সেফটি জোন প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৭, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

মো. আবদুল কুদ্দুস


কবি নির্মলেন্দু গুণ ইতালির বিখ্যাত কবি দান্তের ‘জগতে শান্তিকামীদের মঙ্গল হউক’ শীর্ষক কবিতা অবলম্বনে রচনা করছেন ‘শান্তির ডিক্রি’ নামক একটি কবিতা। রোহিঙ্গা সংকটের প্রতিবাদস্বরূপ আমি এখানে তার কিছু অংশ তুলে ধরছি। কবি বলেছেন-“নিজের হাতে জমি চাষ করেন এমন একজন সাধারণ/ কৃষককে জিঙ্গেস করুন, আপনি কি চান শান্তি?/ তার উত্তর হবে;‘এই তো আমার সবচেয়ে প্রিয় চাওয়া।/ চাই প্রাণপণে চাই, শতমুখে চাই।’/ জিঙ্গেস করুন কারখানার একজন সাধারণ শ্রমিককে:/‘আপনি কী চান?’ তারও উত্তর হবে: ‘শান্তি।/ একটু শান্তির জন্যই তো এই অহোরাত্র শ্রম।’/ জিঙ্গেস করুন একটি বনের পাখিকে, সে-ও বলবে, শান্তি, অবশ্য যুদ্ধবাজরা বলতে পারেন, পাখিটি অন্য কথা বলছে।/ জিঙ্গেস করুন অরণ্যের যে কোনো বৃক্ষকে, সম্ভাব্য পরমাণু যুদ্ধের মোকাবিলায় প্রস্তুতি আছে কি না? পাতা নাড়িয়ে, আপ্রাণ প্রয়াসে সে বলে উঠবে: না না, না, না।” […] । “এই-যে শিশুরা সবুজ ঘাসের মাঠে ছুটছে,/ খেলছে, হাসছে-, এই মাঠ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।/ পুড়ে যাবে শিশুর মুখের হাসি।/ সেই বিকলাঙ্গ পৃথিবীর দিকে কে তাকবে,/ যেখানে জীবিতেরা ঈর্ষা করবে মৃতদের?//”
প্রিয় পাঠক, কবিতার এই কথাগুলো মিয়ানমারে হাজার বছর ধরে বৈধভাবে বসবাস করে আসা নাগরিক রোহিঙ্গাদের দুঃখ বেদনার প্রতিচ্ছবি। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক জোর পূর্বক নির্যাতনের শিকার হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আজ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গা কী? এটি কী কোনো বন্যপ্রাণীর নাম? না! না! না! ওরা মানুষ। পৃথিবীর অন্যসব সুস্থ সুন্দর দেহের মানুষের মতো রক্তে মাংসে গড়া ভালোবাসা ¯্নহে মমতায় ভরা হৃদয়ের মানুষ। ২৪ আগস্ট ২০১৭ তারিখের পর থেকে এসব মানুষের বাড়িঘরে আজও জ্বলছে আগুন। সেই আগুনে চোখের সামনে তাদের অনেকে নিজেদের প্রিয়জনকে পুড়ে শুধু মরতে নয়! ভস্ম হতে দেখেছে। এদের কেউ কেউ জীবনের সবটুকু শ্রম দিয়ে গড়ে তোলা বাড়িঘর পুড়তে দেখেছে। ধর্ষণ লুন্ঠন আর শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা অবর্ণনীয়। ভাবতে অবাক লাগে যারা এসব নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্যাতন করছে তারাও মানুষ। পশু নয়। মানুষের দ্বারা মানবতার প্রতি এই নির্মম নির্যাতনের চিত্র আজ পৃথিবীর সমস্ত শান্তিকামী মানুষের চোখকে হার মানিয়েছে। দুই চোখে একরাশ জল ফেলে সমবেদনা জনাতে হচ্ছে! এই অমানবিক নির্যাতনের প্রতিবাদের আজ কত বিভর্ৎস ছবি, কত সংবাদ, আন্তর্জাতিক গণআদালত গঠন এবং তার কর্তৃক মিয়ানমারের নেতাদেরকে অভিযুক্ত ঘোষণা। এবং অং সান সু চি কে বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তি কর্তৃক শান্তি প্রতিষ্ঠার চিঠি ও প্রতিবাদলিপি দেয়া হয়েছে। কোনো কিছুতেই যেন মানুষখেকো ওই সব দানবের শুভবুদ্ধির উদয় হচ্ছে না। সংকট যতো ঘনীভুত হচ্ছে আমাদের উদ্বেগের মাত্রা ততই বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় হলো বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ত্রাণসামগ্রী। স্বাভাবিকভাবে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রে মানুষ ঘুম থেকে উঠে অফিস-আদালত অথবা নিজ নিজ কাজে যাবার পরিকল্পনা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে মিয়ানমার হতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী জীবন বাঁচাতে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালে একমুঠো ত্রাণের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। ত্রাণের পণ্য আসছে কিন্তু সেগুলো প্রক্রিয়া করে খাবার উপযোগী করে তোলা তাদের নিকট বড়ই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কারণ তাদের বাড়ি নেই, ঘর নেই, চুলা নেই, আগুন নেই, নেই কোনো জ্বালানি। ত্রাণসামগ্রীর সাথে সুপেয় পানি না থাকায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অনেকটা দিশেহারা। তারা পান করছে নোংরা পানি। যাই হোক লাখো মানুষের জীবন বাঁচাতে তাৎক্ষণিক ত্রাণ বিতরণের থেকে উত্তম পন্থা বোধ হয় আর নেই। তারপরও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়া নিয়ে যেহেতু সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। যেহেতু আমরা কেহই জানি না যে কবে নাগাদ এ সমস্যার সমাধান হবে। তাই বিশ্বের বিবেকবান মানুষের কাছে আমাদের কতিপয় আবেদন হলো, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয় নেয়া এলাকার সমতল ভূমিতে স্বল্প সময়ে উৎপাদনক্ষম এমন কিছু মৌসুমি ফসল চাষাবাদের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কৃষিবিদদের সহয়তা কামনা করছি। এটি কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নয়। তবে মানবতার কল্যাণে একটি ‘সেফটি জোন’ প্রতিষ্ঠা হোক সেই প্রচেষ্টা। তাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আশ্রিত অঞ্চলে অস্থায়ীভাবে কিছু হাট-বাজার স্থাপন করা যায় কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার। প্রশ্ন হলো পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গারা তো হাতে করে পয়সা কড়ি আনতে পারে নি! হাট-বাজারে তারা বিনিময় করবে কীভাবে? এখানে বিনিময় প্রথার বাস্তবসম্মত ধারণা কতোটা প্রয়োজন? অবশ্য সেক্ষেত্রে পালিয়ে আসার সময় যে পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ সাথে করে এনেছে তারই বিনিময় হতে পারে এই বাজারে। তাছাড়া বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ থেকে প্রাপ্ত অর্থ আর জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংগঠনের নিকট থেকে প্রাপ্ত অর্থকড়ি বিনিময়ের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। জাতিসংঘের সহায়তায় আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করে এই এলাকার মানুষের মাঝে একটি ফাংঙ্কশনাল ব্যবস্থা চালু করে সমস্যা সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া দরকার। সুপেয় পানি পান করবার জন্য নলকূপ স্থাপন করতে হবে। এই সবকিছুর জন্য অবশ্যই একটি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ থাকবে। আমার এই প্রস্তাবসমূহের দ্বারা আমি কোনো নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের সুপারিশ করছি না। বরং একটি রাষ্ট্র যেমন তার নাগরিকের মানবিক সকল চাহিদা পূরণে কাজ করে তেমনিভাবে বিশ্বজনগোষ্ঠীর মানবিকতার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত এই ‘সেফটি জোনে’ অস্থায়ীভাবে বসবাসরত ৪,২২,০০০(২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ পর্যন্ত, দি ডেইলি স্টার) রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবতা রক্ষা করাই হবে সম্মিলিত সকলের প্রধান কাজ।
অন্যান্য পর্যবেক্ষণসমূহ হলো, (ক) পৃথিবীতে নিরস্ত্র মানুষ সšা¿াসী হবে আর সশস্ত্র বাহিনী নিরহ নিরস্ত্র মানুষের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে তাদের ত্রাণকর্তা হয়ে উঠেছেন এমন ইতিহাস পৃথিবীতে আমাদের পড়া ও জানা নেই (খ) অং সান সূ চি নিজের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ স্টেট কাউন্সিলর (বানানো ও ইতিহাসে নজির নেই) লাভের আশায় যদি সংবিধান সংশোধন করতে পারেন তবে একটি জাতির মুক্তির জন্য কেন তিনি প্রয়োজনে সাংবিধানিক এমন একটি পদক্ষেপ নিতে পারবেন না?, (গ) মিয়ানমারে কী কোনো গণমাধ্যম আছে? মানবতার মুক্তির পথে তাদের ভূমিকা এখন কী?, যদি সেখানকার গণমাধ্যমের ভূমিকা মানবতার বিপক্ষে হয় তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কর্তৃক তাদেরকে বয়কট করা দরকার (ঘ) দরিদ্র ও চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কোন স্ট্যাটাসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্থান হচ্ছে? তারা কী আজ প্রয়োজনীয় ক্যালরির খাদ্যগ্রহণ করতে পারছে?, (ঙ) বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা মেটাতে অস্থায়ী বিনিময় ব্যবস্থা চালুকরণ, (চ) মানবতার অগ্রদূত শেখ হাসনিা এবং শান্তি ভূমি বাংলাদেশকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে মানুষ বর্বরতার পথ পরিহার করে শান্তির পথে এগিয়ে আসে, (ছ) রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ পৃথিবীর অন্যসব শরণার্থীদের জন্য একটি নতুন ফর্মূলার রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। (জ) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য জাতিসংঘের ‘শরণার্থী কল্যাণ কমিটি’ নামক একটি সেল গঠন করা প্রয়োজন। পরিশেষে, “পরমাণু-অন্ধ উন্মাদ-যুদ্ধবাজদের উত্তপ্ত মস্তকে/ আজ বহ্মপুত্রের পবিত্র জল ছিটিয়ে দিয়ে আসুন, আমরা উচ্চারণ করি; আস্সালামু/আস্সালামু/আস্সালামু//ওম শান্তি/ ওম শান্তি/ ওম শান্তি//”।
লেখক: শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ ও সহকারী প্রক্টর, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী

shyamoluits@gmail.com