সেবার মাঝে পরার্থপরতা কই!

আপডেট: নভেম্বর ৪, ২০১৯, ১:১৯ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


সেবা-শুশ্রƒষা প্রায় সমার্থক শব্দ দুটির মধ্যে সেবা শব্দটির মাহাত্ম্য খর্ব হতে চলেছে। সেবা বলতে সাধারণভাবে বুঝা যায়, নিঃস্বার্থ উপকারের জন্য এগিয়ে আসা। তবে এই সেবা দুস্থের লালনের পরিবর্তে যদি হাতিয়ে নেয়া বা বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনের আগ্রহ অধিক হয়, তাহলে একে সেবা বলা যায় কি না, তা নতুন করে মানুষকে ভাবিত করে। অনুভূত হয় সেবা শব্দটির ওপর ব্যভিচার করার মতো।
আজকাল প্রায় সব শ্রেণির চাকরিকে সেবা বলার রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হচ্ছে সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। ফলে সেবা অভিধাটি মুখ লুকোবার জায়গা পাচ্ছে না। সরকারি বেসরকারি সব ধরনের কাজের বিনিময়ে নির্ধারিত বেতন থাকে। যাকে ভদ্রভাবে পারিতোষিক বলে চালিয়ে দিতে চাওয়া হয় তা সে যেভাবেই বলা হোক না কেন এটা কাজের বিনিময়। একে কোনোভাবে সেবা বলা যায় কী!
এখন পত্র-পত্রিকায় লেখা হয়: ঘুষ ছাড়া সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে কোনো কাজ হয় না। এ অভিজ্ঞতা অমূলক নয়। আবার তিক্ত রসিকতায় বলা হয় বিশেষ বিশেষ ভবনের চেয়ার টেবিলও যেন ঘুষ চায়। আরদালি-পিওন ঘুষ না পেলে দর্শনার্থীকে উপেক্ষা করে। এ সংস্কৃতি পুরাতন। তবে ধরন বদলেছে। একদা উৎকোচ গ্রহণ ও প্রদান রুচিবান ব্যক্তির জন্য পরম লজ্জার ছিলো। মেয়ের অভিলাষ পূরণের জন্য গৌরিশংকর বাবু জামাই অপুর হাতে একশো টাকার একখানা নোট দেবার পরিবেশকে রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষেরও আগে বলেছেন: “যেন ঘুষ দিতেছেন”। হায়, সেটা এখন গর্বের হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাহেবগণ ভাবেন এটা তাদের অলিখিত অধিকার।
এই কিছুদিন আগেও কন্যাদায়গ্রস্ত অভিভাবকদের অনেকে হবু জামাই এর বেতন প্রাপ্তির প্রসঙ্গ না তুলে বাম হাতের আয়ের পরিমাণ জানতে আগ্রহী বেশি ছিলেন। এখনো সে ধারা বিলুপ্ত হয়নি। ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের এই যে অশুভ প্রবণতা সে সংস্কৃতি থেকে পরিত্রাণের জন্য বোধকরি মার্কস সম্পদ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রেখে ব্যক্তির সম্পদের সীমারেখা টানার পক্ষে ছিলেন। আমরা সে সব মহাদর্শনের কথা বলবো না। কারণ, সে বিষয়ে আমাদের ধারণা সীমাবদ্ধ।
দৃশ্যমান সামন্ততন্ত্র পর্বের পর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ চালনার যে বিধান শুরু হয়, সেখানে জনগণ রাজা-বাদশা বানায়। রবীন্দ্রনাথ কৌতুক হাস্যে বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে।’ (পূজা-১০) অবশ্য মানবসভ্যতার বিকাশের ধারায় এই পদ্ধতি খুব প্রবীণ নয়। আমরা সেই ধারা অতিক্রম করছি। এই ধারায় দেশ চালনাকারীদের বলা হয় জনসেবক। এঁরা জনসেবার কথা বলে নির্বাচনের সময় সমর্থন ভিক্ষা করেন। কখনো ধর্মের পোষাকে, কখনো মতবাদের পতাকা উড়িয়ে, কখনো আবার পেশিশক্তির ব্যবহারে ক্ষমতায় বসেন। তারপর সেবা আর ধর্ম থাকে না। এযেন নিরঙ্কুশ ভোগের অলিখিত অধিকার, অন্যতর সামন্ততন্ত্র।
সম্প্রতি এসব বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি চলছে। জনসেবায় কারা আসবেন। নিঃস্বার্থ সেবা বায়বীয় কাল্পনিক ধারণা। সেবার কাজে নেমে ব্যক্তি আত্মপ্রসাদ লাভ করেন বলে সেখানে স্থিত হন। এখানেও অদৃশ্য থাকে স্বার্থ। মানুষ এ স্বার্থকে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করে। তাই একদা জনসেবা বা রাজনীতির আসরে অবতীর্ণ ব্যক্তিবর্গ বৈষয়িক প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা বড়ো করে দেখতেন না। তাঁদের শ্রদ্ধা সম্মান দেখাতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতেন। এই মহৎ কর্মসাধনা কোথায়! এখন যাঁরা আসছেন, তাঁদের কাজে কারো উদ্দেশ্য বগলদাবা করা! এঁরা ‘মুখে শেখ ফরিদ বগলমে ইট’ পর্যায়ের। এখন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সবাই রাজদর্শনে আসেন না। নব্য রাজাদের সম্মান দেখানোর জন্য প্রখর রোদে শিশুদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমনকি শিশু কিশোরদের দিয়ে ছোট্ট খালের ওপর মানব সাঁকো বানানোও হয় কোথাও কোথাও।
‘যার কাজ তারে সাজে’ বলে একটা প্রবচন আছে। এখন যার যে কাজ নয়, তাতেই সে প্রলুব্ধ। তারা সেবার নামাবলি পরে আখের গুছানোর ধান্দায় লিপ্ত। এরা কেউ কেউ ধরা পড়ছে। পত্র-পত্রিকায় আসছে, কুকীর্তির সবঘাট সেরে অবৈধ উপার্জিত অর্থের ভেট দিয়ে ক্ষমতার বাহন হিসেবে আসছে। একারণে অন্যায়কারী এবং তার সহযোগী সমানদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া উচিত।
আমরা আগেই বলেছি, মেকি সেবাদানকারীরা এখন সদর্পে ঘুরে বেড়ায়। ভলটেয়ার বলেছিলেন, জনগণ পরিচ্ছন্ন হলে কৃত্রিম সেবকরা সামনের কাতারে আসতে পারতো না। আসলে আমরা সত্যিকার পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠতে পারিনি। অথচ নিজেদের সেবক ভাবছি।
চাকরি করা অবস্থায় অনেকে গাছেরটা খেয়ে তলারটা কুড়িয়ে স্বচ্ছল জীবন কাটিয়ে দেন। তাতে কারো কারো মন ভরে না। কয়েক পুরুষ ধরে স্বচ্ছন্দে থাকার ব্যবস্থা করতে উদবাহু। যোগ্য ব্যক্তির যথাস্থানে নিয়োগ করা হলে সেই সাথে চমক সৃষ্টি করে ক্ষমতাবানদের অন্ধকার পথে আগ্রাসী হবার পথ রুদ্ধ করতে পারেলে অনাচার কমে আসবে এবং সেবার নামে সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে সহসা সাহস করবে না কেউ।
সত্যিকারের সেবাদানকারী গ্রাসাচ্ছাদনের অভাব পূরণ করেন জনগণ। তাতে মোক্ষ লাভের বাসনা সন্তর্পণে থাকে হয়তো অনেক সময় তথাকথিত সেবকদের বিত্তবৈভবের পরিধি দেখে বিস্ময়ের অবধি থাকে না। এখানেও কোনো মন্তব্য করা সহজ নয়। ফলে সেইসব সেবক যে অজান্তে জোঁকের মতো মূঢ় মানুষের রক্ত শোষণ করছে, তা ভেবে দেখার অবকাশ আমরা পাই না বলে সামাজিক অনাসৃষ্টিকে আসমানী বালা বলে সান্ত¦না পেয়ে থাকি। সামাজিক এতসব ব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে হলে সত্যিকার সেবার অর্থ বোঝা দরকার। তখন ছদ্মবেশী সেবাদানকারী কোনো ব্যক্তি অন্যায় কাজে প্রলুব্ধ হবে না।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ