স্কুলের জমিতে মেয়রের কিন্ডার গার্টেন

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০২১, ১০:০৭ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি জমি ভাড়া নিয়ে বাবার নামে করেছেন কিন্ডার গার্টেন স্কুল। প্রতিমাসে দুই হাজার টাকা ভাড়ায় ১০ বছরের মেয়াদে নিয়েছেন কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলী। আব্বাস মাসকাটাদিঘী বহুমুখী (কারি.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি। ভাড়া জমিতে বাবা আশরাফের নামে করেছেন ‘আশরাফ মেমোরিয়াল অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুল’।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আশরাফ মেমোরিয়াল অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুলের শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করে মাসকাটাদিঘী বহুমুখী (কারি.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠ। এই মাঠে শিশুদের শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন রাইড স্থাপন করা হয়েছে। স্কুল মাঠে জায়গায় করা হয়েছে কিন্ডার গার্টেনের চলাচলের পথ। এছাড়া স্কুলের প্রাচীরের সঙ্গে করা হয়েছে- কিন্ডার গার্টেনের আসা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের বিশ্রামাগার। আর স্কুলের ভেতরে করা হয়েছে ক্যান্টিন। যা মেয়র আব্বাসের নিয়ন্ত্রণে চলে। শুধু তাই নয়, মেয়র আব্বাসের রয়েছে ডিস ব্যবসা। স্কুলের পশ্চিম পাশে স্কুলের জমিতে করেছেন চেম্বার ও ডিস ব্যবসার ঘর।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানায়, আশরাফ মেমোরিয়াল অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল ‘অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুল’। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন- আক্কাস আলী মাস্টার। তিনি কাটাখালী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তার থেকে ২০১১ সালে দখলে নেন আব্বাস আলী। তখন মেয়র না হলেও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে কাটাখালীতে পরিচিত মুখ ছিলেন আব্বাস আলী।

মৃত আক্কাস আলীর ছেলে আম্মান আলী জানান, ‘১৯৯৫ সালে বাবা আক্কাস আলী ‘অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুল অল্প সময়ে বেশ নাম কুড়ায়। স্কুল ভালো চলার ফলে ১০টি ভ্যান গাড়িতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়।

২০১১ সালের দিকে স্কুলের শিক্ষক ও পরিচালকদের মধ্যে সমস্যা দেখা দেয়। এনিয়ে আব্বাসকে জানানো হলে তিনি বিচারের বসার জন্য বলেন। এনিয়ে একদিন সন্ধ্যায় অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুলে বসা হয় সবাই মিলে। কিন্তু কোনো সমাধান আসেনি। পরে আব্বাস স্কুলটি দখলে নেন। স্কুলের জমি ১৯ শতক তার দখলে ছিল। সেখানে আমরা দোকান করতে গেলে আব্বাস বাধা দেন।

তিনি আরো বলেন, পরে আব্বাস মাসকাটাদিঘী বহুমুখী (কারি.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠের পূর্বপাশে বাবা আশরাফের নামে স্কুল করেন। তখন বাবার স্কুলের প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী ছিল। ছিল ১০টি ভ্যান, টেবিল, চেয়ারসহ আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে আসেন। আব্বাস আমাদের এক টাকাও দেননি। এখন যেখানে আশরাফ মেমোরিয়াল অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুল রয়েছে; সেখানে স্থানীয় স্বর্ণকার আবু তাহেরের জমি রয়েছে।

এবিষয়ে আবু তাহেরের ছেলেরা জানান, ‘আশরাফ মেমোরিয়াল অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুলে তাদের জমি রয়েছে। তবে আমাদের দখলে নেই। স্কুলের দখলে রয়েছে।’

স্কুলের জমিতে কিন্ডার গার্টেন স্কুল এই বিষয়ে মাসকাটাদিঘী বহুমুখী (কারি.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আক্তার হাসান রুনু জানান, ‘মেয়র আব্বাস ২০১০ সাল থেকে এই পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে রয়েছেন। তবে মাঝে দুই বছর সভাপতি ছিলেন নান্নু। স্কুলের কিছু পতিত জমি আব্বাস ভাড়া নিয়েছেন। বছরের দুই হাজার করে টাকা দেবেন এই মর্মে ১০ বছলের জন্য ভাড়া নেন।’
স্কুলের জমি কিন্ডার গার্টেনের জন্য ভাড়া দেওয়ার কতটা যৌক্তিক এমন কথার উত্তরে অধ্যক্ষ রুনু বলেন- ‘কমিটির মিটিঙে সিদ্ধান্ত হয়। এর পরে আব্বাসকে জমি ভাড়া দেয়া হয়।’

এবিষয়ে মাসকাটাদিঘী বহুমুখী (কারি.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি ও মেয়র আব্বাস আলী জানান,‘ অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুলে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এর পরে আক্কাস আলীর ছেলেরা স্কুল রাখতে চাইছিল না। তখন কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষক-কর্মচারীরা আমাকে বলে- ভাই আপনি আমাদের স্কুলটা বাঁচান। ১৫০ থেকে ২০০ শিক্ষার্থী আছে, তাদের কী হবে। আপনি বাঁচান।
তিনি আরো বলেন,‘মাসকাটাদিঘী বহুমুখী (কারি.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিত্যক্ত ভবনটি ভাড়া নিয়ে সংস্কার করে কিন্ডার গার্টেন করা হয়। স্কুলের সাথে কথা হয়েছে- স্কুল চাইলে ফেরৎ দেওয়া হবে।’

এবিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (ডিডি) ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী জানান, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই জমি ভাড়া দিয়ে কিন্ডার গার্টেন স্কুল করতে দিতে পারে না। বিষয়টি আমরা জানা ছিল না। রোববারে তদন্ত করতে পাঠানো হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।’