সেরা ভাবার লড়াই আর চাটুকারিতার দৌরাত্ম্যের অবসান হোক

আপডেট: নভেম্বর ৮, ২০২১, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


১৭৫৭ সালের প্রাহসনিক যুদ্ধ জয় শেষে ১৭৬৫ সালে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবার পর স্বল্প সময়ের মধ্যে বৃটিশ শাসন প্রবর্তিত হতে থাকে ভারত জুড়ে। তখন রাজধানী নির্ধারিত হয় কলকাতা। প্রশাসনিক আইন-কানুন প্রতিষ্ঠার জন্য অনেকের সাথে লর্ভ মেকলে ইয়োরোপ থেকে কলকাতা আসেন। তিনি বাংলার মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে বাঙালি চরিত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেন। উদ্দেশ্য, নিজেদের সেরা ভাবা এবং বাঙালি চরিত্রে নীচতার শিরোপা পরানো। মেকলে সাহেব বলতেন, বাঙালি ছিদ্রান্বেষী, পরশ্রীকাতর, মোসাহেব ইত্যাদি। তার পর্যবেক্ষণ কেবল বাঙালির নয়, মানব চরিত্রেরই বটে। এর তারতম্য বিচারে কেউ সেরা, কেউ সেরা নয়। তবে আমাদের মোসাহেবিপনা যে চরমে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে না। আর এসব মোসাহেবি ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য। তাতে দেশ ও জাতি রসাতলে গেলেও কারো দ্বিধা থাকে না। এ তথ্যের সাথে একটি সত্য নিহিত চাটুকারদের কাঁধে পা রেখে বৃটিশরা ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানিরা অনেকটা নির্বিঘেœ সস্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। সুতরাং মোসাহেবরা বোধকরি তাদের লেখায় প্রশংসার্হ হবার কথা ছিলো। ইতিহাস নির্মম, তা হতে দেয়না। একটা সত্য সবার জানা, মোসাহেব যেমন অন্তঃসারশূন্য ব্যক্তিস্বার্থ অন্বেষী, তেমনি মোসাহেবের ইচ্ছা পূরণকারী নিজেকে ক্ষমতায় দেখতে পেলেই ডগমগ। দেশ ও জাতির কথা এদের মাথায় আসেনা।
আমাদের ছেলেবেলায় শিক্ষকদের তেমন জুগুপ্সা-মত্ত হতে দেখিনি। যেটুকু সমালোচনা না করলে দেশ রসাতলে যাবেÑতা তাঁরা করতেন। অবশ্যই ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়। দেশ স্বাধীন হবার আগে নোয়াখালি সরকারি কলেজে আমি নিযুক্ত হই। তখনকার পূর্বপাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনে পরীক্ষা দিতে যাবার আগে আমার ঢাকা দেখাই হয়নি। নোয়াখালি দূরঅস্ত। সেখানে গিয়ে কিছু শিক্ষকের মাঝে সেরার বড়াই নিয়ে বচসা শুনতাম। দেশভাগের প্রায় দেড়যুগ পরে তখনকার সরকরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিমুক্ত রাখার অভিপ্রায়ে পূর্বপাকিস্তানের নামকরা কলেজগুলো সরকারের আওতায় নিয়ে আসে। যেসব কলেজে অনেক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছিলেন। তবে পরে ১৯৬৮ সালে মোনায়েম খান প্রত্যেকটি জেলা সদরের কলেজকে সরকারি করে ফেলেন। তখন থেকে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কারণ পাবলিক-সার্ভিস কমিশন কর্তৃক বাছাই করা শিক্ষক, ডি.পি-আই এর আপৎকালীন বা নানা কিসিমের উমেদারদের নিয়োগ করা শিক্ষক এবং আত্তীকৃত শিক্ষক। সংক্ষেপে এদের পরিচয় ছিলো যথাক্রমে হক-অ্যাডহক-নাহক। এ বিভাজন ছিলো কৌতুকের। শিক্ষকবৃন্দ নিজেদের যা-ই বিচার করুক না কেন, কষ্টিপাথর হলো যথার্থ ছাত্রছাত্রীরা। শিক্ষক অ-শিক্ষক তারাই যাচাই করতে পারে।
প্রশাসনে সিএসএস, ইপিসিএসদের মধ্যে সেরার অভিজাত্যবোধ ছিলো। তার সাথে যুক্ত হয় সিও এবং নানা ধরনের বিএসএস-এর সংযুক্তি। শিক্ষকদের মধ্যে সেরা সাজার সিনাজোরি আর মোসাহেবির জারিজুরি কম নেই, প্রশাসনেও ওপরে ওঠার জন্য যত নীচে নামতে হয় তার কসুর করেন না অনেকেই।
আমরা শিক্ষায় ফিরে আসি। মানুষ চিরকালই ওপরে ওঠার জন্য বিবেক বিসর্জন দিয়েছে। সুধিজন মনে করেন, শিক্ষক কেন সেপথে হাঁটবেন! শিক্ষক তো মানুষ ও মনুষ্যত্বের প্রতিনিধি। তাইতো ¯্রষ্টা জনক-জননীর পর শিক্ষকের স্থান নির্ধারণ করেছেন। কতিপয় অতিলোভী শিক্ষকের কর্মকা-ে তা কলুষিত হচ্ছে। এমনটি বোধকরি চলতে দেয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, লোভ অনেক অনিষ্টের মূল। আমি অশীতিবর্ষ অতিক্রম করেছি চলার পথে। হুমায়ূন কবিরের ভাষায় ‘অশীতিবর্ষ বয়স আমার দুর্বল অতিদীন, কুব্জ-পঙ্গু-গণিতদন্ত-বধির দৃষ্টিহীন।’ চলার পথে শিক্ষক-প্রিন্সিপাল-ভিসি কম দেখিনি। আমাদের বিশ্বাস, রাষ্ট্র যে খোলসে পরিচালিতে হোক না কেন শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়মানুগ ও নিঃস্বার্থ থাকতে পারলে, জাতির জ্ঞান তৃষ্ণা মরুপথে হারায় না।
নিকট অতীতে দেখা গেছে, কিছু ভিসি পদ-প্রাপ্ত ব্যক্তি ডামাডোলের কালে চরদখলের মতো রাতের অন্ধকারে ভিসির পবিত্র আসন কলংকিত করেছেন। কেউ কেউ স্বাধীনতার মূল ধারায় অবস্থান করে ক্ষমতার হাতছানিতে প্রলুব্ধ হয়ে উল্টোপথে যাত্রা করেছেন। অনেককে দেখা গেছে, মুখে বঙ্গবন্ধু জপমালা জপে অমোচনীয় অপরাধ করে গেছেন। এমনকি ঘাতকরা সত্য প্রতিষ্ঠার নামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে শিক্ষার্থীর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে শিক্ষাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
আমার শিক্ষার্থী জীবনের একজন ভিসি আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি এমন নিয়মানুগ এবং সজ্জন ছিলেন, ছাত্ররা অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে আগে সালাম দিতে পারেনি। প্রসংগত একটা কথা বলে রাখি, স্বর্ণপ্রসূ রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথমদিকে অনেক মেধাবী শিক্ষক যোগান দিয়েছে। এমনকি প্রথম দিককার কয়েকজন ভিসি রাজশাহী কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ড. ই.এইচ. জুবেরি, ড. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, প্রফেসর মুহম্মদ শামসুল হক প্রমুখ। সবচেয়ে সজ্জন ভিসি ছিলেন মুহম্মদ শামসুল হক, অবশ্য আমার দৃষ্টিতে, যাঁর কথা আগেই বলেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারায় উনসত্তুরের আগুনঝরা দিনের প্রথম শহিদ শিক্ষক শামসুজ্জোহার দাফনের পর সমবেত শোকসভায় ভিসি শামসুল হক সাহেব যে মর্মছেড়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন তাতে কারো চোখ আর্দ্র না হয়ে পারেনি।
পত্রিকায় প্রকাশ শিক্ষক-কর্মচারি নিয়োগ ও অন্যান্য বিষয়ে নানা অনিয়মের পর পুরাতন ভিসি বিদায় হলে নতুন ভিসি নিয়োজিত হলেন ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার, সেপ্টেম্বর ২০২১। লক্ষ্যনীয় ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার কেবল রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন, তাই নয়, পুরুষাণুক্রমে রাজশাহীর মাটির সন্তান। এ নিয়োগ রাজশাহীবাসীকে গর্বিত করেছে নিশ্চয়ই। রাজশাহীবাসী দেখতে চায়, রাজশাহী বিশ^াবিদ্যালয়ের ফেলে আসা হিরন্ময় ঐতিহ্য। সে ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে অবশ্যই তাঁকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কারণ তিনি ভিসি সব মত ও পথের মানুষের। তবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকবে সর্বাগ্রে। বঙ্গবন্ধু বিশ্বের সকল সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ন্যায়ানুগের প্রতীক। সে সত্য স্মরণে রেখে, সেরা সাজার প্রতিযোগিতা পরিহার এবং মোসাহেবদের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসলে ফিরে আসবে হারানো দিন। মানুষ দেখতে চায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ জ্ঞানপীঠ। নিকট অতীতকালে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, আব্বাসীয় খলিফা হারুন-মামুন মত-পথের দিকটি বড়ো করে না দেখে ধর্মনির্বিশেষে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের বিশ^বিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাইতো একদা বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ^সেরা সাধনাপীঠে পরিণত হয়েছিলো।
স্বাধীনতার জন্য প্রথম রক্ত দিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষাক্ষেত্রে অধোগামী বাংলাদেশকে সুবর্ণশিখরে উন্নীত করার নেতৃত্ব দিক এই বিশ্ববিদ্যালয় সেটাই আমাদের কামনা।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ