স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রাবি শিক্ষার্থীরা

আপডেট: এপ্রিল ৫, ২০১৭, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


রাবিতে এভাবেই উন্মুক্ত স্থানে রাখা হচ্ছে খাবার । ছবিটি ক্যাম্পাসের টুকিটাকি চত্বর থেকে তোলা- সোনার দেশ

নানা পাখির দৌড়ঝাঁপ। মাছির গুঞ্জন, মশার ভনভনানি। কর্দমাক্ত জায়গা। পাশের ড্রেনে ফেলা পচা খাবারের উটকো গন্ধ। উপরে খোলা আকাশ বা কাপড়ের ছাউনি। নোংরা পানি দিয়েই চলছে বাসন পরিষ্কার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে সেখানে গড়ে ওঠা অধিকাংশ খাবার দোকানের চিত্র এটি।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এভাবেই খাবার রান্না ও সংরক্ষণ করা হয়। আর এসব খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের ভুগতে হয় পেটের বিভিন্ন পীড়াসহ নানা রোগে। সেই সঙ্গে খাবারের বর্জে নোংরা হচ্ছে ক্যাম্পাসের পরিবেশ। অথচ অবৈধ এসব দোকানের মাননিয়ন্ত্রণ বা উচ্ছেদে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নেই। অনেকে না জেনে আবার অনেকে জেনে বাধ্য হয়েই এসব খাবার খাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের টুকিটাকি চত্বর, লিপু চত্বর, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বিজ্ঞান ভবন এবং চারুকলা অনুষদের পাশেসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি খাবারের দোকান। এর মধ্যে আট থেকে দশটি দোকানে শুধু সকালের নাস্তা পাওয়া গেলেও বাকি দোকানগুলোতে সকালের নাস্তা ও দুপুরের খবার পাওয়া যায়। প্রায় প্রতিটি দোকানেই পাওয়া যায় একই ধরনের খাবার।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই খুলে বসা এসব দোকানের খাবারমান অত্যন্ত নিম্নমানের। প্রকৌশল দফতর থেকে অনুমোদন নেয়ার নিয়ম থাকলেও কেউই তা নেয়নি।
সরেজমিনে দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব দোকানে খোলা আকাশের নিচে হাতের উপর প্লেট রেখে খেতে হয়। কিছু কিছু দোকানে উপরে কাপড় টাঙানো থাকলেও ধুলা-বৃষ্টি পড়ছে আলগা থাকা খাবারে। দোকানের আশেপাশে ও মাথার উপর ঘোরাঘুরি করে কাকপক্ষি।
সকালে ক্লাসে যাওয়ার আগে খিচুড়ির সঙ্গে বিভিন্ন চপ, ছোলা, পিঁয়াজি ও ডিম ভাজি দিয়েই নাস্তা সারেন শিক্ষার্থীরা। শুধু খাবারেই নয়, নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়ার ছাপ রয়েছে খাবার ব্যবস্থাপনাতেও। কেরোসিনের চুলায় হাওয়া দিচ্ছেন, ডিম ভেঙে ভাজছেন, ময়দা ঠিক করছেন আবার একই হাত দিয়ে ভাজা-ভাজির কাজ করছেন রান্নার কারিগর। এসব খবারই অহরহ খেয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
দুপুরে প্রত্যেকটি দোকানে খাবারের মেন্যু প্রায় একই। পোল্ট্রি মুরগির এক টুকরা মাংস অথবা মাছের সঙ্গে আলুর ঝোল। মাংস বা মাছের টুকরা খুঁজতে ওই ঝোলের মধ্যে অভিযানে নামতে হয়। সঙ্গে ভাত বা খিচুরির আর ভাতের মাড় মিশিয়ে রান্না করা ডাল। নেই কোন শাকসবজি। খাবার বেড়ে দিচ্ছেন, পানি দিচ্ছেন আবার তিনিই খাবার শেষে রেখে যাওয়া প্লেট নিয়ে যাচ্ছেন। ব্যবহৃত প্লেট, বাটি ও গ্লাস ধোয়া বলতে একজনের খাওয়ার পর পানিতে ডুবিয়েই আরেকজনকে দেয়া। একই পানিতে বারবার ধৌত করা হচ্ছে। খাবারের উচ্ছিষ্ট ও নোংরা পানি ফেলা হচ্ছে পাশের ড্রেনে। এসব নোংরা পানিতে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে মশা-মাছি। এসব মশা মাছি এসে আবার বসছে খোলা খাবারের উপরে। ফলে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের মশা-মাছিবাহিত রোগবালাই।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, একইসঙ্গে এই খাবার খেয়ে যাচ্ছেন ক্যাম্পাসের কর্মকর্তা, কর্মচারী, দিনমজুর ও হকার। যারা সারাদিন কষ্ট করে দুপুরে এক মুঠো ভালো খাবারের আশায় খেতে আসেন এসব খোলা হোটেলগুলোতে। কিন্তু তারা নিজেরাও জানেন না এসব খাবার রান্না ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে কতোটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সরকার সত্য বলেন, ‘টুকিটাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় ভর্তির প্রথমদিকে শিক্ষার্থীরা এখানেই বেশি খাওয়া-দাওয়া করেন। কিন্তু দুই-এক বছর পরে তারা সেখানে খেতে আর ইচ্ছুক থাকে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অন্য জায়গার তুলনায় টুকিটাকিতে খাবারের মান খুবই খারাপ। এখানে রান্নার কাজে যে তেল ব্যবহার করা হয় সেটা দুই-তিন আগের ব্যবহৃত তেল। যেটা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।’
ক্লাস শেষে চতুর্থ বিজ্ঞান ভবনের পাশের খাবারের দোকানে বসে খাচ্ছিলেন দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী আল ইমরান। তিনি জানালেন, হল দূরে হওয়ায় ক্যাম্পাসেই এসব দোকানেই খাওয়া-দাওয়া শেষে গ্রন্থাগারে পড়াশোনা করি। রুমে গিয়ে খেয়ে আসতে অনেক সময় নষ্ট হয়। এজন্য বাধ্য হয়েই এখানকার খাবার খেতে হচ্ছে। এসব খাবার খেয়ে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন বলেও জানান তিনি।
রাবি মেডিকেল সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, পেটের পীড়ায় আক্রান্ত প্রতিদিন অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিতে যায়। মেডিকেলের কয়েকজন চিকিৎসক জানান, খোলা দোকানে খাবার খেয়ে ডায়রিয়া, আমাশয়, গ্যাস্টিক, আলসারসহ নানা ধরনের পেটের পীড়া হয়ে থাকে। খাবারের মান ঠিক না থাকা, বেশি পরিমাণে মশলা ব্যবহার করা এবং একই খাবার প্রতিদিন খাওয়ায় অরুচি ও ক্ষুধামন্দা সমস্যা নিয়েও মেডিকেলে আসে অনেকে।
বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডা. সলিল রঞ্জন সমদ্দার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের স্বাভাবিক জীবনধারণ ও পড়াশোনা ঠিকমতো চালিয়ে যেতে যে পরিমাণ ক্যালরি প্রয়োজন তার অর্ধেক ক্যালরিও থাকে না ক্যাম্পাসের খাবারে। ফলে স্বাস্থ্য সমস্যা ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে প্রচুর সংখ্যক শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিতে আসে।
খাবারের মানের বিষয়ে শিক্ষার্থীদেরই সচেতন হওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, ‘স্বাস্থ্যসম্মত দিক বিবেচনা করে ক্যাম্পাসের খোলা দোকানগুলোতে খেতে হবে। খাবারের মান খারাপ হলে শিক্ষার্থীদের ওখানে খাওয়া বাদ দিতে হবে তবেই দোকান মালিক খাবার তৈরিতে সচেতন হবেন। এছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত দিকের পাশাপাশি আমাদের এতোগুলো শিক্ষার্থীর খাবারের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হয়। মাঝেমধ্যে আমরা নিজেরাই খেয়ে দোকানগুলো পর্যবেক্ষণ করি।’
ক্যাম্পাসের ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোর দায়িত্বে থাকা এস্টেট শাখার উপপরিচালক হাসিন আহমেদ খান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে যত্রতত্র নানা ধরনের ভ্রামমাণ খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। তারা ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট করে চলছে। উপাচার্য ও উপউপাচার্য না থাকায় তাদের উচ্ছেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। নতুন অভিভাবক আসলে তাদের উচ্ছেদে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ