স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও অবহেলিত রাণীনগরের বেঁচে থাকা বীরাঙ্গনারা

আপডেট: মার্চ ২৫, ২০১৭, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

আবদুর রউফ রিপন, রাণীনগর



স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও অবহেলিত নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের ৯ বীরাঙ্গনা। সরকার ঘোষিত সকল সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত তারা। ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে এসব নারীরা বীরোত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান পান নি। অর্থের অভাবে তারা ওষুধ কিনে খেতে পারেন না। তাদের সন্তানরা দিনমজুরের কাজ করে পরিবারের চাহিদা পূরণ করে নিজের মায়ের জন্য কিছু করেন।
উপজেলার আতাইকুলা গ্রামে মোট ৯ জন বীরাঙ্গনার মধ্যে বর্তমানে বেঁচে আছেন সাত জন। বানী রানী পাল ও ক্ষান্ত রানী পাল রোগে আক্রান্ত হয়ে উন্নত চিকিৎসার অভাবে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। রেনু বালা, সুষমা বালা সূত্রধর, মায়া বালা সূত্রধর, কালী রাণী পাল, সুষমা পাল, রায়মনি সূত্রধর, সন্ধ্যা রানী পাল সহ সাত জন বীরাঙ্গনা আজ বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও বঞ্চিত সকল কিছু থেকে। একাত্তরের সেই দুর্বিসহ যন্ত্রনা, সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি অনেকটা দুঃখ-দুর্দশা, অভাব অনটন ও অসুস্থ্যতার মধ্যেই চলছে তাদের জীবন সংগ্রাম। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা সারা দেশে বীরাঙ্গনা নারীদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সেই তালিকায় উত্তর জনপদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক প্রয়াত আবদুল জলিলের জন্মভূমি জেলা নওগাঁর রাণীনগরে ৯ জন বীরাঙ্গনার নাম তালিকাভুক্ত না হওয়ায় হতাশ এসব পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।
রাণীনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর তীরে ছায়ায় ঘেরা শান্ত আতাইকুলা পালপাড়া গ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাক হানদার বাহিনীর স্থানীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নির্যাতন চালায়। এই সময় গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ জঘন্য ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের  কিশোর, যুবক, মাঝ বয়সী, ও বিভিন্ন বয়সী নারীদেরকে ধরে ওই গ্রামের সুরেস্বর পালের বাড়ির বারান্দায় একত্রিত করে। এরপর ‘জয়বাংলা বলতে হ্যায় নৌকামে ভোট দিতে হ্যায়’ এভাবে পাক সেনারা ব্যাঙ্গাত্তো উক্তি করতে করতে ব্রাশ ফায়ার করে গবীন্দ চরণ পাল, সুরেশ্বর পাল, বিক্ষয় সূত্রধর, নিবারন পালসহ ৫২ জন মুক্তিকামী জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করে। এসময় পাক হানদার বাহিনী গণহত্যা, লুটপাট ও নারী নির্যাতনের মতো ধ্বংসলীলা থেকে বিশেষ করে নারীরা স্বামী সন্তানদেরকে প্রাণে বাঁচানোর শেষ আকুতিটুকু করলেও পাক-জান্তাদের মন গলাতে পারে নি। উল্টো পাক-জান্তারা সুযোগ বুঝে নারীদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে নওগাঁ জেলা শহরের উদ্দেশে চলে যায়। ৫২ শহীদের তাজা রক্তে সেদিন নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর পানি লাল হয়ে ভাসিয়ে যায়। নির্যাতিত নারী ও স্বজনদের হৃদয় বিদারক আর্তনাদ ও কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
১৯৭১ সালে এই গ্রামে পাকবাহিনীর নির্যাতনের আলাপকালে ৯ বীরাঙ্গনার মধ্যে কালী রানী পাল (৭৩) জানান, ওই দিন সকালে যখন আমাদের গ্রামে পাঞ্জাবী আসে তখন আমর স্বামীসহ বাড়ির দরজা লাগিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করি। কিন্তু স্থানীয় রাজাকাদের সহযোগিতায় গেটের দরজা ভেঙে আমার স্বামীকে টেনে হিঁচড়ে পাঞ্জাবীরা রাইফেল দিয়ে মারতে মারতে যোগেন্দ্রনাথের বারান্দায় ফেলে রাখে। স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা চাইতে গিয়ে আমার কথা না শুনে চোখের সামনে আমার স্বামীসহ ৫২ জনকে হত্যা করে এবং উল্টো আমার উপরও নির্যাতন চালায়। আমার এক ছেলে আছে। অভাবের সংসারে সে দিন মজুরের কাজ করে। আমি ও পেটের তাগিদে কখনও ধান কুড়িয়ে, বয়লারের চাতালে কাজ করে, কিংবা অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে দু’মুঠো ডাল ভাত খেয়ে কোনো মতো বেঁচে আছি। স্বাধীনতার ৪৫বছর পার হলেও আমাদের খোঁজ খবর কেউ নেয় নি।
সুষমা পাল (৭০) জানান, ওইদিন সকাল নয়টার দিকে পাঞ্জাবীরা আমার স্বামী বাড়িতে কাজ করা অবস্থায় সুরেশ্বর পালের বাড়িতে ধরে নিয়ে লাইন করে রাখে এই দিকে পাঞ্জাবীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট ভাঙচুড় ও অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরণের নির্যাতন চালায়। আমি ছোট ছেলেকে নিয়ে পার্শ্বের বাড়ির এক বড় মাটির ডাবরের ভিতর আশ্রয় নেই। বাচ্চার কান্না পাঞ্জাবীরা শুনতে পেয়ে আমাকে সেখান থেকে বের হওয়ার কথা বলে। তখন আমি পালিয়ে মাঠের মধ্যে দৌঁড়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক-বাহিনীরা আমাদের সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছে।
সদ্য প্রয়াত বাণী রানী পালের মা ও ছোট ভাই জয়ন্ত পাল জানান, একাত্তরের ঘটনার কথা জানতে চাইলে মাথা নিচুঁ হয়ে যায় তাদের। ক্ষোভে কষ্টে তাদের চেহারা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে উঠে। তার পরও বলেন, একাত্তরের ২৫ এপ্রিল সকাল নয়টার দিকে নদী পার হয়ে স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় পাক বাহিনী আমাদের পাড়ায় ঢুকে লুটপাট, ভাঙচুড়, অগ্নিসংযোগ শুরু করলে বাণী পালের চোখের সামনে তার বাবা শ্রীমন্ত পালকে ধরে মারপিট শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে বীরের মতো সেই সময়ের কিশোরী বাণী পাল পাঞ্জাবীদের রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে পাশের একটি কূপে ফেলে দিয়ে হাতাহাতি শুরু করলে পাক-হায়েনারা তার বাবাকে গুলি চালালে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গুরুতর আহত অবস্থায় ভাগ্যেক্রমে সে বাঁচলেও বাণী পাল তাদের নির্মম নিষ্ঠুর নির্যাতন থেকে রেহায় পায় নি।
কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে জয়ন্ত এক পর্যায় বলেন, লজ্জা ঘৃণায় আমার দিদি বিয়ে না করেই অবশেষে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অর্থাভাবে যথাযথ চিকিৎসা করতে না পেরে মারা গেলেন। তবে অন্য বীরাঙ্গনা ও তাদের স্বজনরা লজ্জা ঘৃণা, ক্ষোভে স্বজন হারানোর বেদনায় তারা মুখ খুলতে রাজি নয়।
আতাইকুলা গ্রামের শহীদ পরিবারের সদস্য গৌতম পাল জানান, স্বাধীনতার ৪৫ বছর অতিবাহিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব গাঁথা এই গ্রামের শহীদ ও বীরাঙ্গনার পরিবারের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় কোনো সুযোগ সুবিধা পায় নি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাদের স্থান হয় নি। বড় পরিতাপের বিষয় যে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকার পরও এ দফতর সে দফতর ঘুরেও আমাদের কোনো একটা সুরাহা হলো না।
রাণীনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অ্যাড. ইসমাইল হোসেন জানান, আতাইকুলার ৯ বীরাঙ্গনার ব্যাপারে যথাযথা প্রক্রিয়ায় আবেদন করা হয়েছে। আমরা এখন গেজেটভুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছি।
স্থানীয় সাংসদ মো. ইসরাফিল আলম বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও বীরঙ্গনাদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। আতাইকুলা গ্রামের ৯ বীরাঙ্গনার ব্যাপারে আমি সকল কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আশা রাখি অচিরেই স্বাধীনতার পক্ষের এই সরকার আতাইকুলা গ্রামের এই বীরাঙ্গনাদের যথাযথ মর্যাদায় ভূষিত করবেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ