স্বাধীনবাংলা বেতারের মনা আজও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন না

আপডেট: জুলাই ৩, ২০১৭, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

ওয়ালিউর রহমান বাবু


আফরোজা মামুন মনা মুক্তিযোদ্ধা সংগীত শিল্পী সংগ্রামী নারীর পথীকৃত। যার মুখের দিকে তাকালে অন্যরকম অনুভুতি কাজ করে। নওগাঁর উকিলপাড়ার কেডি মোড়ের এই নারীর সাথে কথা হয়েছে বহুবার। একাত্তরের স্মৃতি নিয়ে কিছু জানতে চাইলেই বলেছেন, ‘থাক না কী আর করেছি’? সে সময় তিনি যে ভুমিকা রেখেছেন তা আমাদের কাছে কখনই সামান্য নয়। তার সাথে যোগাযোগ থাকলেও জানা যায়নি সেই কথাগুলি। অবশেষে ১৪ মে শনিবার আবারো তার সাথে দেখা হলো রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের কাছে প্রফেসরপাড়ায় তার আত্মীয় অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমানের বাড়িতে, বললেন অনেক কথা। পড়াশোনা নওগাঁ পরিমহল গার্লস স্কুলে। সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের কারণে নওগাঁর চৌধুরী পরিবারের ছেলে নামকরা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মামুনাল চৌধুরী রাজার সাথে তার পরিচয়Ñ এরপর বিয়ে হয়ে গেলো। দুজনেই রাজশাহী বেতারে কাজ করতে থাকলেন। এলো একাত্তরের ডাক। নওগাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাংস্কৃতিক অনুরাগী আব্দুল জলিলের কাছে দুজনেই শপথ নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিলেন। গান গেয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করতে থাকলেন। প্রতিরোধ গড়ে উঠলো জয়বাংলা স্লোগানে। স্বাধীনতাকামীদের নিয়ন্ত্রণে সবকিছু এসে গেলেও অস্ত্র সংকটে প্রতিরোধ ভেঙ্গে গেলো। পাকিস্তানি সৈন্যরা সান্তাহার হয়ে নওগাঁ আক্রমণের মুহুর্তে আব্দুল জলিলের নির্দেশে তারা তাদের তিন বছরের মেয়ে সানি, তিন মাসের ছেলে রাহুল কে নিয়ে গ্রামের বাড়ি গয়েশপুর চলে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল জলিল তাদের সীমান্ত পার হয়ে যেতে খবর পাঠালেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের পরিবারের পনেরো জনকে হত্যা করলো। এ অবস্থায় তারা মহিষের গাড়িতে সীমান্তের দিকে যাবার সময় প্রচ- পিপাসায় মহিষের জন্য বালতিতে রাখা পানি পান করলেন। দূর থেকে দেখলেন, পাকিস্তানি সৈন্যদের বাড়িঘরে দেয়া আগুনের লেলিহান শিখা। মহিষের গাড়িতে দুই দিন দুই রাত পর ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের বালুর ঘাটে পৌঁছানোর পর আশ্রয় খুঁজতে থাকলেন। বালুরঘাটে কল্যাণী সিনেমা হলের সামনে থাকার জন্য একটি বাড়ির বারান্দা পেলেন। বাঁশের চাটাই দিয়ে বারান্দা ঘিরে থাকতে লাগলেন। আব্দুল জলিলের নির্দেশে সেখানকার নাট্য মন্দির  সাংস্কৃতিক গ্রুপে যোগ দিয়ে ভারতের রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, মালদা, মুর্শিদাবাদ. বহরমপুর, শিলিগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুরসহ বিভিন্নস্থানে অনুষ্ঠান করে সেখান থেকে সংগ্রহ করা অর্থ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে জমা দিতে থাকলেন। শরণার্থী শিবিরের জন্য কাপড়ও সংগ্রহ করতে থাকলেন। এ ভাবে চলতে থাকলো তাদের জীবন। বর্ষায় বৃষ্টিতে সেই বারান্দায় থাকা তাদের অসম্ভব হয়ে উঠলো। তাদের শিশু দুইটি কে নিয়ে  চিন্তায় পড়ে গেলেন। একদিকে শিশু, আরেক দিকে মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি সৈন্যদের সেলিং-এ বালুরঘাট থেকে লোকজন সরে যেতে থাকলে তারাও সেখান থেকে সরে গিয়ে কলকাতায় চলে গেলেন। কলকাতায় দেখা হলো অনেকের সাথে। শুরু করলেন চ্যারিটি শো। পার্ক সার্কাসে থাকা মায়ের কাছে তাদের শিশু দুটিকে রেখে দায়িত্ব পালন করতে থাকলেন। আব্দুল জাব্বার, আপেল মাহামুদ, আব্দুল হাদি, শহিদ মাহামুদ, রথীন্দ্রনাথ রায়, লাকি আখন্দ সহ স্বাধীনবাংলা বেতারের অনেকের সাথে দেখা হলো। স্বামী মামুনাল চৌধুরী রাজাকে নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গান গাইতে¬¬ থাকলেন। শিশু দুটির খোঁজও ঠিকমতো নিতে পারলেন না, দিনরাত পরিশ্রম করতে থাকলেন।
স্বাধীন বাংলা বেতার নিয়ে বলতে গিয়ে অনেক কথাই বললেন। প্রচ- নিয়মের মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। রেকর্ডিং হতো কলকাতার চৌরাঙ্গী ও নারকেল ডাঙ্গায়। রেকর্ডিঙের পাশাপাশি চ্যারিটি শো করে অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে পরিশ্রম আর ঠিকমত না খাওয়ায় শরীর ভেঙ্গে পড়তে থাকলেও মানসিকভাবে কখনই ভেঙ্গে পড়েন নি। স্বাধীনবাংলা বেতারে যখন গান প্রচার হতো তখন নিজেই উজ্জীবিত হয়ে উঠতেন। স্বাধীনবাংলা বেতার, চ্যারিটি শো ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প, শরণার্থী শিবিরে অনুষ্ঠান করতে ভারতের জনগণের অফুরন্ত সহযোগিতা অনুপ্রেরণা পেতে থাকলেন। দেশ স্বাধীন হলো দেশ গড়তে সকলকে উজ্জীবিত করতে থাকলেন। কিন্তু স্বীকৃতি পেতে ধর্না দিতে হবে কখনই ভাবেন নি। স্বামী মুক্তিযোদ্ধা মামুনাল চৌধুরী রাজা মারা গেলে চারিদিকে অন্ধকার দেখলেন। তবুও ভেঙ্গে পড়লেন নাÑ শুরু হলো তার আরেক সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুল জলিল তাদের স্বীকৃতি দিতে সংশ্লিষ্টদের বলে দিলেও তারা নানা সমস্যায় পড়লেন। অনেক চেষ্টার পর স্বামী মামুনাল চৌধুরী রাজা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেও আফরোজা মামুন মনা আজোও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন না।
মনা স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখেছেন যা সংশ্লিষ্ট মহল অবগত। তার পরেও তার প্রতি বিরূপ আচরণ করে তাকে যাচাই বাছাই থেকেও বাদ দেয়াপ হয়েছেÑ বলা হয়েছে তার স্বামী মামুনাল চৌধুরী রাজা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন তাই তাকে স্বীকৃতি দেয়া যাবে না। এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন ‘এটা সঠিক নিয়ম নয়’। একই পরিবারের একাধিক জন যদি মুক্তিযুদ্ধে সঠিক ভূমিকা রাখেন তাহলে তারাও স্বীকৃতিপ্রাপ্য। স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা আফরোজা মামুন মনা মুক্তিযুদ্ধে যে ভূমিকা রেখেছেন তা সংশ্লিষ্ট মহল অবগত তাই তাকে মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত রাখা ঠিক নয়। এব্যাপাারে তিনি সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ চান। মনা ভালবাসা চান আর এই ভালবাসার সিক্ত হয়ে  তিনি আজীবন গান গেয়ে যাবেন। গান তার রক্তে মিশে আছে, এটা তিনি ছাড়তে পারবেন  না। তার কন্ঠ দিয়ে তিনি একাত্তরে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। যতদিন পারবেন গান গেয়ে যাবেন।
লেখক :মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক, প্রডিউসার প্রেজেন্টার রেডিও পদ্মা রাজশাহী