সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখে কর্মবান্ধব নগরী গড়ার প্রত্যয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে: শিল্পমন্ত্রী

আপডেট: নভেম্বর ২৭, ২০২২, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক :


রাজশাহীর নান্দনিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তজার্তিক পর্যায়ে সুনাম কুড়িয়েছে। সৌন্দর্যের দিক থেকে উন্নত দেশের বিলাসী সিটির সঙ্গেও তুলনা করছেন পরিদর্শনে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটক ও দেশের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাসহ মন্ত্রীরাও। এই সৌন্দর্যের নগর পরিদর্শন ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় রাজশাহীকে সিল্ক, পাট, শিক্ষা ও নান্দনিকতার গৌরব ধরে রেখে বহুমাত্রিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন।

শনিবার (২৬ নভেম্বর) দুপুরে রাজশাহী সার্কিট হাউসে ‘ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণে রাজশাহী জেলার ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং অন্যান্য অংশিজরদের সঙ্গে মতবিনিময়’ সভায় অংশ নিয়ে মন্ত্রী এই আশা ব্যক্ত করেন। এময় তিনি রাজশাহীর ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা শোনেন। সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধি অর্জনে নানা উদ্যোগের কথা বলেন মন্ত্রী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন। দেশের বিভিন্ন জেলাও দেখেছেন। রাজশাহী সিটির যে সৌন্দর্য তিনি দেখেছেন তা অবশ্যই মুগ্ধ করার মতো। আর নানা দিক বিবেচনায় রাজশাহীতে ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং এই সিটির সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে যাবতীয় সহযোগিতা তিনি করবেন। এর সঙ্গে রেস্টুরেন্ট, ফ্যাশন হাউস, পার্লারসহ সব ধরনের আধুনিক ব্যবসা চলবে। এখন পর্যটনকেন্দ্রের যে সুবিধাগুলো আছে সীমিতভাবে হলেও সেগুলো এখানে আনতে হবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানে অধিক গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শিল্পমন্ত্রী বলেন, রাজশাহী কর্মসংস্থানে অনেক পিছিয়ে আছে- এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা টেকসই উন্নয়নের কথা বলছেন। সুতরাং কর্মসংস্থানে আমাদেরও গুরুত্ব দিতে হবে। এবং এখন আমাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। যে শিল্পে কর্মস্থান বেশি হবে সেটা কে গুরুত্ব দেয়া হবে। সিল্ক সিটি হিসেবে সারা পৃথিবীতে রাজশাহীর সুনাম আছে। কিন্তু আর ‘পেটে নাই ভাত, কাটে না রে রাত’ এই অবস্থা দিয়ে তো আর হয় না। সুতরাং রাজশাহীতে কর্মসংস্থানের নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে।

রাজশাহী অঞ্চলে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে মন্তব্য করে নূরুল মজিদ বলেন, এই অঞ্চলে আমাদের আম আছে, টমেটো আছে। রাজশাহীর আমের সুনাম বিশ^ব্যাপি। আম, টমেটে থেকে অনেক প্রোডাক্ট হয়। এটা প্রক্রিয়া করতে পারলে সারাবিশ্বে এর বাজার আছে। সুতরাং শুধু প্রাণ বা অন্য বড় প্রতিষ্ঠানই কাজ করবে এমন না। স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
শিল্পমন্ত্রী দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অবদানের চিত্র তুলে ধরে বলেন, এটা সত্য যে, ব্যাংকগুলো তেলে মাথায় তেল দেয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের তারা গুরুত্ব দেয় না। এ খাতে তাদের দেশ প্রেমের কোনো বিষয় নেই। তারা রিটার্ন চাই। তবে বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবদানকে বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে ব্যাংক ঋণের বিষয়টি ভাবছে। ক্ষুদ্রঋণে ছোট্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ লাখ বা ১৫ লাখ টাকায় একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যেন অব্যাহতি দেয়া যায় এ বিষয়ে তিনি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলবেন।

রাজশাহীতে জাতীয় ও আন্তজার্তিক খেলাধুলার ভেন্যু নিয়ে পর্যটক আকৃষ্টের ক্ষেত্রেও সহযোগিতার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
বর্তমান সরকার কোন শিল্পকারখানা বিক্রি করবে না বা বন্ধ করবে না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, অন্যান্য যে শিল্প আছে যেমন চিনিকল এগুলোকে ডাইভারসিফিকেশন করে নানা রকম উৎপাদনমুখি পণ্য উৎপাদন করা হবে। এজন্য আমরা দেশি বা বিদেশি উদ্যোক্তাদের সন্ধানে আছি। আর পদ্মা নদী ডেজিং করে রাজশাহীর পাশে মালদা-মুর্শিদাবাদের সাথে সুদূর প্রসারী বাণিজ্যিক যোগাযোগ চালু করে এই নৌবন্দরের রুটটাকে ব্যবহার করতে চাই। এতে করে এই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি টুরিজম শিল্পেরও প্রসার ঘটবে। এসময় দেশে কোনো পণ্যের সংকট নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে বলে জানান তিনি। এছাড়া বিএনপির মেকি উন্নয়নের শূন্যতা কাটিয়ে টেকসই উন্নয়নে তারা কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান শিল্পমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিলের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি রাজশাহীর শিল্প-বাণিজ্যে বিএনপি সরকারের আত্মবিধ্বসী কর্মকানেডর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, একজন ধ্বংস করে গেলে তা পুনর্গঠনে সময় লাগে। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে এ অঞ্চলের রেশম ও জুট কারাখানাসহ অন্যান্য শিল্প যে ধ্বংস প্রক্রিয়া শুরু করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে চেয়েছিলেন তা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনর্গঠনে কাজ করে যাচ্ছেন। এসময় তিনি ভারতের মালদার ধুলিয়ান থেকে সুলতানগঞ্জের নৌরুট চালুসহ বন্ধ কারখানা চালু করতে শিল্পমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন।

মতবিনিময় সভায় মুক্ত আলোচনায় ব্যবসায় নেতৃবন্দ বিসিক আঞ্চলিক কার্যালয়ের ক্ষমতাজনিত জটিলতা, গ্যাস, অবকাঠামো ও ঋণ সমস্যার চিত্র তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন।

রাজশাহী জেলা প্রশাসন ও বিসিকের আয়োজনে মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন, বিসিকের চেয়ারম্যান (গ্রেড-১) মুহ: মাহাবুবর রহমান, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার জিএসএম জাফরুল্লাহ এনডিসি, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক, ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বিশিষ্ট সমাজসেবী শাহীন আকতার রেণী। মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন, রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু, বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী, সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক প্রমুখ। অনুষ্ঠানের শেষে অতিথিদের রাজশাহী জেলা প্রশাসন ও বিসিকের পক্ষ থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

এদিকে, মতবিনিময় শেষে পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের কেচুয়াতৈল এলাকায় স্থাপিত বিসিক শিল্পনগরী-২ পরিদর্শন করেছেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ.এইচ.এম খায়রুজ্জামান লিটন। বিকেলে বিসিক শিল্পনগরী-২ প্রকল্প এলাকা ঘুরে সেখানে গাছের চারা রোপণ করেন শিল্পমন্ত্রী ও রাসিক মেয়র।

এ সময় রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, বিসিক চেয়ারম্যান মুহ. মাহবুবর রহমান, বিভাগীয় কমিশনার জিএসএম জাফরউল্লাহ এনডিসি, জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ