সেবার নামে প্রতারণা

আপডেট: ডিসেম্বর ১৫, ২০১৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


সেবা পরম ধর্ম। সেবার রকম ভেদ থাকলেও আজকের লেখার মূল বিষয় চিকিৎসাসেবা। মানুষ অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসা বাড়িতে নিলেও অন্ততঃ অসুস্থতার কারণ জানবার জন্য ও সুচিকিৎসা পাবার জন্য শরণাপন্ন হয় চিকিৎসকের। প্রথমতঃ চিকিৎসককে দেখানো আগে ফোনে কিংবা সশরীরে গিয়ে রোগির নামটি তালিকাভুক্ত করে একটা নির্দিষ্ট সময় নেওয়া হয়। যথা সময়ে উপস্থিত হয়ে দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসক ধঃঃবহফধহঃ- কে তুষ্ট করে সিরিয়াল না মেনেই কেউ কেউ দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা কিংবা তালিকার ১ম দিকে থাকা রোগির চেয়ে আগেই চিকিৎসককে দেখানোর সুযোগ পেয়ে যান। চিকিৎসকদের দর্শনা ৫০০ টাকার কম নেই, বেশি ছাড়া। ডাক্তার ভেদে কিছু ব্যতিক্রমি ক্ষেত্র ছাড়া রোগিকে মনে করেন অত্যন্ত নীচু মানের কোন মানুষ। কোন সম্মান কিংবা সহানুভূতি প্রশ্নই উঠে না। রোগির সব কথা না শুনে প্রথমেই ধরিয়ে দেন নানা বিষয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষার এক লম্বা ফর্দ এবং এ কথাও বলে দেওয়া হয় পরীক্ষা যেন সংশ্লিষ্ট প্যাথলজি যেখানে ডাক্তার বসেন সেখান থেকেই করানো হয়। তার সমস্যার কথা ডাক্তারকে জানাতে না পেরে রোগি প্রথমেই হতাশা হয়। তার উপর নানা পরীক্ষার ব্যয়ভার বহন করা অনেকেরই সাধ্যের বাইরে থাকে। সুতরাং, অনেকেই বাধ্য হয় কোন পরীক্ষা ছাড়াই চলে যেতে। আর যারা পরীক্ষা করান তারা অনেকেই জানে না এ পরীক্ষার বিলের একটা অংক চলে যায় চিকিৎসকের হাতে। রীতিমত মাইকে ঘোষণা দিয়ে ওষুধগুলোও তাদের আয়ত্বাধীন দোকান থেকে কিনতে বলা হয়। তাই নয় অতিসম্প্রতি কোন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যে যে পরীক্ষাগুলো হয়েছে ২/১ দিনের ব্যবধানে অন্য চিকিৎসক আবার সেগুলোই পরীক্ষা করাতে বলেন। যদি ভাল চিকিৎসক হন তাহলে তিনি রোগির সমস্যা বুঝে রোগিকে অন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসকেরা খুব সহজে রোগিকে অন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে না বলে নানাভাবে তার উপর পরীক্ষা-নীরিক্ষা করতে থাকেন। এতে অনেক ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হয়। যারা দূরদর্শি তারা এদের ফাঁদ থেকে মুক্ত হয়ে অন্যত্র চিকিৎসা করায়।
সবচেয়ে মজার বিষয় একই প্যাথলজিতে একই বিষয়ের একই সময়ে পরীক্ষা করে রিপোর্ট ভিন্ন ভিন্ন হয়। রিপোর্ট ভিন্ন হতে পারে হয়তো, কিন্তু চিকিৎসকরা নিজেরাই সে রিপোর্ট দেখে বলে এটা কোন রিপোর্টই হয় না। যদি রিপোর্ট নাই হয় তাহলে ডাক্তাররা তেমন জায়গায় কেন পরীক্ষা করাতে বলেন? অনেকের পক্ষেই বিশাল এই ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হয় না। বহু অসুস্থ মানুষ থাকেন যারা দিন আনে দিন খায়। তাদের পক্ষে এটা বহন করা দুঃসাধ্য।
কোন একজন চিকিৎসকের সাথে অযথা অসুস্থ রোগিকে আটকে রাখা প্রসঙ্গে কথা বলায়-তিনি পেশাগত দায়িত্ব থেকে বলেন- চিকিৎসক যতক্ষণ না মনে করেন রোগির উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন আছে ততক্ষণ পর্যন্ত তো আটকে রাখবেই। রোগি যে সুস্থ হচ্ছেন না বা তার কোন উন্নতি হচ্ছে না জেনেও কেন তিনি তাকে ছেড়ে দেবেন না বা ভালো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলবেন না? উত্তরে তিনি জানান, আপনি যদি মারা যান তাহলে চিকিৎসক দায়বদ্ধ থাকবেন। কী হাস্যকর উত্তর। আপনি মারা গেলে আপনার পরিবার, সমাজ তথা দেশের যে পরিমাণ ক্ষতি হবে সেটা পূরণ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। একজন চিকিৎসক তার অধীনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন রোগি মারা গেলে তার দায় গ্রহণ করে বড়জোর আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে পারেন। এর বেশি কিছুই নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসক কীভাবে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন? সেবা প্রদান করা যাদের মূল কর্তব্য তাদের মুখে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য বেমানান।
শুধুমাত্র তাই নয় এসব প্যাথলজিতে দৌরাত্ম রয়েছে এক শ্রেণির দালালের। এদের খপ্পরে পড়ে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। বুঝি না চিকিৎসকদের কত টাকার প্রয়োজন হয়। তাদের রোগি দেখার কোন সীমা নেই। যেখানে একজন চিকিৎসার ১৫/২০ জন রোগি দেখার কথা সেখানে তারা ১শরও বেশি রোগি দেখে থাকেন। সেখানে কোন গরীব রোগিকে বিনা পয়সায় সেবা দেন না। এমনকি তারা রোগির কথাও ঠিকমতো শোনেন না। অথচ একজন রোগির সাথে একজন চিকিৎসক একটু ভালো ব্যবহার করলে তাদের সাহস দিলে তারা মানসিকভাবে অনেক ভালো বোধ করে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগি অনেকটা সুস্থ বোধ করে। বিপরীতক্রমে তাঁদের এ দুর্ব্যবহারও রোগিকে সমানভাবে প্রভাবিত করে ফলে তারা আরও অসুস্থ বোধ করে। ডাক্তারদের পারিতোষিক এবং রোগি দেখার সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিৎ। তা না হলে তাদের এ স্বেচ্ছাচার বন্ধ করা যাবে না।
দালালদের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। প্যাথলজিগুলোকে ভালো কেমিস্ট দিয়ে পরীক্ষার কাজগুলো করাতে হবে।
রোগিদের সম্মান করতে হবে এবং তাদের সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে। তা না হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। চিকিৎসকরা সেবার নামে অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত। তারা ছুটির দিনগুলোতে বাইরে যান চিকিৎসা সেবা দিতে। এর সুবিধা অসুবিধা দু’টোই আছে।
এখানেই চিকিৎসকদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়। তারা কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে প্রাইভেট প্রাকটিস করে কর্মস্থলে চিকিৎসক সংকট হবে জেনেও। সব কিছুরই মূল উদ্দেশ্য টাকার পাহাড় গড়া- সেবা প্রদান নয়। এ বিষয়ে সরকারের তদারকি ও কঠোর আইন প্রণয়ন আশু কাম্য।