরবি-ফারসি শিক্ষা ছাড়া সমাজে ‘শরীফ’ হিসেবে পরিচয় দান সম্ভব নয় বলেও এঁরা মনে করতেন। ‘শরীফ’ মুসলমানদের পারিবারিক ভাষা কোনোক্রমেই বাংলা হতে পারে না। কিন্তু আঠারো শতকের কবি আবদুল হাকিম বঙ্গভাষা বিদ্বেষী ব্যক্তিদের কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছিলেনÑ
‘যে জন বঙ্গেত তবে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’
তিনি বঙ্গভাষা বিদ্বেষীদের বঙ্গদেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে বলেছেন।
কিন্তু নবাব আবদুল লতিফ এবং সৈয়দ আমীর আলীর বাংলা ভাষাকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রশ্নে, তাঁদের ক’জন অনুসারী সৈয়দ শামসুল হোদা, সৈয়দ ওয়াদেহ হোসেন, দেলওয়ার আহমদ প্রমুখ ‘লতিফ গোষ্ঠী’ ও ‘আমীর গোষ্ঠি’ থেকে বেরিয়ে এসে ‘কলিকাতা মোহামেডান ইউনিয়ন’ এবং ‘প্রাদেশিক বঙ্গীয় মুসলমান শিক্ষা সমিতি’ গঠন করে নতুন করে শিক্ষা ও সমাজ হিতৈষী আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, এ ভাষার মাধ্যমেই সর্বসাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে শিক্ষার বিস্তার ঘটান। এই আন্দোলনের সঙ্গে কিছু প্রতিশ্রুতিশীল বাঙালি মুসলমান লেখক যোগ দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদ, আবদুর রহীম, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মির্জা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী, খাদেমোল এসলাম বঙ্গবাসী, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, আবদুল করিম, মোজাফফর আহমদ, মোহাম্মদ আবদুল হাকিম, তসদ্দুক আহমদ, শেখ মোহাম্মদ ইদরিস আলী, শেখ আবদুস সোভহান প্রমুখ। এসব মুসলিম লেখকেরা ‘ইসলাম প্রচারক’, ‘নবনুর’, ‘কোহিনুর’, ‘প্রচারক’, ‘লহরী’, ‘নূর-আল ইমান’, ‘হাফেজ’, ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’, ‘ইসলাম দর্শন’, ‘আল-এসলাম’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ প্রভৃতি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষার সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ও বাংলা ভাষার অন্যতম খাদেম মির্জা মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর নিজ পত্রিকা ‘নূর-আল-ইমান’ (ভাদ্র, ৩০৭) পত্রিকায় উর্দু বাঙালি অনুগতদের ‘খেদমৎগার’ হিসেবে উল্লেখ করে মন্তব্য করা হয়েছে: ‘শরীফ সন্তানেরা এবং তাঁহাদের খিদমৎগারগণ উর্দু বলেন, বাংলাভাষা ঘৃণা করেন, কিন্তু সেই উর্দু জবানে মনের ভাব প্রকাশ করা দূরে থাকুক, পশ্চিমা লোকের লিখিত শব্দগুলিও অনেকে যথাস্থানে শুদ্ধ আকারে যথার্থ অর্থে প্রয়োগ করিতেও অপারগ। অথচ বাঙ্গালায় মনের ভাব প্রকাশ করিবার সুবিধা হইলেও ঘৃণা করিয়া তাহা হইতে বিরত হন … সতেজ স্বাভাবিক বাঙ্গালা ভাষা স্বাধীনতা পাইলে তৎসঙ্গে মুসলমান সমাজের উন্নতির যুগান্তর উপস্থিত হইবে।’ বলা বাহুল্য, এ সময় মির্জা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বাংলা পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন এবং আরবি ও ফারসি ভাষায় লিখিত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার জন্য ১৮৮৪ সালে রাজশাহীতে ‘নূর-আল-ইমান সমাজ’ নামে একটি জনকল্যাণমূলক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন।

‘ইসলাম প্রচারক’ সম্পাদক মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদ বাংলা ভাষার ঘোর বিরোধিতা করেছেন। তিনি তাঁর রচিত ‘মোহাম্মদ মোস্তাফা’ গ্রন্থের ভূমিকার এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের মুসলমানদিগের মাতৃভাষা বাংলা হওয়াতে সর্বনাশ হয়েছে।’ অথচ অবাক হবার ব্যাপার এই যে, এই রেয়াজউদ্দীন তাঁর ইসলাম প্রচারক- এ (পৌষ-মাঘ, ১৩৩৮) ইসমাইল হোসেন সিরাজীর। ‘মাতৃভাষা ও জাতীয় উন্নতি’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। ওই প্রবন্ধে ইসমাইল হোসেন সিরাজী লিখেছিলেন, বাংলার মুসলমানরা হীনমন্ন্যতায় ভুগছে। অতীতের বীর্যবত্তা ও জ্ঞানবত্তার বাণী প্রচার করে নির্জীব জাতির ভেতর আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় গরিমা সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন সিরাজী। এই উন্নতির জন্য মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম বলে মন্তব্য করে তিনি তার প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন: ‘মাতৃভাষা ব্যতীত কোন জাতি উন্নতি লাভ করিতে পারে নাই। যখন আরব জাতি জ্ঞান গৌরবের এবং জয় মহিমার বিজয় পতাকা পৃথিবীর নানা দেশে উড্ডীয়মান করিয়াছিলেন, যখন বর্তমান জগতের ভাগ্য চক্রের বিধাতা ইউরোপখণ্ড, তাঁহাদের পাদমূলে বসিয়া শিক্ষা ও সভ্যতা লাভ করিয়াছিলেনÑ তখন আরবগণ তাঁহাদের মাতৃভাষা আরবীর কীদৃশ কঠোর সাধনা এবং গভীর অধ্যবসায় বলে বিবিধ রত্মরাজিতে বিভূষিত করিয়াছিলেন, তাহা চিন্তা করিলে বিস্মিত হইতে হয়। পৃথিবীর যাবতীয় ভাষা- গ্রিক, ল্যাটিন, হিব্রু, জেন্দ, সংস্কৃত এমন কি চীন ভাষা হইতেও যাবতীয় উৎকৃষ্ট গ্রন্থ আরব্য ভাষায় অনুবাদিত হইয়াছিল। তাই আরব জাতি, ভূতলে অতুল কীর্ত্তির পতাকা উড়াইয়া গিয়াছেন।

বর্তমান যুগে ইংরেজ জাতির ইংরেজি ভাষার প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করিয়া দেখ। আজ ইংরেজি ভাষা অন্যুন ২৫ লক্ষ গ্রন্থে সমলঙ্কৃত। আরবী, ফারসী, চীন, সংস্কৃতি প্রভৃতি পৃথিবীর যাবতীয় শ্রেষ্ঠ এবং অশ্রেষ্ঠ ভাষা হইতে প্রতিদিন শত শত গ্রন্থ অনুবাদিত হইয়া ইংরেজি ভাষাকে পরিপুষ্ট করিতেছেÑ সহস্র সহস্র ধীসমৃদ্ধ জ্ঞানবৃদ্ধ মহা মহাপণ্ডিত, নিরন্তর মস্তিষ্ক পরিচালনা করিয়া অনবরত ইংরেজি ভাষায় আপনাদের অমূল্য চিন্তাস্রোতঃ ঢালিয়া দিতেছেন। তাই আজ ইংরেজি পৃথিবীর অদ্বিতীয় ভাষা এবং তাহার সেবক ইংরেজ ও আমেরিকান পৃৃথিবীর অদ্বিতীয় জাতি। তাই বলিতেছি, হে বঙ্গীয় মুসলমান। যদি জাতির মঙ্গল এবং কুশল কামনা কর তবে মাতৃভাষার সেবায় বদ্ধ পরিকর হও।

বঙ্গের প্রতি মাদ্রাসায় বাঙ্গালা ভাষার প্রতিষ্ঠা করা একান্তই কর্তব্য। আমাদের বঙ্গীয় মৌলবী সাহেবগণ, মাতৃভাষায় অনভিজ্ঞ বলিয়া সমাজের বা ধর্মের কোনই উপকার সাধন করিতে সমর্থ হইতেছেন না। তাঁহারা এক্ষণে কোনও সভা সমিতিতে বক্তৃতা বা ওয়াজ করিবার জন্য দণ্ডায়মান হইলে, তাঁহাদের কদর্য্য খিচুড়ী ভাষা শ্রবণে শিক্ষিত সভ্য শ্রোতাগণের হাস্য সম্বরণ করা কঠিন হইয়া পড়ে। হায় শত আক্ষেপ। আজ যদি আমাদের মৌলভী সাহেবগণ, এতটুকু ভাল বাঙ্গালাও জানিতেন, তাহা হইলে আজ তাঁহাদিগকে ভিক্ষার ঝুলি স্কন্ধে করিয়া দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিয়া জঠর জ্বালা নিবরণ করিতে হইত না। ভাল বাঙ্গালা জানিলে জমিদারি বা মহাজনী লাইনে অথবা আদালত সেরেস্তায় কিংবা চিকিৎসা বা গ্রন্থানুবাদে কার্য্যে ব্যাপৃত থাকিয়া গৌরবের সহিত জীবনযাত্রা নির্বাহ করিতে পারিতেন। মাদ্রাসা সমূহে রীতিমত বাঙ্গালা ভাষার অধ্যাপনা না হওয়ায়, তাঁহারা আরবী, ফারসী প্রভৃতি ভাষার যে দুই চারিখানি ভাল গ্রন্থ পড়েন, তাহাও তাঁহাদের হৃদয়াঙ্গম হয় না। বাঙ্গালা না জানায় আমাদিগের শুদ্ধ আরবি, পারসী পড়া মৌলবী সাহেবদিগের দ্বারা সমাজের উপকার হওয়া দূরে থাকুক, অনুদিন ক্ষতি এবং অবনতির মাত্রা বাড়িয়া চলিয়াছে। হায়! জানি না কবে মাদ্রাসাসমূহের সংস্কার হইবে। কবে হিন্দুস্থানী মৌলবীদিগের ন্যায় আমাদিগের দেশের মৌলবীগণ মাতৃভাষার কৃতিত্ব লাভ করিয়া, আরবী, পারসী ভাষার গ্রন্থ সকল অনুবাদ করতঃ জাতীয় উন্নতির পথ সুগম করিয়া দিবেন? হে মৌলবী সাহেবগণ! ইহা কি নিতান্তই লজ্জা এবং পরিতাপের বিষয় নহে যে, বঙ্গে সহস্র মাদ্রাসা পাস মুসলমান থাকিতে, আজ ব্রাহ্ম পণ্ডিত আমাদিগের কোরআন এবং হাদীসের অনুবাদ করিতেছেন?
তাই বলি, ভ্রাতঃবঙ্গীয় মুসলমান! আর আলস্যে কাল কাটাইও না। বঙ্গভাষাকে হিন্দুর ভাষা মনে করিও না। যে ভাষায় তুমি মনের সুখ-দুঃখের কথা প্রকাশ কর, যে ভাষায় তুমি স্বপ্ন দেখ, যে ভাষায় তুমি মনোভাব ব্যক্ত করিয়া প্রাণে শান্তি এবং আরাম লাভ কর তাহা নিজের মাতৃভাষা। জগতের সমস্ত ভাষা অপেক্ষা তাহার গৌরবের পরিমাণ নিতান্ত অল্প নহে। মাতাকে ঘৃণা করিলে, তাঁহার সেবা-শুশ্রুষা না করিলে যে পাপ, মাতৃভাষার সেবা না করিলে, তাহার যত্ন না করিলেও সেই পাপ।
মাতৃভাষা বাংলার সমর্থনে অসংখ্য মুসলমান কবি-সাহিত্যিক মতামত ব্যক্ত করে গেছেন এবং মনে করি, বাঙালি মুসলমান কবি সাহিত্যিকগণ সামাজিক মানুষ হিসেবে তাদের রচনার মাধ্যমে, সমাজের প্রয়োজন মিটাতে থাকেন। হৃদ্যতাপূর্ণ যুগপৎ সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী বাঙালি লেখকগণ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সমাজের নানা অনুষঙ্গ সমসাময়িক যুগের পটভূমিতে ফুটিয়ে তোলেন। কেবল মাতৃভাষা চর্চাই নয়, সেকালের মুসলমানের সার্বিক মন ও মানসিকতার পরিচয় জানতে হলে মুসলমানদের রচনার সঙ্গে অবশ্যই আমাদের পরিচিত হওয়া দরকার।