সোনামসজিদ এলাকায় কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি বেদখল ।। উদ্ধার করতে পারে নি সংশ্লিষ্ট বিভাগ

আপডেট: মার্চ ১০, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর সোনামসজিদ এলাকায় ৫ নম্বর উত্তর হরিরামপুর মৌজায় কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি প্রভাবশালীদের ভোগদখলে রয়েছে। দীর্ঘদিন এ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ঠ বিভাগ উদ্ধার করতে পারেনি বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৭ সালের ভারতবর্ষ বিভক্তির পর সোনামসজিদ বালিয়াদিঘী এলকায় প্রায় ৯১ দশমিক ৬৭ একরের মধ্যে ৫২ দশমিক ৬৭ একর খাস সম্পত্তি ও সায়রাত খাস খতিয়ানের অধীনে হয়। ১৯৫০ সালে জমিদারি উচ্ছেদের পর সরকারের খাস খতিয়ান অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালের পর থেকেই কিছু উদ্বাস্তু ওই খাস জমির উপর কাঁচা ঘরবাড়ি তৈরী করে বসবাস শুরু করেন। উত্তরাধিকার সূত্রে ওই পরিবারগুলো বর্তমানে পাকা বাড়ি তৈরী করে। যা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর সম্পূর্ণ সম্পতিই তাদের দখলে চলে যায় সয়রাত মহল হওয়ার বন্দোবস্তু ছাড়াই। তবে হাজী কুতুবুদ্দিনসহ কয়েকটি পরিবার ১৯৭৩-৭৪ সালে রাজস্ব বিভাগকে কাগজপত্র ভুল বুঝিয়ে বন্দোবস্ত নেয় যা ১৯৬২ সালে এসএ রেকর্ডে ৫৩ নম্বর দাগে খাস ছিল এবং ১৯৭২ সালের আরএস রেকর্ডে পর্চায় ২১৭টি দাগে ওই সমস্ত পরিবারের দখলকৃত সম্পত্তিকে জবরদখল বলে উল্লেখ্য রয়েছে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে অদ্যাবধি এই খাস সম্পত্তি/সায়রাত মহল থেকে দখলমুক্ত করতে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি বলে জানা গেছে।
কিন্তু ২০০২ সালের ১৮ মার্চ ৬৭২ নম্বর স্মারকে জেলা প্রশাসন থেকে এসডিএম ৮০১/১২/৭৩-৭৪ বন্দোবস্ত কেশ বাতিল করে ৩০ দিনের মধ্যে ১৭ জন অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদের নোটিশ দেয়া হয়। এছাড়াও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব দফতর থেকে অবৈধ দখলদারদের তালিকা চেয়ে শাহাবাজপুর ইউনিয়ন তহশীল অফিসে জরুরিপত্র পাঠান। পত্র প্রাপ্তির পরে ১৩৮ দাগে প্রায় ৪শ পরিবারের তালিকা তৈরী হয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগ ১৩৮ জন অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলেও অজ্ঞাত কারণে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
সূত্র মতে জানা যায়, একটি প্রভাবশালী দল বালিয়াদিঘীর চারপাড়ের ৫২ দশমিক ৬৭ একর খাস সম্পত্তি নিজের নামে বন্দোবস্ত নেয়ার জন্য বড় ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। এছাড়াও সোনামসজিদ এলসি স্টেশনের কাস্টমস বিভাগের নিজ নামীয় রেকর্ডভুক্ত প্রায় ২৫ কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে। আদালত থেকে কাস্টমসের পক্ষে ডিগ্রি পেলেও অজ্ঞাত কারণে অবৈধ দখলমুক্ত হয় নি। অপরদিকে ১৯৯২ সালে সোনামসজিদ এলসি স্টেশন চালু হওয়ার পর থেকে এলাকার জমির মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭২ সালের জরিপের সময় কাস্টমস নামীও সম্পত্তি ভুলক্রমে সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানে চলে যায়। ১৯৭৩-৭৪ সালে কাস্টমসের নামীয় খাস খতিয়ানে চলে যাওয়া সম্পত্তির মধ্যে আবদুর রহমান ৪০ শতাংশ স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত করে নেন। ১৯৭২ সালের আগে ১ একর ৪৪ শতাংশ সম্পত্তি যার দাগ নম্বর ০৪ এবং খতিয়ান নম্বর ০২ (এসএ রেকর্ড মোতাবেক) কাস্টমস বিভাগের নামে ছিল। কাস্টমসের নিজস্ব সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও এক শ্রেণির জালিয়াতি চক্র শিবগঞ্জ রাজস্ব দফতরের সঙ্গে যোগসাজস করে সম্পত্তি বন্দোবস্ত নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট তুলে দখল নিয়েছে। ১৯৯৫ সালে স্থানীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বেহাত হয়ে যাওয়া সম্পত্তির ব্যাপারে প্রকৃত তথ্য পাওয়ার পর আদালতে মামলা দায়ের করে। প্রয়োজনীয় তদরিবের অভাবে মামলার রায় কাস্টমসের বিপক্ষে চলে যায়। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ উচ্চআদালতে এ রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিলও করেন নি বলে জানা গেছে। অন্যদিকে সম্পত্তি বন্দোবস্তকারীরা স্থানীয় হওয়ায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে কিছু সম্পত্তি একটি ক্লাবকে অলিখিতভাবে হস্তান্তর ও ৩ কাঠা সম্পত্তি একজন প্রভাবশালী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কাছে বিক্রি করে দেয়। আজ পর্যন্ত সরকারি এসব সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
কিন্তু রাজস্ব দফতর সূত্রে জানা গেছে, কাস্টমসের সম্পত্তি বন্দোবস্তকারী আবদুর রহমানের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দলিল ৬৭২ নম্বর স্মারকের ২০০২ সালের ১৮ মার্চ বাতিল করা হয়েছে, যার বন্দোবস্ত কেশ নম্বর এসডিএম ৮০১/১২/৭৩-৭৪ এবং সেই সঙ্গে কাস্টমসের ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩ হালদাগের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য নোটিশ দেয়া হয়েছে।
রাজস্ব দফতর সূত্রে আরো জানা যায়, আবদুর রহমান ১৯৭৩-৭৪ সালে রাস্তার পাশের খাদ (নয়নজুলি) বন্দোবস্ত করে, যা বন্দোবস্ত আইনের বহির্ভুত বলে রাজস্ব দফতর জানায়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন শিবগঞ্জ উপজেলা কর্মকতা দেওয়ান মোহাম্মদ আবদুস সামাদের নেতৃত্বে উত্তর হরিরামপুর মৌজার ১২ ও ১৩ নম্বর দাগের উপর অবৈধভাবে নির্মিত ছয়টি দ্বিতল ভবন, একটি গুদাম ঘর, দুইটি বাড়িসহ ৪০টি ছোট-বড় দোকান উচ্ছেদ করা হলেও খাস সম্পতির উপর অবৈধভাবে নির্মিত ১৫টি দ্বিতল ভবন থেকে যায়। পরবর্তীতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের চাপের মুখে ঐসব অবৈধ দখলদারকে খাস সম্পতি থেকে আদৌ উচ্ছেদ করতে পারে নি স্থানীয় প্রশাসন। সোনামসজিদকে স্থলবন্দর ঘোষণা করায় অনেক গুরুত্ব বেড়েছে এবং বর্তমানে স্থলবন্দরের এলাকা আরো সম্প্রসারণ করার জন্য ২০ একর জমি প্রয়োজন। ইতোমধ্যে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ আরো ২০ একর জমি নেয়ার জন্য স্থানীয় ভূমি অফিসকে চাহিদা দিলেও স্থানীয় ভূমি অফিস কোনো ব্যবস্থা করতে পারে নি। অথচ স্থলবন্দর সংলগ্ন উত্তর হরিরামপুর মৌজায় বহু সরকারি খাস জমি বেদখল রয়েছে।
এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার শাহাবাজপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার মবিদুল হক জানান, ২০১৫ সালে ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে ৪শ দখলদারকে উচ্ছেদের জন্য তালিকা প্রেরণ করা হয়েছিল।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ