সোঠা পীর ও কাঠ গোলাপের গাছ

আপডেট: নভেম্বর ৩, ২০২২, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


পীর মুরিদ আর লালসালুর দেশ বাংলাদেশ। পীর বিরোধী হুজুরেরা বলেন, সেখানে কুসংস্কার আর অন্ধ বিশ্বাসের সংস্কৃতি ভরপুর। সাধারণ মানুষের এমন ধারণা থাকতেই পারে প্রকৃতশিক্ষা নেই বলে। কিন্তু বড় বড় রাজনৈতিক নেতা ও আমলারা সেদিক থেকে বেশি অগ্রণী। নির্বাচন এলে আর চাকরিতে সমস্যা বা উন্নতির প্রয়োজনে পীর বাবার আশীর্বাদ নিতে যান। পীর যদি মৃত হন তবে তার দরগায় সেজদা করেন, মানত করেন। সেক্ষেত্রে গরু-ছাগলসহ দান-খয়রাতের কমতি রাখেন না- শুধুমাত্র তার প্রার্থিত বস্তু পাওয়ার জন্য। তাদের বিশ্বাস পীর মৃত হোক বা জীবিত হোক তিনি আশা পূরণ করেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ যান সন্তান লাভ, রোগ মুক্তি, স্বামী স্ত্রীর বিরোধ নিস্পত্তি, প্রেমিক প্রেমিকার সম্পর্ক স্থাপন, মামলায় জেতাসহ বিভিন্ন মনোবাঞ্ছা পূরণের আশায়। পীরের মাজারের আবার রকমফের আছে কোনো কোনো পীরের মাজার স্থায়ী চকচকে ভবনের নিচে, তাদের পসার খুব ভাল, দেশখ্যাত তারা। অন্যদিকে কোনো কোনো পীরের মাজার বন-জংগলে গাছের তলায়, পলিথিনের ছাউনির তলায়, তাদের পসার নেই। কথায় আছে না- ‘তেলে মাথায় তেল ঢালা’। পীরের শরণাপন্ন যারা হন তারা সবাই বিশ্বাস করেন পীরের আধ্যাত্মিক শক্তি আছে আর সেই শক্তিবলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। এমন অন্ধ বিশ্বাস থেকে তাদের টলানো যাবেনা। যত যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন করা হোকনা কেন। অনেক চিন্তা ভাবনা করে শেষে বলবেন, আল্লাহ অবশ্যই তাদের নেয়ামত দিয়ে রেখেছেন বলেই যুগ যুগ ধরে তারা আরাধ্য। পীরভক্ত লাখ লাখ মানুষ আছে আমাদের দেশে। কিন্তু এই ভক্তি নামক শব্দটি এবং এর শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা জানা দরকার। কোনো আদর্শবান মানুষের কোমল ভদ্র আচার আচরণ, সুনিয়ন্ত্রিত জীবন পদ্ধতি যে কোনো মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। আর তখনই তার প্রতি ভক্তি সন্মান জেগে উঠে। কিন্তু ওই আদর্শবান মানুষটি কখনোই বলেন না তাকে ভক্তি শ্রদ্ধা সম্মান করতে হবে, তার জন্মদিন পালন করতে হবে, ওরশ করতে হবে। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা তাদের ভক্তি শ্রদ্ধা সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারটিকে এমন জায়গায় নিয়ে যায় যে তা সীমা লঙ্ঘন করে। শুরু হয় ওরশ পালন, মানত করা, উপঢৌকন দেওয়া, কবরকে লালসালু দিয়ে ঢাকা, আর সেই আদর্শবান মানুষটির স্বাভাবিক জীবনের বর্ণনা না করে কল্পিত আধ্যাত্মিকতার কাহিনী বর্ণনা করা সহ নানা প্রক্রিয়া। যেন দুর্বল চিত্তের মানুষ ধর্মভীরু মানুষ বিমোহিত হয় বিভ্রান্ত হয় এবং সেটাকে পুঁজি করে ব্যবসা করা যায়। যা বহু বছর ধরে চলে আসছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষের ঢল নামে পীরের দরগায়। এ সংস্কৃতি যে শুধু মুসলমানদের মধ্যে আছে তা নয়। হিন্দুদের মধ্যেও প্রচুর পীরভক্তি আছে। যারা নিয়মিত পীরের দরগায় যায়। দরগায় মাথা ঠেকায়, রাস্তা দিয়ে গেলে হাত জোড় করে প্রণাম করে, ড্রাইভারেরা দরগার কাছে এলে গাড়ির গতি কমায়, অর্থ দেয়। যেন তাদের যাত্রা শুভ হয়। সব পীরের দরগায় মুরিদ থাকে। তবে দরগার আয়ের উপর নির্ভর করে মুরিদের সংখ্যা। এদের একটা কমিটি থাকে তারাই সেই আয় থেকে খরচ করে। তাতে দরগার উন্নতি সহ নিজেদের উন্নতি করে। অথচ ইসলাম ধর্মে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, তোমার কিছু চাওয়ার থাকলে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে চাও। অন্য কারো কাছে নিজেকে অবনত করোনা। ইসলামের এই ধারণা দুর্বল মানুষদের পীর ভক্তি থেকে বিরত করতে পারেনি আজও।
আজ যে পীরের কথা বলবো তার বিশেষ কোনো ঘেরা মাজার নেই বা খানকাশরীফ নেই। পার্বতিপুর আড্ডা, সাপাহার সড়কের বাসুনডাঙ্গা ফুলতলায় সেই পীরের মাজার। পথে আমার স্মৃতি বিজড়িত গাঙ্গুরিয়া হাইস্কুল থেকে সাপাহারের দিকে প্রায় ৩ কিমি গেলে সেই ফুলতলায় দেখলাম একটি খেজুর গাছে ও একটি প্রায় হারিয়ে যাওয়া কাঠগোলাপের গাছের ডালে ঝোলানো আছে বেশকিছু লালসালু এবং পাশেই শতশত মানত কাঠি সুতায় আটকানো।
৫০ বছর আগেও এ জায়গা ছিল নির্জন। ছিলনা কোনো পাকা রাস্তা। বর্ষায় কোনো যানবাহন চলতোনা- একমাত্র গরুরগাড়ি ছাড়া। এমন স্থানে লালসালু আর মানতকাঠি দেখে অনুসন্ধিৎসু মন চাইলো দুএকটা ছবি তুলি। বেশ কয়েকটা ছবি তুললাম বটে। কিন্তু বরেন্দ্র এলাকায় কাঠগোলাপের গাছ আমার কাছে অসম্ভব বলেই মনে হলো। গাছের নিচে পড়ে থাকা কিছু ফুলকে একত্রিত করে ছবি তুললাম। ইতোমধ্যে দুজন কৃষি মজুর সেখানে এলো এই ভ্যাপসা গরমে গাছের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নিতে। ওদের কাছে জানতে চাইলাম এই লালসালু ও মানতকাঠির বিবরণ। তাদের বাড়ি বাসুনডাঙ্গা গ্রামেই। ওরা বললো, তাদের জন্মের আগে থেকেই পীরবাবা এখানেই থাকতেন। তার মৃত্যুর সময়টাও তাদের জানা নেই। তবে পীরের নামে ৫ বিঘা জমি আছে। যার সিএস রেকর্ড পীরের নামে। বাসুনডাঙ্গা গ্রামের মসজিদ কমিটি ও পীর ভক্তরা ওই জমি চাষাবাদ করে এবং ফসল বিক্রি করে গ্রামের উন্নয়নের কাজে এবং বছরে একবার পীরের নামে ফিরনি বিতরণ করে। রাস্তা থেকে মাত্র ১০ গজ দূরে নতুন আমবাগানের মধ্যে বাঁশ ঝাড়ের নিচে রয়েছে পীরের কবরটি। বিশেষ কোনো যতœ নেই। কাঠগোলাপের গাছটির বয়স হয়তো ১৫/২০ বছর হবে। কিন্তু পাশেই পড়ে আছে চার টুকরো মৃত কাঠগোলাপ গাছের কঙ্কাল। সেই গাছটি পীর বাবা কোথায় থেকে এনে লাগিয়েছিলেন। সেখানে অন্য কোনো ফুলের গাছ না থাকলেও ওই কাঠগোলাপের গাছের জন্যই বাসুনডাঙ্গার মানুষ জায়গাটির নাম রেখেছিল ফুলতলা। সেই কঙ্কাল গাছের গুড়ি বা নতুন গাছের ডাল কেউ কেটে নিয়ে যেতে সাহস করেনা। কারণ কেউ কেটে নিতে চাইলে পীরের অভিশাপগ্রস্ত হয় বলে তাদের বিশ্বাস। পীরের নাম ‘সোঠা পীর’। পীর বাবার কোনো মোজেজা বা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পর্কে তারা কিছু বলতে পারলোনা। পুরুষাণুক্রমে এলাকার মানুষ তাকে পীর হিসেবে মেনে আসছে। তারা বিশ্বাস করে পীর বাবার কোনো হিকমত ছিল বলেই তো দূর দুরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে মানত করতে। যারা মানত করতে আসে তাদের বাসুনডাঙ্গা গ্রামের ওই কমিটির অনুমতি নিতে হয় ও তাদের সহযোগিতায় শিরনি ফিরনি রান্না করে খাইয়ে লালসালু ও মানতকাঠি ঝুলাতে হয়। সেখানে প্রায় প্রতিদিনই ২/৪ জন মানুষ আসে মানত করে তার মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে। কিন্তু সবার তা পূরণ হয় কিনা সেটা কারো জানা নেই।
লেখক : সাংবাদিক