স্বপ্নের পদ্মা সেতু : শেখ হাসিন্রা একটি চ্যালেঞ্জ ও বাঙালির ঐতিহাসিক বিজয়

আপডেট: জুন ১৮, ২০২২, ১:৪৭ অপরাহ্ণ


আবুল কালাম আজাদ


স্বপনের পদ্মাসেতু আজ আর স্বপ্ন নয়।প্রমতœা পদ্মাকে জয় করে দেশ-বিদেশের সকল ষড়যন্ত্রকারিদের মুখে চুনকালি দিয়ে স্বপ্নের পদ্মাসেতু আজ বাস্তবে। আগামি ২৫ জুন শনিবার সকাল ১০ টায় শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই পদ্মা সেতু ছিল শেখ হাসিনার এবং বাঙালি জাতির অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ এবং একাত্তরের স্বাধিনতার পর আরেকটি ঐতিহাসিক বিজয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল ষড়যন্ত্র ও কথিত দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত করে বিশ্বকে চ্যালঞ্জ দিয়ে ঘোষনা করেছিলেন, বিদেশের টাকায় নয়, দেশের জনগনের নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মান হবে।

আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসি চ্যালেঞ্জের ফসল বাংলাদেশের জনগনের নিজস্ব অর্থায়নে দেশের সর্ব বৃহত পদ্মা বহুমূখি সেতুকে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীকি হিসেবে বিবেচনা করছে বিশ্ব।

পদ্মা সেতু বিশ্বের ১১ তম দীর্ঘ সেতু। এশিয়ার দ্বিতীয় দীর্ঘ সেতু এটি। পদ্মা সেতুর উপর তলা দিয়ে চলবে গাড়ি এবং নিচ তলা দিয়ে চলবে ট্রেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়ে।

এই সেতুর প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়েছিল শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) রাষ্ট্র পরিচালনাকালে ১৯৯৯ সালে। ২০০১ সালের ৪ জুলাই শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন করেন। এরপর তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মাসেতু নির্মাণের ওপড় বিশেষ গুরুত্ব দেন।

এর অর্থায়নের কথা ছিল এডিবি, জাইকা ও বিশ্বব্যাংকের।কিন্তু ২০১২ সালে দুর্নীতির চেষ্টার ভুয়া অভিযোগ তুলে প্রথমে বিশ্বব্যাংক এবং পরে অন্য অর্থায়ন থেকে সরে যায়।

২০১৩ সালের ৪ মে দেশের জনগণের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। ইতোমধ্যে ২০১৪ সালে দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে কানাডার আদালত থেকে রায় দেয়া হয়।

অতঃপর বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে ফিরে আসতে চাইলেও শেখ হাসিনার সরকার সে প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। ওই বছরই ১৭ জুন বাংলাদেশ সরকার এবং চায়না ব্রিজ কোম্পানির মধ্যে সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে’ পদ্মাসেতু বাস্তবায়নের মূল পাইলিং কাজের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। এরপর দেশের ভিতর থেকে এবং বিদেশ থেকে অনেক অবজ্ঞা ও সমালোচনা উপেক্ষা করে চলতি ২০২২ সালের জুন মাসে পদ্মা সেতুর ওপর তলার কাজ শেষ হয়। নিচ তলায় রেললাইনের কাজ চলছ।

দেশের সবচেয়ে বড় পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হতে চলেছে। সেতু যেমন বড় ; খরচের খাতও তেমন লম্বা। সবমিলিয়ে সেতু নির্মানের ব্যয় এসে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। যদিও একেবার প্রথমের দিকে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা।

তারপর নক্সাসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবির্তন আসে, ফলে পর্যায়ক্রমে এই ব্যয় বেড়ে যায়। এর সাথে যুক্ত আছে ঢাকা- মাওয়া- ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মানের খরচ ১১ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া আছে রেললাইন নির্মাণের খরচ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

সবমিলে মোট খরচ হবে ৮০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। যা বাংলাদেশের এখনকার একবছরের মোট বাজেটের ১২শতাংশ।
পদ্মাসেতু নির্মাণের যে ব্যয় হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে।

বাকি ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছ অর্থ বিভাগ। আগামি অর্থ বছর থেকে ৩৫ বছরে অর্থ বিভাগের ঋণ পরিশোধ করা হবে। আর সুদে আসলে পরিশোধ করতে হবে প্রায় ৩৬ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।

পদ্মা সেতুতে টোল আদায় হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে
দেশের অন্যান্য সেতুর মতো পদ্মা সেতু পার হতে টোল দিতে হবে। এরইমধ্যে সরকার পদ্মা সেতুর টোল চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এই সেতুর টোল আদায়ে থাকবে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। পদ্মা সেতুতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল দিতে চাইলে যানবাহনের মালিকদের একটি বিশেষ পদ্ধতি মানতে হবে।

এটা হলো রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশান (আই এফ আই ডি)। এটি থকলে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ফার্স্টট্র্যাকের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে টোল আদায় করা যাবে। পদ্মা সেতুর টোল আদায় করবে কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন। তারা সেতুর দুই প্রান্তে মোট ১৪ টি ইলেক্ট্রিক টোল কালেকশান (ইটিসি) বুথ বসিয়েছে।প্রথমিকভাবে সেতু চালু হলে দুই প্রান্তে একটি করে মোট দুটিতে চালু থাকবে ইটিসি। আর ৮ টি বুথে টোল প্লাজায় টোল আদায় করা হবে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। বাকি ৪ টি বুথ চালু করা হবে ২৫ জুন সেতু চালু করার পর।
পদ্মা সেতু জুড়ে থাকবে সি সি ক্যামেরা
পদ্মা সেতুর মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। সেতুর দুই পাড়ে সংযোগ ঘটাতে উড়াল পথ (ভায়াডাক্ট) আছে ৩ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার। সবমিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার। সেতুর এই পুরো এলাকা জুড়ে বসানো হচ্ছে সিসি ক্যামেরা।এতে করে সেতুর ওপর যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তবে সিসি ক্যামেরার সহায়তায় তাতক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর জন্য পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে দুটি থানা স্থাপন করা হয়েছে।
পদ্মার ঢেউয়ে সাজবে সব সরকারি অফিস
আগামি ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে উৎসবের সাজে সাজবে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়। একইসঙ্গে ৮ বিভাগীয় শহর ও ৬৪ জেলার সব সরকারি অফিস প্রাঙ্গণে আলোক সজ্জার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে বিভাগীয় শহর ও সেতুকেন্দ্রিক চারটি জেলা ঢাকা, মাদারিপুর ,শরিয়তপুর এবং মুন্সিগঞ্জ স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে থকবে জমকালো নানা আয়োজন।

পদ্মা সেতু নির্মাণে জড়িতদের সাথে ছবি তুলবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
পদ্মা বহুমুখি সেতু নির্মাণ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ছবি তুলবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শ্রমিক থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত সবার সঙ্গে ছবি তুলবেন তিনি। এছাড়া সেতু তৈরিতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ সংরক্ষণের জন্য ফরিদপুরের ভাঙ্গায় একটি জাদুঘর তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

একসঙ্গে উঠলো ৪১৫টি বাতি জ্বলে
স্বপন পূরণের দ্বারপ্রান্তে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। আর কয়েকদিনপরই ২৫ জুন খুলছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। সেতু চালু হলে উত্তাল পদ্মে পাড়ি দিতে আর ভোগান্তি পোহাতে হবেনা। এমন স্বপ্নে যখন বিভোর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ তখন সেতুতে চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৩ জুন/২২ সন্ধ্যায় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পদ্মাসেতুতে ৪১৫ টি বাতি এক সঙ্গে জ্বালানোর মধ্য দিয়ে পুরো পদ্মা সেতু আলোকিত করে তোলা হয়েছে।

পদ্মা সেতুর ফলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং আঞ্চলিক জিডিপি ২ দশমিক ৩ শতাংশ হার বৃদ্ধি পাবে।
এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাবে পদ্মা সেতুর ফলে জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং আঞ্চলিক জিডিপি ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। অন্য হিসেবে সারা দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যাবে ২ দশমিক ২ শতাংশ।

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষর ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। দারিদ্রের হার হ্রাস পাবে প্রায় ১ শতাংশ করে। দেশের অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন ও অর্থায়ন ত্বরান্বিত হবে। উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হবে দেশের দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোট মানুষ। তাদের জীবন ধারায় ব্যপক পরিবর্তন আনবে পদ্মা সেতু।

এ সেতু আমাদের গর্বের। এ সেতু ষড়যন্ত্রকারিদের অবজ্ঞা ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ। এ সেতু শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জের বিজয়। এ সেতু একটি বাঙালি জাতির বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের বিজয়ের পর আরও একটি বিজয়। বিশ্ব আজ আবারো দেখছে বাঙালিরাই পারে সব ষড়যন্ত্রকে পায়ে দলে বিজয় ছিনিয়ে আনতে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ