সোনা মসজিদের মিলনমেলায়…

আপডেট: মার্চ ৫, ২০১৭, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

আহমেদ ফরিদ



সন্ধ্যা সাতটা। চারদিকে অন্ধকার। রাস্তায় সোডিয়ামের হালকা হলুদ-লাল আলো। জানালা ভেদ করে সেই আলো প্রবেশের অকৃত্রিম প্রচেষ্টা। বাসের ভেতরে মৃদু আলো আর অন্ধকারে এক নতুন আবেশ সৃষ্টি করেছে। তখন ধীরে ধীরে গাড়ি চলতে শুরু করেছে মাত্র। এমন সময় মৃদুমন্দ ছন্দে মমিনুর মমিন গাইতে শুরু করল, ‘আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না।’ নিরবতা ভেঙে যোগ দিল বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই। সবাই যেনো প্রাণ খুলে গাইছিলো।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চাঁপাই নবাবগঞ্জের সোনা মসজিদে অনুষ্ঠিত শিক্ষাসফর থেকে সন্ধ্যায় ফেরার পথে বাসের মধ্যকার চিত্র এটি। প্রতিবছর বিভাগটি বার্ষিক এই শিক্ষাসফরেই নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে থাকে। সেই সঙ্গে বিভাগের ¯œাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থীদের শেষ শিক্ষাসফরও সাধারণ এটিই হয়ে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফলে এই শিক্ষাসফর হয়ে উঠে নবীন, বিদায়ী ও শিক্ষকদের এক মিলনমেলা।
জানা যায়, ছোট সোনা মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে পিরোজপুর গ্রামে এ স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছিল, যা বর্তমানে বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার অধীনে পড়েছে। সুলতান আলা-উদ-দীন শাহ এর শাসনামলে (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দে) ওয়ালি মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের মাঝের দরজার উপর প্রাপ্ত এক শিলালিপি থেকে এ তথ্য জানা যায়। তবে লিপির তারিখের অংশটুকু ভেঙে যাওয়ায় নির্মাণকাল জানা যায় নি। এটি কোতোয়ালী দরজা থেকে মাত্র ৩ কি.মি. দক্ষিণে। মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। এটি হোসেন-শাহ স্থাপত্য রীতিতে তৈরি।
মসজিদের প্রবেশদার পেরোলেই হাতে বামে দেখা যাবে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের এক সেনা নায়কের সমাধি। বীরশ্রেষ্ট শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি এটি।
সকাল আটটায় এক আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় সফরের মূল আনুষ্ঠানিকতা। সকাল সকাল শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রংঙের জামা-পান্ট পড়ে এসেছেন। শুরু থেকেই সকলে একসাথে গান, গল্পের খুনশুটি, আড্ডা এ নিয়ে শুরু হয় এক অন্যরকম পরিবেশ।
আড্ডার মধ্যে দিয়ে কখন যেন তিন ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়েছে সবাই, কেউই বলতে পারে না। পূর্বের নির্ধারিত গন্তব্যে নেমে শুরু হয় প্রোগামের মূল আনুষ্ঠানিকতা। খাওয়া-দাওয়া, সোনা মসজিদের আশপাশ ঘুরে ফিরে দেখা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা সবমিলেয়ে কিভাবে দিনটি স্বপ্নের মত পার হয়ে গেল তার খোঁজ-খবর কেউই রাখেন নি।
¯œাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্যাম্পাস জীবনের শেষ শিক্ষা সফর এটি। বিভাগের বড়-ছোট ভাই-বোন শিক্ষক ও সহপাঠীদের সাথে অনেক মজা করছি। যেহেতু শেষ পিকনিক সেহেতু আরো বেশ মজা করার চেষ্টা করছি। এবারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটা অন্যান্য বারের তুলনায় বেশি মজার ছিল। অনেক মজা করছি। বন্ধুদের সাথে আশেপাশে ঘুরছি। ক্লাশে সবাই একসাথে ভালভাবে মেশার সুযোগ থাকলেও কিন্তু সফরে ছোট-বড় সবাই একসাথে সে এক অন্যরকম আনন্দ।
এসময় ভারাক্রান্ত মনে তিনি বলেন, ক্যাম্পাস জীবনের বিভাগের শেষ অনুষ্ঠানিক সফর, এমনটি মনে হয়ে খুব খারাপ লাগছে। বিভাগের ছোট-বড় ভাই-বোন সকলে যে মায়ার বন্ধনে ছিলাম পরবর্তীতে সেটা ভীষণ মিস করব।
সেলফি বর্তমানে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি অত্যাধিক জনপ্রিয় একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল এটি আনন্দের একটি অন্যতম মধ্যম। বিভাগের বন্ধু, বড়-ছোট ভাই-বোন, শিক্ষক সকলকে এক ফ্রেমে বন্দী করতে ব্যস্ত সবাই। ঠিক যেন আজকের ছবি আগামী দিনের স্মৃতি এই কথাটি বাস্তবে রূপ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সবাই।
গাড়ি চলছে। নিদ্দিষ্ট গন্তব্যে। জানা-অজানা পথ দিয়ে। গল্প-আড্ডা-গান এভাবেই কেটে যাচ্ছে সময়। হয়তো এ ইতিহাস কোথায়ও লেখা রবে না। তবে বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্মৃতির পাতায় হয়তো স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে স্মৃতিবিজড়িত দিনটি।  (লেখক :রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ