স্বপ্ন পূরণের পথে আরো একধাপ আমরা পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০২১, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি:


পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল বা পরমাণু চুল্লিপাত্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বপ্ন পূরণের পথে আরো একধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার (১০ অক্টোবর) সকাল ১১:৪০ টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর স্থাপন কাজের উদ্বোধন করেন।অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ার পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আজকের দিনটি দেশের জন্য, আমার ব্যক্তিগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ। আমি খুব আনন্দিত হতাম যদি সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারতাম। করোনা মহামারির কারণে সেটি সম্ভব হলো না। তবে দ্রুতই আমি এখানে আসবো।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথেও পাকিস্তান আমলের বঞ্চনার ইতিহাস জড়িত। তারা ধোঁকাবাজি করেছে। শুধু জমি বরাদ্দ করে। আর প্রকল্পটার বরাদ্দ পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নেয়। ৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের দাবি তোলেন। স্বাধীনতার পর আইআইএর সাথে চুক্তি করেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সব থেমে যায়। এরপরের শাসকরা এ প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার যোগ্য ছিলো না।

নিতেও চায়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে আবার এ প্রকল্প এগিয়ে নেয়। ২০০৯ আবার ক্ষমতায় এসে তার সরকার রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর প্রকল্পকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৩ সালে রাশিয়া সফরে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে আমার আলোচনা হয়। বিশেষকরে পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জননিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই আমরা এই প্রকল্প শুরু করি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তারা কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন করেনি। আমরা সরকার গঠনের পরই বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পেরেছি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে বলেই বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, ভবিষ্যতে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের জন্যই এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার ব্যবস্থা হচেছ।

তারপরও অনেকে বুঝে না বুঝে সমালোচনা করে। কিন্তু সরকার কাজ করে যাচ্ছে দেশ ও জনগণের জন্য। এ প্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে দেশের বিজ্ঞানী প্রকৌশলী শিক্ষার্থীদের নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। জনবলকে রাশিয়া ভারতে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এ দেশের মাটি নরম। পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের জন্য মাটিকে নতুন করে প্রস্তুত করা হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য মালামাল ভলগা থেকে নদী পথে পদ্মায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন একটা পথ হলো। যা আগামীতে বাণিজ্যে কাজে লাগবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি খোঁজা হচ্ছে। যদিও ওদিকের জমি অনেক নরম। তবে আমার ইচ্ছে পদ্মার ওপারে হোক। শেখ হাসিনা বলেন, রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের ফলে বিশ্বে পারমাণবিক যুগে বেশ শক্ত অবস্থানে এলাম আমরা। আমরা পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সূচনা বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব জিয়াউল হাসান। তিনি বলেন, এ প্রকল্প পরিবেশ বান্ধব বলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের কাজ ৪০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এবছর ৫০ ভাগ কাজ শেষ করা হবে।

অনুষ্ঠানের সভাপতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান তার বক্তব্যে বলেন, আজকের এই ঘটনা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর ফলে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের সাথে তাল মিলিয়েই এগিয়ে যাবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশ আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছেন তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর ডাকে যেমন সমস্ত বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল তেমনি এদেশটাকে সোনার বাংলা গড়ার যুদ্ধে শেখ হাসিনার ডাকে আমরা আজ একীভূত হয়েছি।

রুপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মো. শৌকত আকবর প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিয়ে রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেলকে ডিজাইন পজিশনে স্থাপন করার কাজ সম্পন্ন করেন। এসময় সেখানে এএসই’র পরিচালক (বাংলাদেশ অংশ) এলক্সি ডেইরি, পরিকল্পনা কমিশনের মুখ্য সমন্বয়ক (প্রধানমনস্ত্রীর কার্যালয়) জুয়েনা আজিজ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফে. ড. সানোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক উপস্থিত ছিলেন।

এসময় প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর বলেন, ইউনিট-১ এর ভৌত কাঠামোর ভেতরে রিয়াক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের পারমাণবিক যন্ত্রাংশ স্থাপন সম্পন্ন হলো। এর ফলে এই ইউনিটের রিঅ্যাক্টর ভবনের ভেতরের কাজ প্রায় শেষ হবে। তিনি বলেন আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুসারে এ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পের ঠিকাদার রুশ পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাচেভ অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে বলেন, বিজ্ঞান নিয়ে বছরের পর বছর রাশিয়া যে উৎকর্ষতা অর্জন করেছে, সেই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান আজ রূপপুরে প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কিছু ব্যবস্থাপনা রূপপুর প্রকল্পকে করেছে সবচেয়ে নিরাপদ। করোনা মহামারীর মধ্যেও সময় মতো প্রকল্প শেষ করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প জনবল তৈরিতেও সহযোগিতা করছে। এ প্রকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ও ২২২ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। প্রকল্পের নিরাপত্তা রোসাটমের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত কর্ম বলে মন্তব্য করেন এলেক্সি লিখাচেভ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে রূপপুর প্রকল্পের ওপর একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। মোনাজাত ও অতিথিদের ক্রেস্ট প্রদানের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়। এ সময় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু এমপি, পাবনা সদরের সাংসদ গোলাম ফারুক প্রিন্স, স্থানীয় এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান বিশ্বাসসহ বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য, পাবনার জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেল হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তাগন উপস্থিত ছিলেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ