স্ট্রোক রোগীর যুগান্তকারী চিকিৎসা পদ্ধতি ফিজিওথেরাপি ও আকুপাংচার

আপডেট: অক্টোবর ২৯, ২০২২, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

ডা. জিএম শামীম:


আজ বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেই আমরাও দিবসটি পালন করছি, এই বছর ২০২২, বিশ্ব স্ট্রোক দিবসের থিম হল “#Precioustime”, বিশ্ব স্ট্রোক দিবসের সচেতনতা এবং সমর্থন প্রচারণার প্রচারের জন্য ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশন (WSO) দ্বারা সমাপ্ত হয়েছে পূর্ববর্তী বছরের ২০২১ প্রচারাভিযান “মিনিটস ক্যান সেভ লাইভস”। পৃথিবিতে প্রতি ছয় সেকেন্ডে একজন স্ট্রোকে মারা যায়। স্ট্রোকের ফলে মানুষ হারাচ্ছে কার্যক্ষমতা এবং ব্যয় হচ্ছে প্রচুর অর্থ। শুধুমাত্র ভুল চিকিৎসার কারণে স্ট্রোক আক্রান্ত রোগী হয়ে যাচ্ছে শারীরিক, মানহিক ও কর্মক্ষেত্রে অক্ষম। আমাদের দেশে প্রচলিত একটি ধারণা আছে, হার্টে বা হৃদপিন্ডে স্ট্রোক হয়। আসলে এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। স্ট্রোক একটি মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিলতাজনিত রোগ।

আসুন এবার জেনে নেয়া যাক স্ট্রোক, কেন হয় এবং স্ট্রোক রোগীর ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি ও আকুপাংচাপর এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে।
স্ট্রোক : কোনো কারণে মস্তিষ্কের নিজস্ব রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে স্মায়ুকোষ নষ্ট হয়ে যাওয়াকে স্ট্রোক বলে। স্ট্রোকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় সেরিব্রো ভাসকুলার অ্যাকসিডেন্ট বলা হয়। যা বাংলা করলে দাঁড়ায়, মস্তিষ্কের রক্তনালির দুর্ঘটনা। আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গা আমাদেন শরীরের বিভিন্ন কাজের জন্য নির্দিষ্ট থাকে। তাই মস্তিষ্কের কোথায়, কতটুকু আক্রান্ত হয়েছে তার উপর নির্ভর করে স্ট্রোকের ভয়াবহতা।

স্ট্রোকের প্রকার ও কারণ
সাধারণত দুটি কারণে স্ট্রোক হয়ে থাকে
১. মস্তিস্কের রক্তনালিতে কোনো কিছু জমাট বাধলে : যার ফলে রক্তের নালিকা বন্ধ হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশের স্মায়ুকোষগুলো অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়।
২. মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটলে : উচ্চ রক্তচাপ এই স্ট্রোকের অন্যতম কারণ যেখানে ছোট ছোট রক্তনালিকা দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়, ফলে মস্তিষ্কের মধ্যে চাপ বেড়ে যায় এবং অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কের স্মায়ুকোষগুলো মারা যায়।

স্ট্রোক এর উপসর্গসমূহ :
১. হঠাৎ অতিরিক্ত মাথা ব্যথা।
২. হঠাৎ মুখ, হাত ও পা অবশ হয়ে যাওয়া (সাধারণত শরীরের যে কোনো এক পাশ) অনেক সময় মুখের মাংস পেশি অবশ হয়ে যায়, ফলে লালা ঝরতে থাকে।
৩. হঠাৎ কথা বলতে এবং বুঝতে সমস্যা হওয়া।
৪. হঠাৎ এক চোখে অথবা দুই চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া।
৫. হঠাৎ সোজা হয়ে বসা ও দাঁড়াতে সমস্যা হওয়া, মাথা ঘুরানো এবং হাঁটতে সমস্যা হওয়া।

স্ট্রোক পরবর্তী সমস্যা : শরীরের এক পাশ অথবা উভয় পাশ অবশ হয়ে যায়, মাংসপেশীর টান প্রাথমিক পর্যায়ে কমে যায় এবং পরে আস্তে আস্তে টান বাড়তে থাকে, হাত ও পায়ে ব্যথা হতে পারে, হাত ও পায়ের নড়াচড়া সম্পূর্ণ অথবা আংশিকভাবে কমে যেতে পারে, মাংসপেশী শুকিয়ে অথবা শক্ত হয়ে যেতে পারে, হাঁটাচলা, ওঠাবসা, বিছানায় নড়াচড়া ইত্যাদি কমে যেতে পারে, নড়াচড়া কমে যায় যার ফলে চাপজনিত ঘা দেখা দিতে পারে, শোল্ডার বা ঘাড়ের জয়েন্ট শক্ত হয়ে যেতে পারে ইত্যাদি।
চিকিৎসা পদ্ধতি

কেউ স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। মেডিকেল ইমারজেন্সি থেকে কেটে ওঠার পর শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা। এখন বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, ফিজিওথেরাপির পাশাপাশি মেডিকেল আকুপাংচার স্ট্রোক রোগে অনেক কার্যকারি চিকিৎসা পদ্ধতি।

মেডিকেল আকুপাংচার স্ট্রোক রোগে যেভাবে কাজ করে : এটিকে চিকিৎসার একটি প্রাচীন বিজ্ঞান হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যেখানে সূক্ষ্ম নিডিল মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলিতে ঢোকানো/স্থাপন করা হয় যাতে রোগ নিরাময় বা প্রতিরোধ করা যায়। আকুপাংচার শব্দটি ল্যাটিন থেকে এসেছে যেখানে Acus মানে সূঁচ এবং Puncturea মানে সন্নিবেশ/স্থান।

আকুপাংচার চিকিৎসার মাধ্যমে মোটর পুনরুদ্ধারের একটি নিউরোফিজিওলজিকাল ব্যাখ্যা আছে। একজন স্ট্রোক আক্রান্ত রোগীর মোটর ফাংশনের সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতি (যেমন প্যারালাইসিস বা প্যারেসিস) হয়, যা সর্বদা ক্লিনিকাল মেডিসিন অনুশীলনে কম ফলপ্রসূ- সে ক্ষেত্রে আকুপাংচার একটি সন্তোষজনক উন্নতি ঘটায়।

একটি ডায়াগ্রাম এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যাক-

যেকোনো বাহ্যিক যান্ত্রিক উদ্দীপনার জন্য টিস্যুতে সংবেদনশীল রিসেপ্টর (পেশীর স্পিন্ডল/ ইন্ট্রাফুসাল ফাইবার) উদ্দীপিত হবে। সংবেদনশীল আবেগ তৈরি করা যা Afferent/ সেন্সরি নার্ভ ফাইবার (αl, αlla) দ্বারা ডোরসাল রুট গ্যাংলিয়নের দিকে বাহিত হবে, তারপর ডোরসাল হর্নের দিকে ডোরসাল হর্ন কোষে পৌঁছাবে। ডোরসাল হর্ন সেল এই আবেগকে অগ্রবর্তী হর্ন সেল (AHC) এর দিকে পাঠায়। এখানে স্নায়ুর গতিপথ হল সেন্সরি পাথওয়ে।

এই সংবেদনশীল আবেগের জন্য, AHC আরেকটি গ্রুপ ইম্পালস তৈরি করে যা ইফারেন্ট নার্ভ ফাইবার (ϒ) পেশীর অতিরিক্ত ফুসাল ফাইবারগুলির দিকে বহন করবে এবং পেশী সংকোচন সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করবে। তাই AHC থেকে পেশী পর্যন্ত স্নায়ুর গতিপথ হল মোটর পাথওয়ে। সংবেদনশীল এবং মোটর পথের সংমিশ্রণকে রিফ্লেক্স আর্ক বলা হয়। এভাবে আকুপাংচার আপনার দুর্বল সাইটকে সবল করবে ইনশাল্লাহ্।

লেখক: বাত, ব্যথা, প্যারালাইসিস, ফিজিওথেরাপি ও আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ
চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালটেন্ট, রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন।