স্বপ্ন যখন আততায়ী

আপডেট: মার্চ ২৬, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

তৌহিদ ইমাম



জাতির শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো নাকি সেই জাতিরই বিরুদ্ধে মূর্তিমান, জ্বলন্ত প্রতিবাদ। তাঁদের জন্মই হয় স্বজাতির গালে তীব্র চপেটাঘাত করতে। জাড্যতা ও কর্মহীনতা যখন জাতির জাতীয় চরিত্র, তখন তাঁরা কর্মোদ্যোগের তোড়ে ভাসিয়ে নিতে চান চরাচর; ভীরুতা যখন জাতির ভেতরে জাঁকিয়ে বসা প্রবৃত্তি, তখন তাঁরা বিজয়কেতন উড়াতে চান প্রচ- দুঃসাহসিকতার। তাঁরা একের পর এক বাঁধন কেটে চলেন স্বজাতির পিছুটানের প্রতিবাদে, অন্তরীণতার গালে চড় কষিয়ে বিজয়রথ ছোটাতে চান অনন্ত নীলিমায়। পৃথিবীর আর সব জাতির মতো বাঙালি জাতিরও শ্রেষ্ঠ সন্তানগুলো বাঙালি জাতিরই প্রতিদ্বন্দ্বী!
‘ভেতো বাঙালি’ বলে পরিচিত এই জাতির নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস খুঁজলে জানা যায়, একটি মহান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার এই বাঙালি জাতি। বাঙালি তার রক্তে-মাংসে, অস্থি-মজ্জায় এই উত্তরাধিকারের বীজ বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আজকের যে বাংলাদেশ, তা-ও সংঘর্ষ ও সংগ্রামজাত বিবর্তনের ফসল। এ জাতির জন্মের ঠিকুজি ও স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তায় ক্রমোত্তরণ একই সূত্রে গাঁথা।
ঊনিশ শ সাতচল্লিশে ‘কুখ্যাত’ দ্বিজাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে জন্ম নিয়েছিলো স্বাধীন ভারতবর্ষ ও তথাকথিত মুসলিম আবাসভূমি পাকিস্তান। ভৌগোলিক দিক থেকে পাকিস্তানের সৃষ্টি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে এ এক অভিনব পরীক্ষা। এর দুইটি অংশ পরস্পর থেকে পনেরোশত মাইল বিদেশি এলাকা দ্বারা বিচ্ছিন্ন। শুধু ভৌগোলিক দিক থেকে অবাস্তব নয়, অন্যান্য দিক থেকেও, যেমন ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার, ঐতিহ্য এবং অর্থনীতি দুইটি অঞ্চল পরস্পর থেকে পৃথক। একমাত্র ধর্ম ছাড়া আর কোন বিষয়ে তাদের কোন মৌলিক ঐক্যবন্ধন ছিলো না। ফলে জন্মলগ্ন থেকেই দুই অঞ্চলের মধ্যে অসম অর্থনীতি ছাড়াও জাতিগত, মানস প্রকৃতিগত, সংস্কৃতিগত এবং ঐতিহাসিক স্বতন্ত্র সত্তাগুলো ক্রমশ প্রকট হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের প্রথম থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অবহেলা ও প্রবঞ্চনা শুরু হয়। পাকিস্তানের পঁচিশ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই সত্যটি সুস্পষ্ট হবে যে, পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিলো ঔপনিবেশিকÑ সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রবঞ্চনা ও নির্যাতনের করুণ ইতিহাস।
এই কারুণ্যের আবহেই শেখ মুজিবুর রহমানের স্পর্ধিত আবির্ভাব। তাঁর জন্ম ১৯২০ সালে, যখন সমগ্র ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছে, ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীও আক্ষরিক অর্থেই ভারত হতে পাত্তাড়ি গুটাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। একটি রক্তাক্ত পটভূমিকার জন্ম দিয়ে সাতচল্লিশের বেদনাবহ ও শোকাকুল দেশভাগের সময় তিনি সাতাশ বছরের তরুণ। বিভেদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে যে লাভার মতো আরেকটি রক্তগঙ্গা জন্মের সম্ভাবনা উদ্গীরিত হচ্ছিলো, তার প্রতিভাস তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের ভেতরে রাজনৈতিক সচেতনতার বীজ উপ্ত করে দিয়েছিলো। যে কোন রাজনীতিসচেতন তরুণের মতোই তিনি ছিলেন দুঃসাহসী। মাথা নত করতে শেখেননি তিনি, মাথা নত করেনওনি আমৃত্যু কারো কাছেই। প্রবল আত্মবিশ্বাসী, দুর্জ্ঞেয়, দুর্জয়ী শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন চিরউন্নতশির। ইংরেজ শাসনের ভূত কাঁধ থেকে নামতে না নামতেই এদেশের কাঁধে সওয়ার হয়েছিলো নতুন ভূত, পাকিস্তানের ভূত। এই উপর্যুপরি ভারবহনে এদেশটা চলছিলো কুঁজোর মতো বাঁকা হয়ে, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলো ভেতরে ভেতরে, হয়ে চলছিলো নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দেশকে ভালোবেসেছিলেন যুগপৎ প্রেমিক ও সন্তানের মতো, তীব্র সংবেদনশীলতায় তিনি অনুভব করেছিলেন সে রক্তক্ষরণ। এ ক্ষরিত রক্ত পূরণে তিনি তৈরি হচ্ছিলেন নিজের রক্তোৎসর্গের জন্য। অশ্রুবিন্দু ও অগ্নিশিখার মহিমা তিনি বুঝতেন, ক্রমশই হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী ও উদ্ধত।
তার জীবন থেকে আমরা দেখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে তিনিও অংশ নিয়েছিলেন। ফলে অনিবার্যভাবেই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, নিম্নমধ্যবিত্তের জীর্ণ বাস্তবতা নিশ্চয় তাঁরও ছিলো। সে বাস্তবতার চাপে অনেক তরুণই প্রশাসক প্রভুদের পায়ে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা ভিক্ষা চাইতো। কিন্তু না, নত হওয়া, পরাভব মেনে নেওয়া শেখ মুজিবুর রহমানের ধাতে ছিলো না, মধ্যবিত্তের সমস্ত সীমাবদ্ধতাকে দলে-পিষে পায়ে পায়ে পেরিয়ে গেছেন, প্রশাসককুলের চোখে চোখ রেখে নিজের দাবির যৌক্তিকতা পুনর্বার ঘোষণা করেছেন অনপেক্ষ দৃঢ়তায়। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সাথে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে-বুকিয়ে ফেলেছিলেন। এরও আগে আমরা দেখি, স্কুলে পড়ার সময় হোস্টেলের ছাদ নির্মাণের দাবিতে পূর্ব বাঙলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের দাবি পেশ করেছেন। আবুল কাশেম ফজলুল হক, সাহস ও তেজস্বিতায় সারা বাংলায় যিনি ‘বাংলার বাঘ’ নামে খ্যাতিমান, খোদ ইংরেজ পর্যন্ত যাঁকে ভয় ও সম্ভ্রমের চোখে দেখতো, তাঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে একটা সামান্য পনেরো-ষোল বছরের কিশোর, কী দুঃসাহসিকতা! যেন প্রবীণ সিংহের সামনে দাঁড়িয়েছে সদ্য নখ-দন্ত গজিয়ে ওঠা সিংহশাবক।
একাত্তর সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, এক সাগর রক্ত সাঁতরে বাঙালি জাতি আবারও উঠে এলো ভূখ-ে। শাসন-শোষণ, নির্যাতন আর পরাধীনতার জরায়ু ছিঁড়ে জন্ম নিলো ক্লেদাক্ত যে শিশু-বাংলাদেশ, তার হোম গভর্নেসের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে একপক্ষ প্রশ্ন তোলে, হয়তো তারা এরকম প্রশ্ন তুলে তর্কের সুখ পায় যে, তখন কি দেশে আর কোন নেতা ছিলো না যে, শেখ মুজিবুর রহমান-ই দেশনায়ক হয়ে উঠলেন? তাহলে কি তিনি ক্ষমতালোলুপ ছিলেন? তাদের বিনীত পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই, যে মানুষটি সাত কোটি মানুষের বুকের ভেতরে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন জাগিয়ে তুলতে পারেন, সেই স্বপ্নময় স্বাধীন দেশের জন্মের পর তার পুনর্গঠন ও পরিপূর্ণ সার্বভৌমত্ব অর্জনে আপামর জনগোষ্ঠীর সর্বাত্মক অংশগ্রহণে আর কারও আহ্বানই কি কার্যকর হতে পারতো? একটি যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের পুনর্গঠনে যে গভীর প্রজ্ঞা, কর্মদক্ষতা, বিচক্ষণতা আর দূরদর্শিতার দরকার ছিলো, হয়তো আর কারও কারও ভেতর সেগুলোর সমাহার ঘটেছিলো, কিন্তু জনগণের সর্বময় নির্ভরতা ও ভরসার আশ্রয়স্থল ছিলেন কেবল শেখ মুজিবুর রহমানই। এছাড়াও বাইরের পৃথিবীর সাথে ব্যাপকতর যোগাযোগ এবং সহযোগিতা অর্জন করতে তিনি ছাড়া আর কেউ পারতেন না।
আজকের বাংলাদেশে আরও একটি কুৎসিত কিন্তু চটকদার বিতর্কও মাঝে মাঝেই ঝড় তোলে, সেটা হলো শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ বলা যায় কি-না। যেমন জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক তাঁকে অলংকৃত অভিধাটিতে অভিষিক্ত করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে আহমদ ছফা ও আহম্মদ শরীফ-এর মতো বুদ্ধিজীবীগণ তাঁকে জাতির পিতা বলতে অস্বীকার করেছেন। আমরা এ তর্কে সেঁধোতে চাই না। শুধু ‘জাতির পিতা’র সংজ্ঞার্থটিতে স্বচ্ছ হতে চাইÑ একটি জাতির চিরায়ত আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন, স্বম্ভাবনা, প্রত্যাশা যে ব্যক্তিমানুষটির ভেতর দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে, আমরা কি তাকেই জাতির পিতা বলবো না?
শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন স্বপ্নপ্রোথিত পুরুষ। স্বজাতি ও স্বদেশকে ঘিরে তাঁর স্বপ্ন ছিলো আকাশছোঁয়া, দিগন্তপ্লাবী। খুব কম বয়স থেকেই তাঁর চোখের দৃষ্টি অনুজ্জ্বল হয়ে এসেছিলো, কিন্তু একই সাথে হৃদয়দৃষ্টি তাঁর প্রখর থেকে প্রখরতর হয়েছে। রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় নিখাদ কবি। বাস্তববুদ্ধি আর সৌন্দর্যবোধ তাঁকে দিয়েছিলো মহানায়কের মহিমা।
যে কোন পরাধীন জাতিরই ত্রাণকর্তা বাইরে থেকে আবির্ভূত হন না- তিনি সেই জাতিরই ভেতর থেকে উঠে আসেন। আমেরিকায় জর্জ ওয়াশিংটন, ইটালিতে গ্যারিবল্ডি, তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক, কিউবায় চে’ গুয়েভারা, ফ্রান্সে কৃষককন্যা জোয়ান অব আর্ক, ভারতে মহাত্মা গান্ধী এবং বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানÑ স্বদেশের মাটির আঁশটে গন্ধ আর গভীর ফসলের বিষাদ থেকে উঠে আসা একেকজন। পরাধীন স্বদেশে প্রবাসীর মতো জীবনযাপনে যে দুঃখ, ক্লেদ, কষ্ট, যাতনাÑ তা-ই একসময় তাঁদের বিদ্রোহী করে তুলেছে, শক্ত মুষ্টিবদ্ধ হাতে তুলে দিয়েছে স্বাধীনতার অস্ত্র। শেখ মুজিবুর রহমান, কবি ও মহানায়ক, স্বপ্ন ও প্রত্যয়Ñ এই ছিলো তাঁর সম্বল। পরাধীন পূর্ব পাকিস্তানে দহনে দহনে একদিন গর্জে উঠেছিলেন, বজ্রনির্ঘোষে ঘোষণা করেছিলেন একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্মদানের দৃঢ় অঙ্গীকার। সে অঙ্গীকার পূরণের পর নতুন স্বপ্নপ্রত্যয়ে দেশ গড়তে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নিজে, আহ্বান করেছিলেন আপামর জনগোষ্ঠীকে। তাঁর ছত্রছায়ায় প্রণীত হয়েছিলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সংবিধানগুলোর একটি, দেশ হয়ে উঠেছিলো স্বনির্ভর, উদ্যোগ চলছিলো তাদের নির্মূলের, যারা ছিলো ‘জাতির জারজ সন্তান’; কিন্তু থেমে গেলো সব, স্থবির হয়ে গেলো সমস্ত অগ্রযাত্রা। সব কালেই এমন কিছু জান্তব অস্তিত্ব বর্তমান থাকে, যারা স্বপ্নের শত্রু, শত্রু স্বাপ্নিক মানুষের। কেবল বাস্তবটুকু গ্রাস করেই তারা সন্তুষ্ট নয়, তারা হানা দেয় স্বপ্নলোকেও।
শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালির শ্রেষ্ঠ স্বাপ্নিক- বিয়াল্লিশ বছর আগে নিহত হয়েছিলেন সপরিবারে; তিনি নিহত হয়েছিলেন কারণ তিনি স্বপ্ন দেখতেন, তিনি নিহত হয়েছিলেন কেননা স্বপ্নহন্তারকরা স্বাপ্নিকদের বেশিদিন বাঁচতে দেয় না। তাই প্রকৃতপক্ষে স্বপ্নই শেখ মুজিবুর রহমানের আততায়ী।
শেখ মুজিবুর রহমান বরণ করে নিয়েছিলেন গ্রিক ট্রাজেডির নায়কের নিয়তি। শুধু আমরা জানি না, জুলিয়াস সিজারের মতো তিনিও বলেছিলেন কি-নাÑ ‘ব্রুটাস, তুমিও!’