স্মরণ: সমাজ সেবক অধ্যাপক আ ন ম সালেহ্

আপডেট: জুলাই ৪, ২০১৭, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

হামিদা সালেহ্



আজ ৪ জুলাই অধ্যাপক আ ন ম সালেহ্’র ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। সালেহ্, সালেহ ভাই, সালেহ্ স্যার বা বন্ধুমহলে বাবলু নামে পরিচিত হলেও তাঁর পুরো নাম আবু নাসের মোহাম্মদ সালেহ্। ব্যক্তি জীবনে নির্লোভ, নিরহংকারী, পরোপকারী, দানশীল। বড়দের কাছে অগাধ ¯েœহের মানুষ ছিলেন। বন্ধুদের কাছে ছিলেন আড্ডাবাজ বন্ধুবৎসল। ছোটদের কাছে পরম শ্রদ্ধেয়।
সালেহ্’র বন্ধু ও নিকটজনদের অনেকেই দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি। ঘনিষ্ট বাল্যবন্ধু ফজলে হোসেন বাদশা এমপি ও ঢাকা ওয়াসার প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ড. কাজী আলী আজম, ব্যবসায়ী হামিদুজ্জামান চৌধুরী কুটু, পেশাগত বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারÑএদের সবার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতেন। সমাজ সেবার নানা উদ্যোগে তাঁদের সম্পৃক্ত করতেন কিংবা তাঁদের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত থাকতেন।
আমার শ্বশুর মাদার বখ্শ্ ৩০ থেকে ৫০ দশকে রাজশাহী তথা সমগ্র উত্তরবঙ্গের একজন কিংবদন্তী রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও সমাজ সেবক ছিলেন। মুসলিম লীগের এমএলএ হলেও ভাষা আন্দোলনে ঢাকার মিছিলে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী ভুবনমোহন পার্কে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি ছিলেন অন্যতম আয়োজক এবং নিজ দল ও সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করায় তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল। এর মাত্র ৫দিন আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি সালেহ্ জন্মগ্রহণ করে। ক্ষুব্ধ হয়ে মুসলিম লীগের রাজনীতি থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন মাদার বখ্শ্ সমাজসেবা ও শিক্ষা বিস্তারে মনোনিবেশ করেন।
রাজশাহীসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গে তিনি অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর প্রস্তাবানুসারে ১৯৪৯ সালে রাজশাহী মেডিকেল স্কুল (৫৮ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নামকরণ করা হয়) ও তাঁর উদ্যোগে ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। উত্তরবঙ্গসহ সমগ্র দেশের শিক্ষা উন্নয়নে এ দুটো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবদান অপরিসীম। ১৯৭৪ সালে মরহুম মাদার বখ্শ-এর প্রতি সম্মানার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে নবনির্মিত আবাসিক ছাত্র হলের নাম ‘মাদার বখ্শ হল’ রাখা হয়েছে।
৫০ ও ৬০ দশকে সোবহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে কোর্ট একাডেমি নামে পরিচিত), লক্ষ্মীপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মহিলা কলেজ, রাজশাহী গার্লস মাদ্রাসা (বর্তমানে গার্লস হাইস্কুল)সহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন মাদার বখ্শ। তিনি রাজশাহী পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত মেয়র (বর্তমানে সিটি করপোরেশন) হিসাবে ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহীর সুবিশাল মার্কেট ‘নিউমার্কেট’ নির্মাণের পরিকল্পনা তাঁর ছিল। এ সময় হরিজনদের জন্যও তিনি স্কুল গড়ে তোলেন।
বিখ্যাত বাবার সন্তান হলেও কৈশোরেই ছাত্র ইউনিয়নের (জেলা সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন) সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন সালেহ। ৬৯ এর গণ-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলো সালেহ্। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের পক্ষে আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ত থাকায় ১৩জনকে রাজশাহী কলেজ থেকে বহিস্কার করা হয়। বহিস্কৃত ১৩ জনের মধ্যে সালেহ্ ও তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু ফজলে হোসেন বাদশা (বর্তমানে সংসদ সদস্য) অন্যতম। এদের মধ্যে একমাত্র ফজলে হোসেন বাদশা ভাই এখনও সক্রিয় রাজনীতি করছে,  নিজেকে দেশের একজন ইতিবাচক রাজনীতিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে যুগ্মভাবে প্রথম হয়ে ১৯৭৭ সালের ১ জুলাই একই বিভাগে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। এর মাত্র ২ মাস আগে আমাদের বিয়ে হয়। সেই থেকে ২০১১ সালের ৪ জুলাই মৃত্যুর দিন পর্যন্ত কখনও ক্লাস ফাঁকি দিতে দেখিনি। সহপাঠিদের অনুরোধ উপেক্ষা করে দলভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতিতে যুক্ত হয়নি সালেহ্।
বরং বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরে (বিএনসিসি) খুবই সক্রিয় হয়ে উঠে সালেহ্। ক্যাপ্টেন, মেজর ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য সর্বোচ্চ পদবি লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসাবে পদোন্নতি লাভ করেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সালেহ্ রাজশাহীতে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ‘মাদার বখ্শ্ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ’ অন্যতম। এটি দেশের প্রথম বেসরকারি ও সমগ্র উত্তরবঙ্গের একমাত্র গার্হস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে রাতদিন পরিশ্রম করেছে। আমার শাশুড়ির দেয়া ১৪ ভরি সোনার গহনা, সালেহ্-এর পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত কৃষিজমি বিক্রি ও ব্যাংকে জমানো টাকা এ কলেজের জন্য ব্যয় করতে হয়েছিল। অনেক মানুষকে সম্পৃক্ত করেছিল। সালেহ্ এ কলেজের জন্য জায়গা বরাদ্দ, ভবন নির্মাণে সহায়তার জন্য যেখানে যাওয়া দরকার, সেখানেই গেছেন। অপছন্দ করেন, এমন মানুষের কাছেও গিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা জন্য অনুরোধ করেছেন।
এছাড়া ‘মাদার বখ্শ্ আইডিয়াল স্কুল’, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের জন্য ‘আশা বিদ্যালয়’, শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য ‘হাইকেয়ার স্কুল’, নিরক্ষর বয়স্কদের জন্য রাজশাহীর প্রথম ‘বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেন। স্বীয় অর্থে দরিদ্রদের শিক্ষা বিস্তারে জমিদান করলে সেখানে জমিদাতা হিসাবে তাঁর মায়ের নামে গড়ে উঠে ‘মোমেনা বখ্শ্ ইউসেপ স্কুল’।
প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা ছিল তাঁর। শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে হাইকেয়ার সমিতি, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সমিতি, বিভাগীয় প্রতিবন্ধী ক্রীড়া সমিতি (রাজশাহী), প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য সংস্থা (রাজশাহী) এবং মানসিক প্রতিবন্ধী কল্যাণ ও শিক্ষা সমিতির (রাজশাহী) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর উদ্যোগেই রাজশাহীতে প্রতিবন্ধীদের বিভাগীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং রাজশাহীর প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করে। সোসাইটি ফর দি ওয়েলফেয়ার অব দি ইন্টেলেকচুয়ালি ডিজাবল্ড বাংলাদেশ (সুইড বাংলাদেশ) নামক জাতীয় এ সংস্থার সর্বশেষ সহ-সভাপতি পদে ছিলেন। এছাড়া অনেক বছর সুইড রাজশাহী শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব স্পোর্টস ফর দি পারসন্স উইথ ডিজাবিলিটি (এনএএসপিডি) সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
বইপড়া কর্মসূচিকে শিশু ও তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এশিয়া ফাউন্ডেশনের ‘দি বুকস্ প্রোগ্রাম’-এর তিনি অন্যতম স্বেচ্ছাব্রতী সংগঠক ছিলেন। রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড-এর সদস্য ও শিক্ষাÑসংস্কৃতি বিস্তারে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো’র স্বেচ্ছাসেবি সংস্থা ‘ইউনেস্কো ক্লাব’ এর উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) এর বিভিন্ন নির্বাচনী পরীক্ষায় পরীক্ষক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসহ কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ, নারী নির্যাতন বন্ধ, মাদক প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলনের অগ্রণী ও মাদকাসক্তদের পূনর্বাসন, তরুণদের রক্তদানে উৎসাহী করাসহ ইতিবাচক মানসিকতায় গড়ে তুলতে বিএনসিসিতে সম্পৃক্ত করা, সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর সংগ্রামী ছিলেন সালেহ। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)Ñএ দুটি সংস্থা রাজশাহী শাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন
বাংলাদেশ বিজ্ঞান সমিতি’র মনোবিজ্ঞান শাখার সভাপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগীয় মনোবিজ্ঞান সমিতির কোষাধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মনোবিজ্ঞানী হওয়ায় হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে মানসিকভাবে উদ্দীপ্ত করে তুলতেন। মানসিক চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে অনেক মাদকাসক্তকে মাদকের নেশা থেকে মুক্ত করে সুস্থ পথে ফিরিয়ে আনেন।
খুব অল্প সময় ঘুমাতেন সালেহ্। অবসর সময়কে মানবসেবায় কাজে লাগিয়েছেন। ব্যক্তিগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিকÑসব পরিম-লে প্রগতিশীল ছিলেন সালেহ্।
সালেহ্ বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেকে যদি যার যার পেশা ও অবস্থানে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তবে সমাজে কোনো সমস্যা ও সঙ্কট থাকবে না। সালেহ তরুণদের নিয়ে নানা ইতিবাচক কাজে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর আদর্শ তরুণদের সমাজ সেবায় অনুপ্রাণিত করুক, এ প্রত্যাশা করি। মানবতার সেবায় অকৃপণভাবে বিলিয়ে দিয়ে ২০১১ সালের ৪ জুলাই সবাইকে ছেড়ে অকালে পরপারে চলে যান। তাঁর আদর্শ যেন আমাদের দু’সন্তানকে ছুঁয়ে যায়, সবার কাছে এ দোয়া চাই।
লেখক: অধ্যাপক আ ন ম সালেহ্-এর সহধর্মিনী ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ, মাদার বখ্শ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ