স্বাগতম ও শুভেচ্ছা জানাই শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমুকে

আপডেট: জুলাই ২৭, ২০২২, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

মিথুশিলাক মুরমু:


সদ্য নির্বাচনে ভারতের পঞ্চদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন সাঁওতাল নারী দ্রৌপদী মুরমু। প্রতিপক্ষ যশবন্ত সিনহাকে পরাস্ত করে শতকোটি মানুষের দেশ ভারতের সিংহাসনে আসীন হয়েছেন। তাঁর এই অসাধারণ সাফল্যে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত হয়েছেন আদিবাসী সাঁওতাল’রা, আদিবাসীরা এবং সর্বোপরি অবহেলিতরা। বাংলাদেশের সাঁওতালসহ আদিবাসীরা ২২ জুলাই ঢাকাস্থ জাতীয় সংসদের সম্মুখভাগে তাদের ঐতিহ্যবাহী মাদল, করতাল, বাঁশি নিয়ে নাচ, গান ও হৈ হুল্লোড় করে আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছে। সাঁওতালি ভাষায় বক্তব্য দিয়ে সাঁওতালরা রাজধানী ঢাকায় উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। জাতীয় সংসদের সম্মুখে সমাবেশে সাঁওতালি ভাষায় বক্তব্যের নজির সৃষ্টি হয়েছে শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমু’র বদৌলতে। অনুরোধ জানানো হয়, ‘তিনি যেন বাংলাদেশে আসেন এবং আমাদের দেখে যান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেন তাঁকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।’ উত্তরের জেলা গাইবান্ধাতে সাঁওতালরা আনন্দ র‌্যালি করেছে। শত-সহস্র মাইল দূরত্বে ময়ূরভঞ্জ জেলার সাঁওতাল নারীর উত্থান আমাদেরকে গর্বিত করেছে, অনুরূপভাবে অনুপ্রেরণাও জুগিয়েছে। কারো প্ররোচনায় নয় কিন্তু আনন্দেই, উচ্ছ্বসিত হয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালরা। সাঁওতাল নারী-পুরুষেরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক, বাদ্যযন্ত্র, তীর-ধনুক নিয়ে শোভাযাত্রা করেছে, শহর প্রদক্ষিণ করেছে। মাননীয় দ্রৌপদী মুরমুকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও স্বাগতম।
সাঁওতাল নারীর ভারত বিজয়, এটি অন্য সাধারণ ঘটনার মতো নয়। সাঁওতালরা বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটানে রয়েছে, এরাই উপমহাদেশের আদিমতম জাতিগোষ্ঠী। স্বাধীনচেতারা দ্বিশত বছর পূর্ব থেকেই আন্দোলন করে আসছে, মঙ্গল পান্ডের ৭০ বছর পূর্বে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বাবা তিলকা মুরমু (মাজহী) প্রথম সাঁওতাল ব্যক্তিত্ব যিনি জমিদার-জোতদার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আদিবাসীসহ সাঁওতালদের প্রাণের কথা, হৃদয়ের অব্যক্ত বিষয়গুলো তুলে ধরার প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিলেন। বাবা তিলকা মুরমু’র শেষ পরিণতি হয়েছিলো খুবই বেদনাদায়ক, মর্মান্তিক এবং করুণ; তাঁকে ঘোড়ার পেছনে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে ঘোরানো হয়েছিলো। মি. মুরমু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এটিই ইতিহাসে সাঁওতাল অধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার। বাবা তিলকা মুরমু থেকে সিধু-কানু, চাঁদ ভাইরো, ফুলো-জানো মুরমু এবং রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমু যেন সাজানো ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠা মাত্র।
২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমেই শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমু ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন। প্রথমত- আদিবাসীদের মধ্যে প্রথম এবং সাঁওতালদের মধ্যেও প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ‘রাইসিনা হিলস’ ভবনে পৌঁছেছেন। দ্বিতীয়Ñ ভারত স্বাধীনতার পর জন্ম হওয়া তিনিই প্রথম রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী জন্মেছেন ২০ জুন ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট স্বাধীন ঘোষিত হওয়ার ১১ বছর পর জন্মেছিলেন। ইতোপূর্বের সকল রাষ্ট্রপতির জন্ম হয়েছে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে। তৃতীয়ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শ্রীমতি মুরমু সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নীলম সঞ্জীব রেড্ডি ৬৪ বছর ২ মাস ৬ দিন বয়সে নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেক্ষেত্রে শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমু ৬৪ বছর ১ মাস ৮ দিনের দিন বিজয়ী ঘোষিত হয়েছেন। চতুর্থতÑ ভারতের ইতিহাসে এই প্রথমবার একজন কাউন্সিলর রাষ্ট্রপতি পদে পৌঁছিয়েছেন। শ্রীমতি মুরমু ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে রায়রাংপুর নগর পঞ্চায়েতের কাউন্সিলর হয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। তিন বছর পর তিনি বিধায়ক হন এবং ওড়িশার বিজেডি-বিজেপি সরকারে দু’বার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। পঞ্চমত প্রথমবার ওড়িশা থেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড গড়েছেন। এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হওয়া ৭ জন দক্ষিণ ভারতের, দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ছিলেন বিহারের। ষষ্ঠত ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে ঝাড়খ- রাজ্য হিসেবে ঘোষণার পর দ্রৌপদীই প্রথম রাজ্যপাল যিনি তাঁর পদে আসীন ছিলেন পূর্ণ সময় পর্যন্ত। সপ্তমতÑ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে সাংসদ-বিধায়করা শ্রীমতি দ্রৌপদীকে সমর্থন জানিয়েছে, যশবন্ত সিনহা’র ‘বিবেক ভোট’ থিওরি কাজে লাগেনি। বরং বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে দল-মতের উর্ধ্বে গিয়ে বিবেক ভোট কাজে লেগেছে। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কংগ্রেসের মনোনীত প্রার্থী সঞ্জীব রেড্ডির প্রতিদ্বন্দ্বী ভি ভি গিরিকে জয়ী করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিবেক ভোটের আহবান জানিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সাঁওতালরা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে ঠাকুরজিউ (স্রষ্টার)-এর কাছে করজোড়ে প্রার্থনা করেছিলেন, ঠাকুরজিউ তুমি দ্রৌপদীকে সুযোগ দাও দেশকে সেবা করার, দ্রৌপদীর মধ্যে দিয়ে বিশ্ব যেন সাঁওতালদের মেধা, মনন, দেশপ্রেম, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য এবং বিশ্বশান্তির হৃদয় ও চেতনা উপলব্ধি করতে পারে। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০) থেকে তেভাগার কৃষক বিদ্রোহ (১৯৪৬-৪৭) পর্যন্ত প্রায় ১৭টি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ অন্যতম। মহান মুক্তিযুদ্ধে ২৮ মার্চ সাঁওতাল-উরাঁও তীরন্দাজ বাহিনীর রংপুর ক্যান্টনমেণ্টে পাক-বাহিনীর অবস্থান নিশ্চিত করে ঘেরাও দেশপ্রেমের উৎকৃষ্টতম উদাহরণ। বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমু’র পথযাত্রা মসৃণ হোক, সফল হোক এই প্রার্থনা করি ঠাকুরজিউ-এর কাছে।
লেখক: সংবাদকর্মি